এই তো গত বছরের শুরুটা হয়েছিল চমক জাগানো এক খবর দিয়ে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ইউরোপের মায়া ছেড়ে চলে গেলেন সৌদি প্রো লিগে। এবং ঘোষণা দিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের একটির চেয়েও সেরা হতে যাচ্ছে তাঁর নতুন লিগ।
ছয় মাস পর দলবদলের বাজার খুলল, রোনালদোকে সত্যি প্রমাণ করে ঝাঁকে ঝাঁকে বড় বড় তারকারা সবাই ছুটলেন পেট্রো ডলারের পেছনে। বর্তমান বালন দ’র জয়ী করিম বেনজেমা, নেইমার, সাদিও মানে, ফিরমিনোর মতো পরিচিত নাম যেমন আছে, রুবেন নেভেস, ভেইগার মতো প্রতিশ্রুতিশীল তরুণরাও ছুটেছেন সৌদি আরবে।
কিন্তু ছয় মাস না যেতেই এঁদের অনেকের মোহভঙ্গ হয়েছে। ফিরমিনো নাকি সৌদি ছেড়ে ইউরোপে ফিরতে চান, ইউরোপে কেউ না ডাকলে ব্রাজিলে যাবেন। তাঁর সাবেক লিভারপুল সতীর্থ জর্ডান হেন্ডারসনও ইংল্যান্ডে ফেরার ইচ্ছা জানিয়েছেন। কিন্তু কেন তাদের জন্য ফেরা কঠিন হবে সেটা জানানো হয়েছে দ্য অ্যাথলেটিকের এক প্রতিবেদনে।
গত জুলাইয়ে হেন্ডারসনের সৌদি আরবে যাওয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। বিশ্বকাপে সমকামিতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হেন্ডারসন কেন এমন এক দেশে যাচ্ছেন যেখানে সমকামকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়?
এমন প্রশ্নের জবাবে হেন্ডারসন বেশ কিছু যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘এমন কিছু করতে চাই যা আমাকে রোমাঞ্চিত করে। এমন কিছু যাতে মনে হয় আমি কিছু যোগ করতে পেরেছি (…), নতুন কিছু করতে চাই- নতুন চ্যালেঞ্জ এবং আরও কিছু কারণ।’
হেন্ডারসন বলেছিলেন, সৌদি আরবে গিয়ে ফুটবলের পাশাপাশি মানবাধিকারের বিভিন্ন ইস্যু নিয়েও কাজ করতে চান। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই চ্যালেঞ্জটা আর উপভোগ করছেন না হেন্ডারসন। মাঠের ফুটবলে না পারছেন দাপট দেখাতে, আর সৌদি আরবের জীবনযাপনের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারছেন না। তাই আবার ইংল্যান্ডে ফিরতে চান হেন্ডারসন।
কিন্তু বলা যত সহজ, ফেরা ততটাই কঠিন। কারণ, চ্যালেঞ্জ বা অন্য কারণ নয়, অধিকাংশ ফুটবলার সৌদি আরবে গিয়েছিলেন মূলত একটি কারণে- অর্থ। ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করে আসা হেন্ডারসন মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে সপ্তাহে ৭ লাখ পাউন্ড আয় করেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে দামি তারকাও এমন বেতনের কথা চিন্তা করতে পারেন না। ৩৬ পেরিয়ে যাওয়া হেন্ডারসনকে বর্তমান বেতনের চার ভাগ বেতনেও হয়তো কেউ নিতে রাজি হবে না।
আর আয়করের হিসেব তো এখনো করাই হয়নি। সৌদি আরবে হেন্ডারসনদের আয়ের পুরোটাই তাদের পকেটে যায়। বড় তারকাদের টানতে আয়করে দারুণ এক সুবিধা দিয়েছে দেশটি। ফুটবলারদের এক পয়সাও কর দিতে হয় না। ওদিকে যুক্তরাজ্যে বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার ১৪০ পাউণ্ডের বেশি আয় করলেই ৪৭% আয়কর দিতে হয়!
ধরা যাক, সেটা মেনে নিয়েই হেন্ডারসন ইংল্যান্ডে ফিরবেন। কারণ, এমন আয়কর দিয়েই তো তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। এতগুলো বছর প্রিমিয়ার লিগে করও দিয়েছেন। কিন্তু এতেই ঝামেলা শেষ নয়। কারণ, সৌদি আরবে যাওয়ার সময়ই শর্ত দেওয়া হয়েছিল। অন্তত দুই বছর থাকলেই শুধু করমুক্তের সুবিধাটা পাবেন ফুটবলাররা। এ আগে চলে গেলে, তাদের আয়ে ২০% কর প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ, গত ছয় মাসে হেন্ডারসন বা তাঁর মতো আর যারা সৌদি আরব ছাড়তে চান, তাঁরা যা আয় করেছেন, তার ২০% রেখে আসতে হবে। কিন্তু ঝামেলা এখানেই শেষ হচ্ছে না।
সৌদি আরবে যাওয়া ফুটবলারদের একটা বড় অংশ খেলতেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোতে ব্রাত্য হয়ে পড়া ফুটবলাররা এখন যদি আবার ইংল্যান্ডে ফিরতে চান, তবে যুক্তরাজ্যের কর আইন আবার ঝামেলা সৃষ্টি করবে।
কারণ ইংল্যান্ড থেকে অন্য কোনো দেশে গিয়ে বসবাস করলে সে দেশের আইন প্রযোজ্য হওয়ার কথা থাকলেও তাতে কিছু শর্ত আছে। কর আইন বিশেষজ্ঞ পিট হ্যাকলটন ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে যুক্তরাজ্যের ট্যাক্স রেসিডেন্সি থেকে বাঁচতে হয়, ‘নিয়মে বলা আছে, এই সুবিধা পেতে চাইলে, অর্থাৎ যেদিন দেশ ছেড়েছেন সেদিন থেকে নন-রেসিডেন্স হতে চাইলে, আপনাকে সে কর বছরের বাকিটা বাইরে থাকতে হবে এবং পরের বছরটাও বাইরে থাকতে হবে। ২০২৩ এর গ্রীষ্মে যারা গেছে, সে খেলোয়াড়দের ২০২৪ এর ৫৫ এপ্রিলের পর পর্যন্ত বাইরে থাকতে হবেন এবং পরের পুরো অর্থ বছরও বাইরে থাকতে হবে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত।’
হ্যাকলটন আরেকটু ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ধরুন সেখানে গিয়ে আপনি বছরে ২ কোটি ডলার আয় করলেন এবং আপনি দেড় বছর কাটিয়ে ফিরে এলেন, আপনি হয়তো জানেনও না যে এই ৩ কোটি ডলার যুক্তরাজ্যের করদায়ে পড়ে যাচ্ছে, কারণ আপনি অর্থ বছরের পুরোটা বাইরে ছিলেন না। ’
অর্থাৎ আয়ের পার্থক্যটা অনেক। হেন্ডারসনের যে বেতন পাচ্ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তা যদি সত্যি হয়, সপ্তাহে ৭ লাখ পাউন্ড বেতন মানে বছরে ৫ কোটি ৮৮ লাখ পাউন্ড। সৌদি আরবে থাকলে পুরোটাই হেন্ডারসনের পকেটে ঢুকবে। কিন্তু যুক্তরাজ্যে ফিরলে সেটা ৩ কোটি ২৩ লাখ পাউন্ডে নেমে আসবে।
যুক্তরাজ্যের ট্যাক্স রেসিডেন্সির বাইরে থাকতে চাইলে, একজন খেলোয়াড় বছরে ৯০ দিনের বেশি দিন যুক্তরাজ্যে থাকতে পারবেন না এবং এর মধ্যে কোনো কাজে যোগ দিলে টানা ত্রিশ দিন কাজ করতে পারবেন না। ফলে হেন্ডারসন যদি মৌসুমের মাঝপথে ফিরে আসেন, তাহলে যুক্তরাজ্যের সাধারণ কর আইনের আওতায় পড়ে যাবেন এবং বিপুল অঙ্কের কর দিতে হবে তাঁকে।
সৌদি আরবে মন টিকছে না কিন্তু ৪৭% করও দিতে আগ্রহী নন, এমন ফুটবলাররা তাহলে কী করবেন? ‘আপনি সৌদি আরবে নয় মাস বা এক বছর কাটালেন, এরপর আপনি স্পেন বা জার্মানি গেলেন, আপনি চাইলে কিন্তু সে সুযোগটা নিতে পারেন।’
তবে এ ক্ষেত্রে কিছু অঙ্ক কষে যেতে পারলে ভালো। কারণ, স্পেনে আবার কর আইনের হিসেবটা ১৮৩ দিনের। অর্থাৎ সেখানে ১৮৩ দিন থাকলে সে দেশের উচ্চ করহার প্রযোজ্য হবে, ‘ধরুন, আপনি যুক্তরাজ্য থেকে ২০২৩ এর গ্রীষ্মে সৌদি আরবে গেলেন এবং ২০২৪ এর গ্রীষ্মে আবার যুক্তরাজ্যে ফেরার প্রস্তাব পেলেন। তখন আপনি ২০২৪ এর জুলাইয়ে স্পেনে গেলেন। সেখানে ওরা করের ক্ষেত্রে পঞ্জিকাবর্ষ হিসেব করে, ফলে আপনি জুলাইয়ে গেলে কোনোভাবেই স্পেনে ১৮৩ দিন থাকা হচ্ছে না। এতে যেদিন থেকে আপনি স্পেনে বেতন পাবেন, শুধু সেদিনগুলোর জন্য কর প্রযোজ্য হবে। স্পেনে যাওয়ার আগে অন্য দেশে যাই আয় করুন না কেন, তা সেখানে হিসেব হবে না।’
প্রশ্ন হলো, এত ঝামেলা ও হিসাব মিলিয়ে কতজন আবার ইউরোপে ফেরার চিন্তা করবেন, যেখানে বেতনটা সৌদি আরবের চেয়ে এমনিতেও অনেক কম হবে?