শিখদের সঙ্গে ঘড়িতে সময় বারোটা নিয়ে স্থুল রসিকতা ভারতীয় উপমহাদেশে বেশ পুরোনো। তবে এই রসিকতার সূত্র খুঁজতে গেলে উঠে আসে মুঘলদের সময়ে শিখদের বীরত্বের গল্প, যা রসিকতায় কীভাবে রূপ নিয়েছে সেটাই বরং আশ্চর্যের বিষয় বলে মনে হতে পারে।
গত ৯ জুন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের ম্যাচের সময় শিখদের নিয়ে এই স্থুল রসিকতারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সাবেক উইকেটকিপার কামরান আকমল। এরপর চারিদিকে সমালোচনার জেরে ক্ষমা চেয়েছিলেন বটে, তবে তাতেও নিস্তার পাননি। নতুন এক ভিডিওতে ক্ষমা চাওয়ায় কামরানকে সাধুবাদ জানালেও শিখদের নিয়ে এই স্থুল রসিকতাকারীদের ‘অপদার্থ’ বলেছেন ভারতের সাবেক অফস্পিনার হরভজন সিং।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের শেষ ওভারের কথা। পাকিস্তানের দরকার ছিল ১৮ রান, বোলিংয়ে ছিলেন শিখ ধর্মাবলম্বী ভারতীয় পেসার আর্শদীপ সিং। পাকিস্তানের এআরওয়াই টিভিতে বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করতে থাকা কামরান তখন বলে বসেন, ‘যেকোনো কিছু হতে পারে। শেষ ওভার আর্শদ্বীপ সিং বল করবে। খুব একটা ছন্দে আছে বলে মনে হচ্ছে না। আর এর মধ্যে ১২টা বেজে গেছে।’
শিখদের নিয়ে স্থুল এই রসিকতা যখন পাকিস্তানেরই একজন সাবেক ক্রিকেটার করলেন, তা-ও জাতীয় একটি টিভি চ্যানেলে, স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনা শুরু হয় চারিদিকে। হরভজন সে সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে কামরানকে ধুয়ে দিয়েছেন।
চারিদিকে সমালোচনার পর কামরান অবশ্য হরভজন ও শিখ সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। বলেছেন, ‘আমার সাম্প্রতিক মন্তব্যের জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত এবং হরভজন সিং ও শিখ সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমার কথা অগ্রহণযোগ্য ও অপমানদায়ক ছিল। বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়ের জন্য আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে এবং কাউকে আঘাত দিতে চাইনি। আমি আসলেই দুঃখিত।’
তবে এতেও একেবারে থেমে যায়নি। নতুন এক ভিডিওতে যেন ঝিকে মেরে বৌকে শিখিয়েছেন হরভজন। কামরানের ক্ষমা চাওয়াকে সাধুবাদ জানিয়েও তাঁর মতো যাঁরা শিখদের নিয়ে এই স্থুল রসিকতা করে তাদের একহাত নিয়েছেন ‘ভাজ্জি।’
সংবাদমাধ্যম এএনআই-এর এক্স চ্যানেলে প্রচারিত ভিডিওতে হরভজন প্রথমে কামরানের ওই মন্তব্য এবং এই রসিকতাকারীদের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘খুবই ফালতু একটা কথা ছিল এটা, খুবই শিশুতোষ। অপদার্থ লোকেরাই কেবল এমন কিছু করতে পারে। কামরান আকমলের বোঝা উচিত যে কারও ধর্ম নিয়ে এমন কিছু বলা বা ঠাট্টা করা ঠিক না।’
এরপর কামরান আকমল এবং রসিকতাকারীদের এই রসিকতার পেছনের গৌরবৌজ্জ্বল ইতিহাস শিখিয়েছেন হরভজন, ‘কামরান আকমলকে আমি শুধু এটাই জিজ্ঞেস করতে চাই – তুমি কি শিখদের ইতিহাস জানো? শিখরা কারা ছিল, তোমার সম্প্রদায় আর তোমার মা-বোনদের নিরাপত্তার জন্য কী করেছে সেটা জানো? তোমার গুরুজনদের জিজ্ঞেস করে দেখো। বারোটার সময়ে শিখরা মুঘলদের আক্রমণ করে তাদের হাত থেকে মায়েদের-বোনদের ছিনিয়ে নিয়ে আসত। তাই বলি, ফালতু কথা বলা বন্ধ করো।’
তবে কামরানের ক্ষমা চাওয়াকে সাধুবাদও জানিয়েছেন হরভজন, ‘এটা ভালো লাগছে যে ও দ্রুত বুঝতে পেরেছে এবং ক্ষমা চেয়েছে। তবে ওর এরপর কখনো শিখদের, বা কোনো ধর্মকেই ছোট করে কিছু বলা ঠিক হবে না। আমরা সব ধর্মকেই সম্মান করি – সেটা হিন্দুত্বই হোক, ইসলামই হোক, শিখ হোক বা খ্রিস্টান।’