রেয়াল ভায়াদোলিদের মাঠে গতকাল ২-১ গোলের জয়ের পর বার্সেলোনা আশায় ছিল, আজ নিজেদের মাঠে সেলতা ভিগোর কাছে রেয়াল মাদ্রিদ পয়েন্ট হারাক। তাতে আগামী রোববার এল ক্লাসিকোতে মাদ্রিদকে হারিয়েই শিরোপা জেতার সুযোগ আসত বার্সার সামনে।
কিন্তু সান্তিয়াগো বের্নাবাউয়ে আজ মাদ্রিদ ধুঁকলেও শেষ পর্যন্ত জয়টা ঠিকই তুলে নিয়েছে। ৪৮ মিনিটের মধ্যে তিন গোল করে ফেললেও শেষ পর্যন্ত মাদ্রিদের জয়টা এসেছে ৩-২ গোলে, ম্যাচের শুরু আর শেষে থিবো কোর্তোয়া বড় বাধা হয়ে না দাঁড়ালে মাদ্রিদের তিন পয়েন্ট পাওয়াই হয়তো হতো না।
তবে মাদ্রিদের জয়ে ফুটবলপ্রেমীদের খুশি হওয়ার কথা। গতকাল বার্সার জয়ের পর আজ মাদ্রিদ জেতায় যে নিশ্চিত হলো, আগামী রোববার এল ক্লাসিকো হয়ে উঠছে মহারণ। দুই দলের গর্বের লড়াইয়ের পাশাপাশি ম্যাচটা যে পয়েন্ট তালিকায়ও বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে!
স্প্যানিশ লা লিগায় দুটি দলের পয়েন্ট সমান হলে গোল ব্যবধান নয়, পার্থক্য তৈরি করে দেয় মুখোমুখি লড়াইয়ের হিসেব-নিকেশ। লিগে প্রথম দেখায় মাদ্রিদের মাঠে ৪-০ গোলে মাদ্রিদকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল বার্সা। আজ মাদ্রিদের জয়ের পর পয়েন্ট তালিকার অবস্থা – বার্সা ৩৪ ম্যাচে ৭৯ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে, দুই নম্বরে থাকা মাদ্রিদ পিছিয়ে ৪ পয়েন্টে। আগামী রোববার মাদ্রিদ বার্সার মাঠে গিয়ে তাদের হারিয়ে এলে তাই শুধু গত অক্টোবরের ম্যাচের জবাবই দেওয়া হবে না, লিগের শিরোপাদৌড়ের হিসাব-নিকাশও অন্যরকম হয়ে যাবে। বার্সা তখনো এগিয়ে থাকবে, তবে ব্যবধানটা যে তখন ৪-এর বদলে নেমে ১ পয়েন্টে। বাকি তিন ম্যাচে বার্সার পা হড়কালেই সুযোগ তৈরি হবে মাদ্রিদের।
তবে তার আগে আজ সেলতা ভিগোর ম্যাচ বুঝিয়ে দিল, এই সাতদিনে বার্সার শক্তি-দুর্বলতার বিশ্লেষণের পাশাপাশি নিজেদের রক্ষণের দুর্বলতা নিয়েও অনেক কাজ করার চ্যালেঞ্জ মাদ্রিদের সামনে। প্রথম ৩০ মিনিটেই দুবার গোলের খুব কাছে চলে গিয়েছিল সেলতা। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ আধা ঘণ্টায়ও সেলতাই গোলের সুযোগ পেয়েছে বেশি। এর মধ্যে যেভাবে দুবার মাদ্রিদের জালে বল ঢোকাল, সেটা মাদ্রিদ কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে না ভাবিয়ে পারে না!
৬৯ মিনিটে হাভি রদ্রিগেস সেলতার প্রথম গোলটা করলেন কর্নার থেকে ভেসে আসা বল সামলাতে মাদ্রিদ রক্ষণের নড়বড়ে অবস্থার সুযোগে। চোট-নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই প্রান্তে লুকাস ভাসকেস ও ফ্রান গার্সিয়াকে রেখে মাঝে ‘ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার’ অরেলিয়াঁ চুয়ামেনির পাশে তরুণ রাউল আসেনসিওকে রেখে সাজানো মাদ্রিদের রক্ষণ হা হয়ে গেল, যখন কর্নার থেকে ভেসে আসা বল প্রথম পোস্টে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ফ্লিক করলেন উগো সতেলো। বলটা ধীরে ধীরে গড়াতে গড়াতে পোস্টের দিকে ঢোকার মুহূর্তে পড়িমরি করে ঠেকালেন বটে ভাসকেস, কিন্তু তাঁর ক্লিয়ারেন্স জোরাল হলো না। ছয় গজের বক্সেই বলটা পড়ল রদ্রিগেসের পায়ে। তাঁর জোরাল শট জড়ালে জালে।
এর মিনিট সাতেক পর মাদ্রিদের রক্ষণ আবার হা! এবার উৎসে মাদ্রিদ বক্সের সামনে ইয়াগো আসপাসের অসাধারণ রিভার্স পাস! এক পাসেই মাদ্রিদের রক্ষণের চোখে ধুলো দিয়ে বল চলে গেলে অফসাইড ট্র্যাপ ফাঁকি দিয়ে ওঠা উইলিয়ট সোয়েডবার্গের পায়ে, তাঁর শট ঝাঁপিয়েও ঠেকাতে পারলেন না পুরো ম্যাচে মাদ্রিদকে বেশ কয়েকবার বাঁচানো কোর্তোয়া।
এর মিনিট তিনেক পরই মাদ্রিদ তৃতীয় গোলটা প্রায় খেয়েই গিয়েছিল। আবারও আসপাসের দারুণ পাস, এবার পাবলো দুরানের শট ঝাঁপিয়ে পড়া কোর্তোয়ার হাত আর শরীরে বাধা পেল বটে, তবে আটকাল না। তবে কোর্তোয়ার বাধার কারণে বলটা এমনই ঘুরতে শুরু করল যে, কোর্তোয়াকে পার হয়ে পোস্টের দিকে যেতে যেতে আপনাআপনিই গোললাইনের গজ তিনেক দূরে থাকার সময়ে থেমে গেল।
মাদ্রিদও অবশ্য এরপর একটা সুযোগ পেয়েছে। বক্সের ঠিক ওপরে থ্রু পেয়ে দ্রুত শট নিয়েছিলেন মাদ্রিদের বদলি ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াস, তবে শটটা ঠেকিয়ে দেন সেলতা গোলকিপার গুয়াইতা। তখনো ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট আর যোগ করা সময় বাকি, মাদ্রিদ তখন পয়েন্ট হারানোর শঙ্কায় ঘামছে।
অথচ দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন নিজের দ্বিতীয় আর দলের তৃতীয় গোলটা করলেন, তখনো মাদ্রিদের জয়টা কী অনায়াস হতে যাচ্ছে বলেই-না মনে হচ্ছিল! ম্যাচে মাদ্রিদের অন্য গোলটি করে এবং এমবাপ্পেকে দিয়ে অসাধারণ থ্রুতে একটি গোল করিয়ে আনচেলত্তির কাছে আরেকবার নিজেকে প্রমাণ করা আরদা গুলাশ যখন ৫৬ মিনিটে বক্সের সামনে এমবাপ্পের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়ার পর দারুণ একটি সুযোগে গোল করতে পারলেন না, তখনো বের্নাবাউয়ের গ্যালারিতে আফসোসটা তেমন গেঁড়ে বসেনি।
বসবেই-বা কেন! ততক্ষণে যে সহজ জয় ধরে নিয়ে আগামী রোববারের এল ক্লাসিকোর পরিকল্পনা মনে মনে কষতে শুরু করে দিয়েছেন মাদ্রিদ সমর্থকেরা!
প্রথম আধা ঘণ্টা কিছুটা ধুঁকতে হলেও ৩৩ মিনিটে গুলাশের গোলার মতো শটে মাদ্রিদের এগিয়ে যাওয়া। মিনিট ছয়েক পর নিজেদের গোলপোস্টে কোর্তোয়ার সেইভের পর শুরু হওয়া পাল্টা আক্রমণে চতুর্থ পাসেই বেলিংহ্যামের থ্রু হয়ে এমবাপ্পের পায়ে বল, পড়ে যেতে যেতেও দারুণভাবে শরীরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বক্সের ডান প্রান্ত থেকে আড়াআড়ি শটে বল জালে জড়ালেন এমবাপ্পে।
এরপর দ্বিতীয়ার্ধের মিনিট তিনেক যেতে না যেতেই গুলাশের ‘মেসি’ থ্রু – মাঝমাঠ থেকে তুর্কি ফরোয়ার্ডের থ্রু সেলতার মাঝমাঠ আর রক্ষণের রেখা ভেদ করে খুঁজে নিল এমবাপ্পেকে। ফরাসি ফরোয়ার্ড বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের মাটি গড়ানো দারুণ শটে বল জড়ালেন জালে।
তখন কে ভেবেছিল, এরপরও পয়েন্ট হারানোর শঙ্কায় পড়তে হতে পারে মাদ্রিদকে! তা হয়নি শেষ পর্যন্ত, তবে তাতে এল ক্লাসিকোর আগে আনচেলত্তির কপালে ভাঁজ কমছে না।