ডারউইনের বাংলাদেশ ম্যাকাইয়ে কেন হারিয়ে গেল? ভুলটা করল কোথায়

দুই দিনেই টেস্ট শেষ। ইনিংস ব্যবধানে হার। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই যেন স্বর্গ আর মর্ত্যের অভিজ্ঞতা পেল বাংলাদেশ। ডারউইনে যে দল মাইটি অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে, যাদের সামনে সুযোগ ছিল ১৩৯ বছরের ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার, সেই বাংলাদেশ ম্যাকাইয়ে পাত্তাই পেল না। প্রথম ইনিংসে ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে গুটিয়ে গেল ৯৫ রানে। তাতে বাংলাদেশের পাশে যুক্ত হলো ইনিংস ও ৫১ রানের হার।

কিন্তু যে দলটা ডারউইনে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সেরা দলটার ওপর আধিপত্য দেখাল, সেই একই দল কেন ম্যাকাইয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল? বাংলাদেশ আসলে কোথায় ভুল করল? ডারউইনে পারলে ম্যাকাইয়ে কেন পেরে উঠল না বাংলাদেশ?

 

ব্যাটারদের ব্যর্থতা

ম্যাকাই টেস্টের দিকে তাকালে, সবার আগে সামনে আসে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার চিত্র। প্রথম ইনিংসে ৬৪ রানে অলআউটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৫ রান। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে গত ২১ বছরে এই প্রথম কোনো দল দুই ইনিংসেই ১০০-র নিচে অলআউট হলো। এর আগে টেস্ট ক্রিকেট সর্বশেষ এমনটা দেখেছিল ২০০৫ সালে। সেবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংসে ৫৯ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৯ রানে অলআউট হয়েছিল। আর বাংলাদেশ এই লজ্জা পেল প্রথমবার।

এতেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের ব্যাটিং কতটা বাজে ছিল ম্যাকাইয়ে। আর এর মূলে টপ অর্ডারের ব্যর্থতা। শুধু টপ অর্ডার বললে ভুল হবে, প্রথম ইনিংসে তো বাংলাদেশের প্রথম ৬ ব্যাটসম্যানের ৪ জনই রানের খাতা খুলতে পারেননি। বাকি দুজন আউট হয়েছেন এক অঙ্কের ঘরে। দ্বিতীয় ইনিংসেও দুই প্রথম তিন ব্যাটসম্যান মিলে করেছেন ১০ রান! আর এবার দুই অঙ্ক ছুঁয়েছেন সবমিলিয়ে দুজন!

 

তাহলে কি উইকেট বুঝতে ভুল করল বাংলাদেশ?

ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার উইকেট ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা। ডারউইনের উইকেটের চেয়ে ম্যাকাইয়ের উইকেটের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বল এসেছে দ্রুত গতিতে, ছিল বাড়তি বাউন্স, নতুন বলে ছিল ভয়ংকর মুভমেন্ট। আর এই ধরনের কন্ডিশনে টিকে থাকার মূল অস্ত্র হলো— ধৈর্য। কিন্তু বাংলাদেশ সেই পরীক্ষাতেই সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ৯৫ রানে অলআউট। দুই ইনিংস মিলিয়েও অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ২১০ রান স্পর্শ করতে পারল না বাংলাদেশ।

অথচ ম্যাকাইয়ে কী দারুণভাবে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন ব্যাটসম্যানরা। অস্ট্রেলিয়ার এই একই বোলিং লাইন-আপের সামনে লড়াই চালিয়ে বাংলাদেশ গড়েছিল ৪২৬ রানের পাহাড়। যে রান পাহাড়ের চাপে অস্ট্রেলিয়া পিষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সেই বাংলাদেশ ডারউইনে পারলেও ম্যাকাইয়ে ধৈর্যের পরীক্ষায় পাশ করতে পারল না।

 

বাউন্সি উইকেটে ব্যাটসম্যানদের টেকনিক্যাল ব্যর্থতা

ম্যাকাইয়ের ভয়ংকর রকমের পেস-বান্ধব উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের টেকনিক্যাল দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসের কথাই ধরা যাক। স্টার্কের করা ওভারের দ্বিতীয় বলে একটা শর্ট বল বাউন্স করে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সাদমান ইসলাম যেন বুঝতেই পারলেন না, বলটা কতটা উঠবে। ব্যাটের কানায় লেগে সহজ ক্যাচ চলে যায় স্লিপে দাঁড়ানো লাবুশানের হাতে। এটা টেকনিক্যাল সমস্যার ক্লাসিক উদাহরণ— বাউন্স রিড করতে না পারা।

আর তার ঠিক পরের বলেই ঘটে আরও অদ্ভুত এক ঘটনা। মুমিনুল হক অফ স্টাম্পের ওপর থাকা একটা বল, দোটানায় পড়ে সেটাই ছেড়ে দিলেন— হয়ে গেলেন বোল্ড! মজার ব্যাপার হলো, আগের দিন তিনি অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের বলে ব্যাট চালিয়ে ক্যাচ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ একবার বাড়তি আগ্রাসন, আরেকবার বাড়তি সতর্কতা— কোনোটাতেই ছিল না সঠিক ভারসাম্য। এই দ্বিধাগ্রস্ত মানসিকতাই বলে দেয়, পেস আর বাউন্সের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায় বড় ঘাটতি ছিল।

 

অস্ট্রেলিয়ার পাতা ফাঁদে বারবার পা দেওয়া

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স রণকৌশল সাজিয়েছিলেন অত্যন্ত চতুরভাবে। উইকেটের পেছনে কখনো কখনো সাত জন পর্যন্ত ফিল্ডার রেখে তিনি ফাঁদ পেতেছিলেন শর্ট বল আর বাউন্সারের জন্য। আর বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বারবার সেই ফাঁদেই পা দিয়েছেন।

তানজিদ হাসান শুরুটা করেছিলেন দারুণভাবে— ইনিংসের প্রথম বলেই স্টার্ককে স্ট্রেট ড্রাইভে চার! কিন্তু অষ্টম ওভারে কামিন্সের একটা বাউন্সারে তিনি দায়সারাভাবে পুল শট খেলতে গিয়ে লং লেগে সহজ ক্যাচ তুলে দেন। যে ফিল্ডিং পজিশন সাজানোই হয়েছিল ঠিক এই শটের জন্য, সেই ফাঁদেই তিনি ধরা পড়লেন।

এটা শুধু এক ব্যাটসম্যানের ভুল না— পুরো ব্যাটিং লাইনআপ জুড়েই দেখা গেছে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা পড়তে না পারার এই প্যাটার্ন। প্রতিপক্ষ অধিনায়ক যখন আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাজিয়ে নির্দিষ্ট এক ধরনের শটের জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন সেই শট এড়িয়ে যাওয়ার মতো সংযমটাই দেখা যায়নি বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে।

 

চাপের মুখে বারবার আত্মঘাতী বা ভুল শট নির্বাচন

আজ যখন বাংলাদেশ লাঞ্চে গেল, তখন স্কোরবোর্ডে ছিল ৩ উইকেটে ৩৯ রান। পরিস্থিতি খারাপ হলেও তখন পর্যন্ত একেবারে হাতের বাইরে যায়নি। কিন্তু চা বিরতির আগেই ধসে পড়ে আরও পাঁচটি উইকেট। আর প্রতিটি আউটের ধরন দেখলেই বোঝা যায়, সমস্যাটা ছিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায়।

নাজমুল হোসেন শান্ত নাথান লায়নের বলে সোজা লং অফে ক্যাচ তুলে দেন। অথচ ঠিক তার আগের বলেই একই রকম শট খেলে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। তবু শিক্ষা নেননি।

এই সিরিজে তিন ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে তিনবারই শূন্য রানে ফেরা লিটন দাস স্টার্কের বলে খোঁচা মেরে সহজ ক্যাচ দেন স্লিপে। আর মেহেদী হাসান মিরাজ অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের একটা বলে মারতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দেন।

এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট— স্টার্ক-কামিন্সদের অসাধারণ ডেলিভারিতে নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বারবার আউট হয়েছেন নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তে। শান্ত-লিটন-মিরাজের আক্রমণাত্মক শটের বাইরে অন্য ব্যাটসম্যানদের দিকে তাকালে, দ্বিতীয় ইনিংসে সাদমান ইসলাম শর্ট পিচ ধরনের বলে অস্বস্তিতে পড়ে ক্যাচ দিয়েছেন। মুমিনুল হক অফ স্টাম্পের বল ছেড়ে বোল্ড হয়েছেন। এসবই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ব্যাটসম্যানদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় কতটা ভুল ছিল।

 

লিটনের ডাকের হ্যাটট্রিক: কন্ডিশনের সমস্যা, নাকি প্রস্তুতির ঘাটতি?

ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশের ব্যর্থতার আরেকটি হতাশার ছবি লিটন দাস। অস্ট্রেলিয়া সফরে তিন ইনিংসে ব্যাটিং করে তিনবারই শূন্য রানে ফিরেছেন এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান।

ডারউইনে স্টার্কের করা অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে ড্রাইভ করতে গিয়ে আউট হয়েছিলেন লিটন। তবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে সেই ব্যর্থতা আড়ালে পড়ে যায়। কিন্তু ম্যাকাইয়ে দুই ইনিংসেই একই চিত্র। প্রথম ইনিংসে স্টার্কের ফুল লেন্থ ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরেছেন মাত্র ৫ বল খেলে। দ্বিতীয় ইনিংসেও সেই স্টার্কের বলেই অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরেন তিনি।

ম্যাকাইয়ের উইকেটের গতি, বাউন্স আর সুইংয়ের চ্যালেঞ্জ ছিল ঠিকই। কিন্তু লিটনের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে ডাকের হ্যাটট্রিক তাই প্রশ্ন উঠছে, লিটন কি কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট মতো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

এমন প্রশ্ন উঠছে অন্য আরেক কারণেও। চোটের কারণে শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সফরের স্কোয়াডে ছিলেন না তিনি। পরে দ্রুত সুস্থ হয়ে দলে যোগ দেন। কিন্তু এত দ্রুত ফেরা লিটন কি পুরোপুরি ফিট হতে পেরেছিলেন? কিংবা ফিট হলেও কি পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন? হ্যাটট্রিক ডাকের পর প্রশ্নটা উঠছে জোরেসোরেই

 

লোয়ার অর্ডারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা

মিরাজ যখন আউট হলেন, তখন বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ৬ উইকেটে ৬৮ রান। উইকেটের একপ্রান্তে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম ছিলেন। ইনিংস ব্যবধানে হার এড়াতে তখনো ৭৮ রান পিছিয়ে থাকলেও উইকেটে মুশফিক ছিলেন বলে কিছুটা ক্ষীণ আশা টিকে ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু মুশফিক টিকে থাকার চেষ্টা চালালেও, বারবার টেইল এন্ডারদের বোলারের সামনে ফেলে দেন। এতে যা হওয়ার- তাই হয়েছে। বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও আগেই।

এছাড়া টপ কিংবা মিডল অর্ডার ব্যর্থ হলে লোয়ার অর্ডারের ওপর যে বাড়তি চাপ পড়ে, সেটা সামলানোর মতো পরিকল্পনা বা সামর্থ্য— কোনোটাই এই ম্যাচে দেখা যায়নি।

 

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে— উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা, বিশ্বমানের পেস আক্রমণের বিপক্ষে টেকনিক্যাল দুর্বলতা, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি, লোয়ার অর্ডারের ওপর অতিরিক্ত চাপ, আর টপ অর্ডারের ধারাবাহিকতার অভাব— এসব কারণেই ম্যাকাইয়ে এমন ভরাডুবি হলো বাংলাদেশের।