মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেকে নিয়ে যা পারেনি, তাঁদের ছাড়াই করে দেখাল পিএসজি

ইউরোপ সেরার স্বাদ নিতে ফরাসি ক্লাব পারি সাঁ জার্মেইতে (পিএসজি) রীতিমতো তারার হাট বসিয়েছিল মালিকপক্ষ কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ। এইতো বছর তিনেক আগেও দলটিতে একই সঙ্গে খেলেছেন লিওনেল মেসি-নেইমার জুনিয়র-কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। কিন্তু একের পর এক তারকা দলে টেনেও সেই স্বাদ নেওয়া হয়নি পিএসজির।

তারকার হাট দিয়ে সফল না হয়ে ক্লাবটি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। বিনিয়োগ করতে থাকে তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর। আর তাদের সামলাতে ডাগআউটে নিয়ে নিয়ে যায় লুইস এনরিকে নামের এক জাদুকরকে। যে জাদুকরের ক্ষুরধার মস্তিষ্কে শানিত কৌশলে বিদ্ধ হয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষ ঘায়েল হয়েছে। আর সর্বশেষ সেটা টের পেয়েছে ইন্তার মিলানো।

গতকাল রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ইতালিয়ান ক্লাবটির মুখোমুখি হয়েছিল পিএসজি। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বলতে গেলে ইন্তারকে পাত্তাই দেয়নি এনরিকের দল। ইতালিয়ান ক্লাবটিকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে পিএসজি। একইসঙ্গে ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতল ফরাসি ক্লাবটি। ইউরোপসেরার লড়াইয়ের ইতিহাসে ফাইনালে এত বড় ব্যবধানে এর আগে জিততে পারেনি কোনো দল।

দুর্দান্ত এ কীর্তি গড়া পিএসজির মৌসুমটাও কেটেছে স্বপ্নের মতো। লিগ ওয়ান ও কোপা দে ফ্রান্স আগেই জেতা হয়েছিল, এবার তাতে যোগ হলো চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা। ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্রেবল জয়। অবশ্য লুইস এনরিকের এ অভিজ্ঞতা প্রথম নয়। এর আগে ২০১৫ সালে বার্সাকে নিয়ে ট্রেবল জয়ের অভিজ্ঞতা আছে ৫৫ বছর বয়সী এ স্প্যানিশ কোচের।

ইন্তেরের বিপক্ষে পিএসজির গতকালের ম্যাচের ফাইনালের ভেন্যু ছিল বায়ার্ন মিউনিখের আলিয়াঞ্জ অ্যারেনা। অবশ্য বায়ার্নকে ঘিরে একটা দুঃসহ স্মৃতিও আছে পিএসজির। ২০১৯-২০ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে জার্মান ক্লাবটির কাছে হেরেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ফরাসিদের। এবার সেই বায়ার্নের মাঠেই স্বপ্ন পূরণ করল পিএসজি। সেটাও ম্যাচটাকে একপেশে বানিয়ে।

ম্যাচের মাত্র ১২ মিনিটে ভিতিনিয়ার পাস দি-বক্সের ভেতর পেয়েছিলেন দিজিরে দুয়ে। চাইলে নিজেই শট নিতে পারতেন ফরাসি রাইট উইঙ্গার। কিন্তু তিনি বল বাড়ালেন ডানপাশে অনেকটা ফাঁকায় থাকা আশরাফ হাকিমির দিকে। সুযোগ সন্ধানী হাকিমি আলতো ছোঁয়ায় স্কোরলাইন ১-০ করেন।

৮ মিনিট পর দ্বিতীয় গোলের দেখা পায় পিএসজি। এবার গোলদাতা দুয়ে। দারুণ এক কাউন্টার অ্যাটাকের শেষ পর্যায়ে দুয়ের উদ্দেশ্যে বল বাড়ান উসমান দেম্বেলে। ডি বক্সের ভেতর থেকে জোরালো শটে স্কোরলাইন দ্বিগুণ করেন ১৯ বছর বয়সী দুয়ে।

২-০ গোলে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় পিএসজি। দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় এনরিকের দল। অবশ্য তৃতীয় গোলের জন্য পিএসজিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৬৩ মিনিট পর্যন্ত। এবার ভিনিনিয়ার থ্রু পাস ধরে দারুণ এক শটে স্কোরলাইন ৩-০ করেন দুয়ে।

ইন্তার যেন তখনই ম্যাচের আশা ছেড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে শিরোপার পথে থাকা পিএসজি তখন আরও বেশি উজ্জীবিত। ফলস্বরূপ আরও দুটি গোল পায় ফরাসি ক্লাবটি। ৭৩ মিনিটে খাভিচা কাভারাৎস্খেলিয়ার গোলের পর ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের ৪ মিনিট আগে ইন্তেরের কফিনে শেষ পেরেকটি মারেন সেনি মায়ুলু।

ইউরোপ সেরার লড়াইয়ের ইতিহাসে এর আগে এত বড় ব্যবধানের জয় পায়নি কোনো দল। এর আগে সর্বোচ্চ ৪ গোলের ব্যবধানের জয় দেখা গেছে চারবার। ১৯৬০ সালে ফ্র্যাঙ্কফুর্টকে ৭-৩ গোলে হারিয়েছিল রেয়াল মাদ্রিদ, ১৯৭৩ সালে আতলেতিকো মাদ্রিদকে ৪-০ গোলে হারায় বায়ার্ন, ১৯৮৯ সালে এফসিএসবির বিপক্ষে ৪-০ গোলে এসি মিলানো ও ১৯৯৪ সালে বার্সেলোনার বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে জিতেছিল মিলানো।

সেই রেকর্ডকে অতীত বানিয়ে পিএসজিই এখন ইউরোপের রাজা। অনুভূতি জানাতে গিয়ে হাকিমি বলেছেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি। ক্লাব ইতিহাসে আমাদের নাম লিখিয়েছি। অনেক বছর ধরেই শিরোপাটা ক্লাবের প্রাপ্য ছিল। আমরা খুবই খুশি।’

আর এ ইতিহাস গড়ার কারিগরকেও কৃতিত্ব দিতে ভোলেননি মরোক্কান রাইট ব্যাক, ‘পিএসজিকে বদলে দিয়েছেন তিনি (এনরিকে)। তিনি এখানে আসার পর ফুটবলের দর্শনই পরিবর্তন করেছেন। অন্য যে কারও চেয়ে এটা তারই বেশি প্রাপ্য ছিল।’