রেয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, স্পেন… স্প্যানিশরাই কেন সব জেতে

ছেলেদের জাতীয় দল এই কদিন আগে ইংল্যান্ডকে ফাইনালে হারিয়ে ইউরো জিতেছে। সে পথে কাকে হারায়নি! গ্রুপ পর্বে হারিয়েছে ইতালি আর ক্রোয়েশিয়াকে, ফাইনালে ওঠার পথে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানি আর সেমিফাইনালে ফ্রান্স…ইউরোপের সেরা দলগুলোর প্রায় সবাইকেই হারানো হয়ে গেছে। আর শুধু কী হারানো! টুর্নামেন্টজুড়ে কী দারুণ আকর্ষণজাগানিয়া ফুটবলই না খেলেছে স্পেন!

এতটা দাপট নিয়ে, এত বড় দলকে হারিয়ে, এতটা মন ভরিয়ে আর কোন দল কবে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জিতেছে, সেটা নিয়েই বরং আলোচনা হতে পারে।

তবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীন ছেলেদের এই দলের সাফল্যেও সম্ভবত একেবারে ভেসে যাচ্ছে না স্পেন। তাদের চোখে যে এমন সাফল্য যে ডালভাতের মতো, নিয়মিতই যার দেখা মেলে। ছেলেদের আন্তর্জাতিক দল বলুন বা মেয়েদের, বয়সভিত্তিক দলও দেখুন, কিংবা বলুন ক্লাব ফুটবলে রেয়াল মাদ্রিদ বা কয়েক বছর আগের বার্সেলোনার কথা – স্প্যানিশ দলগুলো যেন ইউরোপের ফুটবলে দাপুটে।

গত বছরই তো, স্প্যানিশ মেয়েদের সিনিয়র দল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছে! ওই বিশ্বকাপেরই শিরোপামঞ্চে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সে সময়ের সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসের যৌন নিপীড়নমূলক কাজ শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ মেয়েদের শিরোপার আনন্দেই জল ঢেলে দিয়েছে, তবে তাতে শিরোপা তো হারিয়ে যায়নি। ক্লাব ফুটবলে রেয়াল মাদ্রিদ ছেলেদের ফুটবলে আর বার্সেলোনা মেয়েদের ফুটবলে ছড়ি ঘোরাচ্ছে - ছেলেদের সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে মাদ্রিদ, মেয়েদের চ্যাম্পিয়নস লিগ বার্সেলোনা। আজ শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত দশটায় ফ্রান্সকে হারাতে পারলে অলিম্পিকে ছেলেদের ফুটবলের সোনাও জিতবে স্পেন! মেয়েরাও অলিম্পিকের সেমিফাইনালে উঠেছিল, তাতে ব্রাজিলের বিপক্ষে বল পায়ে ছড়ি ঘোরালেও পাল্টা আক্রমণে কুপোকাত হয়েছে, হেরেছে ৪-২ গোলে।

তা ফুটবলে কেন এতটা দাপট স্পেনের? এ নিয়ে গবেষণা করেছে সংবাদসংস্থা বিবিসি। সেটির কিছু অংশ ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো -  

জিতেছ? এ আর এমন কী!

২০১২ ইউরোর পর এবারই প্রথম স্পেনের ছেলেদের জাতীয় দল কোনো শিরোপা জিতল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এবারের ইউরোর আগে গত এক দশকে স্পেন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ধুঁকেছে। তবে ছেলেদের দল এই এক যুগে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও মেয়েদের ফুটবল, বয়সভিত্তিক ফুটবল, কিংবা ছেলে বা মেয়েদের ক্লাব ফুটবল – স্প্যানিশ দলগুলো টুর্নামেন্টের প্রায় শেষ অবধিই গেছে। আর যখন ফাইনালে উঠেছে, নিশ্চিত করেছে, তারা শিরোপা নিয়ে ফিরছে।

প্রমাণ চাই? বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ (বা আগের উয়েফা কাপ)… যে টুর্নামেন্টেই হোক, সর্বশেষ যে ২৭ বার স্পেন বা স্প্যানিশ কোনো দল টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছে, ২৭ বারই জয়ী দলটি ছিল স্প্যানিশ!

স্পেনের মেয়েদের ফুটবলে তো উন্নতিটা আরও দ্রুতগতিতে হচ্ছে। গত বছর ইংল্যান্ডকেই ফাইনালে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতা স্প্যানিশ মেয়েদের জাতীয় দল এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে খেলেছেই মাত্র তিনবার, প্রথম খেলেছে ২০১৫ সালে। মেয়েদের সর্বশেষ নেশনস লিগ জয়ী দলও স্পেন। ওদিকে ক্লাব ফুটবলে মেয়েদের চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বশেষ দুবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। ছেলেদের চ্যাম্পিয়নস লিগে যে অবস্থা রেয়াল মাদ্রিদের – সর্বশেষ মৌসুমের শিরোপাটি ছিল সর্বশেষ তিন মৌসুমে মাদ্রিদের দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৮ – এই পাঁচ বছরে তো হ্যাটট্রিকসহ চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেই!

বয়সভিত্তিক ফুটবলে শিরোপা তো আছেই। বার্সেলোনার হয়ে দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা সালমা পারাইয়েলো গত বছর স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলেও ছিলেন। এবার অলিম্পিক দলেও খেলেছেন। ২০ বছর বয়সী এর আগে স্পেনের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ আর অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরোও জিতেছেন। এই তরুণী গত বছর ফিফায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা সবই জিতে চলেছি। আমরা আসলে জেতাটাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলছি। যা হচ্ছে, সেটা অবিশ্বাস্য।’

কোচের বদল? অত সহজ নয়

স্পেনকে এবার ইউরো জেতানোর পথে নতুন ঢংয়ের ফুটবলে মুগ্ধতা ছড়ানো লুইস দে লা ফুয়েন্তে স্প্যানিশদের কোচ হয়েছিলেন ২০২২ সালে। তবে এর আগে স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ আর অনূর্ধ্ব-২৩ দলেরও কোচ ছিলেন তিনি। অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ পর্যায়ে স্পেনকে ইউরো জিতিয়েছেন, এবার জাতীয় দলকেও জিতিয়েছেন।

গত বছর মেয়েদের দলকে বিশ্বকাপ জেতানো কোচ হোর্হে ভিলদা শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসের ‘চুমু-কান্ডে’র জেরে স্পেনে যে পালাবদল ঘটেছে, তাতে বরখাস্ত হয়েছেন। তবে তার আগে ৮ বছর স্পেনের মেয়েদের দলের কোচ ছিলেন ভিলদা। আর জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে? অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ মেয়েদের দলের কোচ ছিলেন। ভিলদার জায়গায় দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁরই সাবেক সহকারী কোচ মন্তসে তোমে – স্পেনের প্রথম মেয়েদের দলের প্রধান কোচ। দায়িত্ব নিয়ে স্পেনকে নেশনস লিগও জিতিয়েছেন।

সাবেক ফুটবলার ও বর্তমানে সাংবাদিক মারিয়া গারিদো এ নিয়ে বিবিসিতে বলেছেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় থেকে কোচদের পদোন্নতি দেওয়ার এই রীতি স্প্যানিশ জাতীয় দলগুলোর মধ্যে ট্যাকটিক্যাল ধারা ও দর্শনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার পথ শক্তিশালী করেছে। এই অনায়াস বদলের কারণে খেলোয়াড়েরা পরিচিত নেতৃত্বের অধীনে বেড়ে ওঠে, এতে যুব পর্যায় থেকে জাতীয় দলে একই রকম দলবদ্ধ হয়ে খেলার ধরন নিশ্চিত করে।’

দল কীভাবে খেলবে, তা দলের সবারই জানা

এই শতাব্দীর শুরুর দশকের শেষভাগ থেকে গত দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত স্পেনের ছেলেদের জাতীয় দল যখন বিশ্বকাপের আগে-পরে টানা দুই ইউরো জিতেছে, তখন স্পেনের খেলার ধরন একই ছিল। বলে এক স্পর্শের মাধ্যমে নিরন্তর ছোট ছোট পাস আর খেলোয়াড়দের অবিরত জায়গা বদলের মধ্য দিয়ে ত্রিভূজ গঠনের ওই প্রক্রিয়ার নামও সবার জানা – তিকিতাকা।

সে দিন এখন গত, সর্বশেষ ইউরোতে স্পেনের ফুটবলকে একেবারে নিখুঁত তিকিতাকা কেউ বলবে না। স্পেন এখন পাল্টা আক্রমণে দুই-তিন পাসেও নিজেদের বক্স থেকে প্রতিপক্ষ বক্সে চলে যেতে পারে। তবে তিকিতাকার সেই কৌশলের চেনা পথটা থেকে একেবারে সরেও আসেনি স্পেন। বলা যায়, তিকিতাকার তূণে ‘কাউন্টার অ্যাটাকে’র অস্ত্র বাড়তি যোগ করেছে স্পেন। বল দখলে রেখে পাসিং ফুটবলই খেলবে, ‘হুয়েগো দে পসেসিওন’ এখনো স্পেনের মূলমন্ত্র, তবে একমাত্র মন্ত্র নয়।

প্রয়োজনে বলের দখল প্রতিপক্ষের পায়ে দিয়ে পাল্টা আক্রমণের কৌশলে খেলতেও স্পেনের আপত্তি নেই। এবার ইউরোর গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পথেই যেমন, প্রতিপক্ষের চেয়ে বলের দখল কম ছিল স্পেনের। ২০০৮ ইউরোর ফাইনালের পর ১৩৭তম ম্যাচে এসে স্পেন দলে যা প্রথম দেখা গেছে!  

বল পায়ে রেখে দৌড়ানো, পাসিং-রিসিভিং – সে টেকনিক আর খেলোয়াড়েরা কে কখন কোন জায়গায় থাকবেন – পজিশনিংয়ের সে ধারণাই এখন স্প্যানিশ ফুটবলের মূল উপাদান। তবে এখানেও সেই একই ধারা – ছেলেদের জাতীয় দলে খেলার ধরনটাই আপনি দেখতে পাবেন মেয়েদের দলে, কিংবা বয়সভিত্তিক যেকোনো দলে। উদ্দেশ্য? খেলোয়াড়েরা যাতে এই ধরণটার সঙ্গে শুরু থেকেই পরিচিত থাকে। কোচদের দায়িত্ব সেখানে কোন পজিশনে কোন খেলোয়াড়কে রাখলে দল হিসেবে স্পেন আরও ভালো খেলতে পারবে সেটি নিশ্চিত করা।

ইউরোর ফাইনালের পর ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক ডিফেন্ডার মিকাহ রিচার্ডস বলছিলেন, ‘এই স্পেন দলের যে ব্যাপারটা অসাধারণ তা হলো, ওরা জানে দলে কার কী ভূমিকা এবং কীভাবে দলের অংশ হয়ে খেলতে হয়। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে, আমরা শুধু মাঠে আমাদের সেরা খেলোয়াড়দের নামিয়ে দিই। কিন্তু এই স্প্যানিশ দলটা খেলার একটা ধরন দাঁড় করিয়েছে এবং এমন সব খেলোয়াড় নির্বাচন করেছে যারা এই সিস্টেমে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারবে।’ছেলেদের আন্তর্জাতিক দল বলুন বা মেয়েদের, বয়সভিত্তিক দলও দেখুন, কিংবা বলুন ক্লাব ফুটবলে রেয়াল মাদ্রিদ বা কয়েক বছর আগের বার্সেলোনার কথা – স্প্যানিশ দলগুলো যেন ইউরোপের ফুটবলে দাপুটে।