মৃতপ্রায় ব্রাজিলকে জাগালো যে...

আবারও নিলস লিডহোমের শট!

তাতে ব্রাজিলের রক্ষণ পরাস্ত হয়েছে আগেই। গোলকিপার গিলমারেরও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া করার কিছু ছিল না। আর কিছু মাইক্রোসেকেন্ডের অপেক্ষা, এরপরই উড়ন্ত বলটা জড়াবে জালে, ম্যাচ শুরুর ছয় মিনিটের মাথায় বিশ্বকাপ ফাইনালের দ্বিতীয় গোল করার আনন্দে ভাসবে সুইডেন।

ম্যাচ শুরুর আগে জার্সির রঙ নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছিল দুই দল। দুই দলেরই জার্সির রঙ হলুদ - ব্রাজিলের কাছে যে রঙের গুরুত্ব নিয়ে আলাদা করে বলা লাগে না। নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা এই রঙ নিজেদের গায়ে জড়িয়ে আট বছর আগের মারাকানাজো-কান্নায় সুখের প্রলেপ দেবেন পেলে-গাহিঁশারা, এমনটাই আশা ছিল ব্রাজিলবাসীর। সুইডেনের স্বাগতিক হওয়ার ফায়দা সে আশাকে গলাচিপে মারতে সময় নেয়নি বেশি।

প্রস্তাব এল, সাদা জার্সিই পরেই নামা হোক! তাতে আঁতকে উঠল সেলেসাওদের একাংশ। মারাকানাজোর দিনেও যে ব্রাজিল এই রঙই পরেছিল! অগত্যা নীলই সই। ওদিকে হলুদ জার্সি পরেই ব্রাজিলীয়দের মতো খেলার ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছিল যেন সুইডেন - অন্তত ম্যাচের প্রথম ছয় মিনিট সে কথাই বলছিল!

লিডহোমের শটে ফেরা যাক। ডাগআউটে থাকা কোচ ভিসেন্তে ফিওলা, ব্রাজিলের হয়ে গলা ফাটানো দর্শক, মাঠে থাকা গিলমার-ভাভা-গাহিঁশা-পেলে ; সবার কাছে তখন এক-একটা মুহূর্ত অনন্তকালের সমান। লিডহোমের শট জালে জড়ানো মানে শুধু ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে যাওয়াই নয়, একই সঙ্গে আট বছর ধরে বুকের কানাগলিতে বাস করা মারাকানাজো নামের কষ্টটারও জেগে ওঠার উপলক্ষ, উপলক্ষ সকল কুসংস্কার, নেতিবাচক চিন্তা ও হতাশার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার।

মাথাচাড়া! হ্যাঁ, সেটা হলো ঠিকই। কিন্তু কোনো হতাশা, ভয় বা শঙ্কা নয়, মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেন রক্তমাংসেরই একজন। গিলমাররা যখন চেয়ে চেয়ে পোস্টের মধ্যে বল ঢুকে যাওয়া দেখছিলেন, তিনি বসে থাকেননি। বলা ভালো, আট বছর আগের সেই কষ্টটাই তাঁকে বসে থাকতে দেয়নি। সেবার সেনাসদস্য হয়ে মারাকানা বিশ্বকাপ ফাইনালে দর্শক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সামনাসামনিই দেখেছিলেন নিজের দেশের বিশ্বকাপ-স্বপ্নকে ধূলার সঙ্গে মিশে যেতে। এবার যেন সেটা না হয়, সেটা ভাবতে ভাবতেই লেফট উইং থেকে দৌড়ে চলে এসেছিলেন রক্ষণে সাহায্য করতে।

সে সাহায্যটাই ম্যাচের ওই পর্যায়ে দ্বিতীয় গোল হজম করতে দেয়নি ব্রাজিলকে। মেরেকেটে সাড়ে পাঁচ ফুটের কিছু বেশি উচ্চতার মানুষটাই হেড করে লিডহোমের শটটা ক্লিয়ার করলেন গোললাইন থেকে - আক্ষরিক অর্থেই ‘মাথাচাড়া’ দেওয়া আরকি!

মৃতপ্রায় ব্রাজিলকে জাগালো সেই ‘হেড’। আড়মোড়া ভেঙে উঠলেন ভাভা-পেলে-গাহিঁশারা। ম্যাচ শেষ হলো ব্রাজিলের জয়গান দিয়ে, ৫-২ গোলের স্কোরলাইনে। যে পাঁচ গোলের চতুর্থটা তাঁরই করা।

মারিও জাগালো। আক্ষরিক অর্থেই ব্রাজিলকে সেবার জাগিয়ে তুলেছিলেন যিনি!

বাবা ছিলেন হিসাবরক্ষক। হিসেবি বাবার ছেলে, সঙ্গে অতীতে মিলিটারি-অভিজ্ঞতা থাকার কারণেই কি না - পরিমিতিবোধ জিনিসটা ছিল তাঁর মাঝে। ব্রাজিলের ভুবনভোলানো ফুটবলশৈলীর অনুরাগী ছিলেন আর দশজনের মত, কিন্তু সে সৌন্দর্যের স্বাধীনভাবে ফুটে ওঠার জন্য খেলার মাঠে কিছু ক্ষেত্রে যে ত্যাগ স্বীকার করা লাগে, হিসেবি থাকা লাগে - বুঝতেন। আর সে হিসেবি থাকার দায়িত্ব, ত্যাগ স্বীকার করার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিতেন। পেলে-গাহিঁশাদের পায়ে যেন ফুটবলের সকল সৌন্দর্য লুটিয়ে পড়ে, সে পায়ের চলার পথের সকল কাঁটা সরানোর দায়িত্ব পালন করতেন তিনি নিজেই। না হয় ভেবে দেখুন, ব্রাজিলের কোন উইঙ্গার তখন নিচে নেমে এসে রক্ষণে সাহায্য করতে গিয়ে গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করে দেওয়ার মানসিকতা রাখতেন?

জাগালো ছিলেন ওই দলে। কাগজে-কলমে এখনও সবাই বলে, ব্রাজিল নাকি ৪-২-৪ ছকেই ১৯৫৮ বিশ্বকাপ জিতেছে। আক্রমণভাগের একদম বাঁয়ে জাগালো, ডানে গাহিঁশা, মাঝে পেলে আর ভাভা। এই চারজনের মধ্যে শুধু জাগালোই নিচে নেমে মাঝমাঠের শক্তি বাড়াতেন, রক্ষণে সাহায্য করে আসতেন - ফলে ছকটা ৪-৩-৩ হয়ে যেত। মাঝমাঠে জিজি আর জিতো একা পড়ে যাচ্ছে? ডাকো জাগালোকে। লেফটব্যাক নিলতন সান্তোস উপরে চলে গেলে বাঁদিকের রক্ষণ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে? জাগালো আছে না!

এ হিসেবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে ৪-৩-৩ ছকের সর্বপ্রথম সফল প্রয়োগ এসেছে ব্রাজিলের হাত ধরেই - এসেছে জাগালোর ত্যাগী মানসিকতার কারণে। ৪-৩-৩ ছকে জাগালোর মতো ত্যাগী খেলোয়াড়দের গুরুত্ব কতটুকু, তা সম্ভবত ব্লেইজ মাতুইদিকে (২০১৮ বিশ্বকাপে) খেলানোর সময় দিদিয়ের দেশোঁ, বা মাউরো কামোরানেসিকে (২০০৬ বিশ্বকাপ) খেলানোর সময় মাথায় রেখেছিলেন মার্চেলো লিপ্পি।

কোচ জাগালোও পরিমিত সৌন্দর্যের এই মাহাত্ম্যটা বুঝতেন। জানতেন, জেতার জন্য এই পরিমিতিবোধের বিকল্প নেই। ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠেছে সে কথাই, ‘আমি সুন্দর খেলে জিততে চাই। বাজে খেলে জিততে চাই। কথা একটাই, জিততে চাই। না জিতলে সুন্দর খেলি বা বাজে খেলি - কিচ্ছু যায় আসে না!’

প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে জোয়াও সালদানিয়ার কথা। এই ভদ্রলোকও পরিমিত সৌন্দর্যের সূত্রটা বুঝতেন না। ১৯৭০ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর কাঠফাটা রোদে খেলা হবে শুনেই দল ভরে ফেললেন শারীরিকভাবে শক্তসমর্থ, পরিশ্রমী খেলোয়াড় দিয়ে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ভূতও যে তখন ব্রাজিলকে তাড়া করছিল না, বলা ভুল হবে। চার বছর আগের সে বিশ্বকাপে ইউরোপীয়দের কড়া ট্যাকল আর মারমুখী ফুটবলে পেলেরা বুঝেছিলেন, শুধু কারিকুরি দেখিয়ে হবে না।

সালদানিয়াও বুঝেছিলেন, একটু বেশিই বুঝেছিলেন। ‘পেলে নিচে নেমে রক্ষণকে সাহায্য করতে পারে না’, ‘চোখে কম দেখে’, ‘জেয়ারজিনিও থাকলে রিভেলিনোর দরকার নেই’, ‘পেলে থাকতে তোস্তাও কেন’, ‘গারসনের মাথায় সমস্যা’ - এমন হাজারো কারণ দেখিয়ে ব্রাজিলকে অপরিচিত এক দল বানিয়ে ফেললেন। যেখানে শ্রম-নিয়মের কাঠিন্য থাকলেও, ছিল না সৌন্দর্যের লালিত্য। পেলে তো রেগেমেগে জানিয়েই দিলেন, আর বিশ্বকাপে খেলবেন না! ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতি করার কারণে রাষ্ট্রপতি এমিলিও মেদিচিরও চক্ষুশূল ছিলেন সালদানিয়া।

কোচ-রাষ্ট্রপতির বৈরিতা, ফুটবলীয় দর্শন নিয়ে টানপোড়েন, জাতীয় দলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি - সবকিছু মিলিয়ে ব্রাজিলের ফুটবল তখন মৃতপ্রায়।

সেলেসাওদের জাগানোর দায়িত্ব আবারও সেই জাগালোর কাঁধেই পড়ল। পরিমিত সৌন্দর্যবোধের সূত্র ধরে এমন এক একাদশ গঠন করলেন, যেখানে বল পায়ে পাঁচজন থাকতেন আক্রমণাত্মক ভূমিকায়, পাঁচজন রক্ষণাত্মক। কাগজে কলমে ব্রাজিল সেই ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ ছকেই ফিরে গেল। তবে পেলে আর তোস্তাওয়ের মধ্যে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে কে খেলবেন, কেউই জানত না। পরিস্থিতি অনুযায়ী ডিবক্সে পেলেকে জায়গা করে দিতেন তোস্তাও, বা তোস্তাওকে পেলে। আর দুজনই একটু নিচে নেমে গেলে ডানদিক থেকে জেয়ারজিনিও এসে সরাসরি বক্সে ঢুকে যেতেন। করিন্থিয়ানসের সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা - দিয়েগো ম্যারাডোনা যাকে তাঁর আইডল হিসেবে মনে করেন - সেই রিভেলিনো চলে যেতেন বাঁদিকে - যখন পেলে বা তোস্তাওয়ের কেউ নিচে নেমে আসতেন। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগের সংযোগ ঘটাতেন গারসন - ‘ডিপ লায়িং’ প্লেমেকার হিসেবে। এই পাঁচজনের রসায়ন এতটাই ভালো ছিল, কে-কখন-কোথায়-কীভাবে থাকবেন, আগে থেকেই বুঝে যেতেন, তাই প্রথাগত ছকের গণ্ডিতে তাঁদের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা যেত না। পাঁচজনের প্রত্যেককেই ‘নাম্বার টেন’ ভূমিকাই খেলানো যেত, যেখানে একাদশে দুজন ‘নাম্বার টেন’ খেলানোই বিলাসিতা, সেখানে পাঁচ-পাঁচজন? জাগালো দেখিয়ে গেছেন সেই সত্তরেই!

আর এমন সব উদ্ভাবনী ফুটবলীয় কৌশলের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বজয়ের অদম্য মানসিকতা। ব্রাজিলের পাঁচবার বিশ্বজয়ের ইতিহাসের চারটায় জাগালোর স্পর্শ লেগেছে তো এভাবেই - কখনও খেলোয়াড় (১৯৫৮, ১৯৬২), কখনও কোচ (১৯৭০), বা কখনও সহকারী কোচ (১৯৯৪) হিসেবে।

যে স্পর্শ ব্রাজিলের ফুটবলকে বারবার মরণদুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনে, চারবার বিশ্বকাপ জেতা তো তাঁরই মানায়, তাই না?