কী অদ্ভুত একটা মৌসুম গেল ইন্তের মিলানোর! এপ্রিলের শেষ দিকেও তারা ছুটছিল লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ আর ইতালিয়ান কাপের ‘ট্রেবলে’র স্বপ্নে। অথচ শেষ পর্যন্ত ইন্তেরের মৌসুম শিরোপাহীন! শেষ দিনে শিরোপা লড়াইয়ের নিষ্পত্তি দেখা সেরি আ-তে ইন্তেরকে টপকে গেছে নাপোলি, চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে পিএসজির কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে ইন্তের, আর এপ্রিলের শেষ দিকে কোপা ইতালিয়ার সেমিফাইনালে ইন্তের হেরেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের কাছে।
সেখানেই শেষ নয়! ক্লাব বিশ্বকাপের আগে কোচের বদলও দেখেছে তারা – সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালের দায়িত্ব নেওয়া সিমোনে ইনজাগির জায়গায় ইন্তেরের ডাগআউটে গেছেন ক্রিশ্চিয়ান কিভু। এরপর ক্লাব বিশ্বকাপে আজ ব্রাজিলের ফ্লুমিনেন্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে রাউন্ড অব সিক্সটিনে।
এমন দিনে কার মেজাজ ভালো থাকে! ইন্তের অধিনায়ক লওতারো মার্তিনেসেরও ছিল না। আজ ক্লাব বিশ্বকাপ দিয়ে যখন মৌসুম শেষ হলো ইন্তেরের, অধিনায়ক মার্তিনেস এমন দিনে সেই সতীর্থদের ধুয়ে দিলেন যাঁরা তাঁর চোখে ক্লাবে থাকলেও ঠিক মানসিকভাবে দলের সঙ্গে নেই। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার সোজাসুজিই বলে দিয়েছেন, যাঁরা ইন্তেরের হয়ে লড়াই করতে চায় না, তাঁরা চাইলে চলে যেতে পারে।
তা মার্তিনেস ছাঁচাছোলা সমালোচনা করলেও কোন কোন সতীর্থের উদ্দেশে এমন কথা বলেছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের নাম বলেননি। তবে ইন্তের মিলানোর সভাপতি জিসেপ্পে মারোত্তা অত ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেসে’র ধার ধারলেন না। সোজাসুজি বলে দিয়েছেন, মার্তিনেস কথাটা বলেছেন ইন্তেরের তুর্কি মিডফিল্ডার হাকান চালহানোলুর মতো খেলোয়াড়দের উদ্দেশে! ওদিকে চালহানোলু আবার ইনস্টাগ্রামে লম্বা বিবৃতিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি মার্তিনেসের কথাগুলোর সমালোচনা করেছেন।
চালহানোলুকে ঘিরে সমস্যাটা কী? ৩১ বছর বয়সী তুর্কি মিডফিল্ডার গত কয়েক বছরে ইতালি ও ইউরোপে ইন্তেরের উত্থানের পেছনে বড় চালিকাশক্তি ঠিকই, তবে এই মৌসুমে তিনি ইন্তের ছেড়ে তাঁরই দেশের ক্লাব গালাতাসারাইয়ে যেতে চান বলে গুঞ্জন। এমনকি চালহানোলু এরই মধ্যে গালা’র সঙ্গে ব্যক্তিগত চুক্তির ব্যাপারে আলোচনাও সেরে ফেলেছেন বলে শোনা যায়। তবে ঝামেলাটা বাঁধছে দলবদলের ফি নিয়ে। ইন্তেরের সঙ্গে চালহানোলুর চুক্তি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। ট্রান্সফারমার্কেটের হিসাব অনুযায়ী, এই মুহূর্তে চালহানোলুর বাজার দর ৩ কোটি ইউরো। ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমের খবর, ইন্তের তাঁর জন্য ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৪ কোটি ইউরোই চায়, অন্যদিকে গালা ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর বেশি দিতে রাজি নয়। এদিকে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ২০২১ সালে ফ্রি ট্রান্সফারে এসি মিলান থেকে ইন্তেরে যোগ দেওয়া চালহানোলু চাইছেন, ইন্তের যেন গালার প্রস্তাব মেনে নেয়!
এর মধ্যে ক্লাব বিশ্বকাপেও ইন্তেরের স্কোয়াডে নেই চালহানোলু। তার পেছনে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে চোটের কথা বলা হচ্ছে। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে চোট পাওয়া চালহানোলু ক্লাব বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সেখানেও অনুশীলনে মাংসপেশিতে চোট পেয়েছেন। তবে ইতালিতে ধারণা, তিনি গালা-তে যাওয়ার জন্য গা বাঁচিয়ে চলছেন। ইন্তের যখন ক্লাব বিশ্বকাপে লড়ছে, চালহানোলু ছিলেন তুরস্কে। চালহানোলু থাকলে এবং সঠিক মানসিকতা নিয়ে খেললে ইন্তেরের পক্ষে আরও ভালোভাবে লড়াই করা সম্ভব হতো বলেই অনুমান সবার।
কিন্তু এভাবে টুর্নামেন্টে না খেলা এবং ক্লাবকে কোণঠাসা করে দলবদল করতে চাওয়া নিয়েই সম্ভবত আপত্তি মার্তিনেসের। আজ ম্যাচের পর কারও নাম না নিয়েই ইন্তের অধিনায়ক বলেছেন, ‘মাঠে সবটুকুই উজাড় করে দিয়েছি। অনুশীলনে প্রতিটা সেশনেও সবটুকু দিয়েছি। বলতে খারাপ লাগছে…তবে আমি হারতে চাই না, দলটার জন্য খুব খারাপ লাগছে… কিন্তু একটা ব্যাপার বলে দিতে চাই, (ইন্তেরের হয়ে খেলতে হলে) আপনাকে পুরোপুরি ইন্তেরে থাকতে চাইতে হবে।’
এরপর মার্তিনেস বললেন, ‘আমরা সবাই মিলে গুরুত্বপূর্ণ শিরোপার জন্য লড়ছি, যারাই এখানে আছে তাদেরও এটা (লড়াইয়ের মানসিকতা) দেখাতে হবে। যে দেখাবে না…সে যে-ই হোক, তার ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। আমরা এখানে সবাই ইন্তেরের জন্য সম্ভব সবকিছুই করার চেষ্টা করছি…অথচ এখানে আমি এমন অনেক কিছুই দেখেছি, অধিনায়ক হিসেবে যেগুলো আমার ভালো লাগেনি।’
মার্তিনেস কার কথা বলছেন, সে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার সুযোগ আর বেশিক্ষণ রাখেননি ইন্তের সভাপতি মারোত্তা। সরাসরিই জানিয়ে দিলেন, ‘ওই মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে লওতারোর প্রতিক্রিয়াটাতে আবেগ জড়িয়ে ছিল, এবং অধিনায়ক হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণও। সবাইকে অনুপ্রাণিত করা, ক্লাবে থাকতে হলে থাকার মতো করে থাকার অনুভূতি জাগিয়ে তোলাই তো ওর কাজ! কোনো খেলোয়াড় চলে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানালে, তার জন্য দরজা খোলাই থাকবে। কথাটা যখন বলছি, আমি আসলে চালহানোলুর কথাই বোঝাচ্ছি।’
এসব নিয়ে আবার ইনস্টাগ্রামে লম্বা বিবৃতিতে জবাব দিয়েছেন চালহানোলু। সেখানে তিনি ক্লাব বিশ্বকাপে না থাকার পেছনে কারণ হিসেবে চোটের কথা জানিয়েছেন, ইন্তেরের হারের পর দলের অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলাকে ক্লাবের প্রতি তাঁর টান হিসেবে দেখিয়েছেন। এরপর থাকল মার্তিনেসকে জবাব, ‘…যেটা খুব আশ্চর্য লেগেছে তা হলো এর (ইন্তেরের হারের পর) যে কথাগুলো বলা হলো। এমন সব শব্দ যেগুলো মনে আঘাত দেয়। এমন সব শব্দ, যেগুলো সবাইকে একতাবদ্ধ করার বদলে বিভাজন তৈরি করে।’
ক্যারিয়ারে অনেক সময় চোট নিয়েও খেলেছেন, দায়িত্বশীল থেকেছেন – এসব জানিয়ে পরে চালহানোলু লিখেছেন, ‘…সব মতামতকেই আমি সম্মান করি। সেটা সতীর্থের, এমনকি ক্লাব সভাপতির এমন মন্তব্য হলেও। তবে সম্মান ব্যাপারটা একমুখী রাস্তা ধরে চলে না। মাঠে-মাঠের বাইরে আমি সবসময় সবাইকে সম্মান দেখিয়েছি, এবং আমি বিশ্বাস করি, ফুটবলে – জীবনেও – সত্যিকারের শক্তিটা হচ্ছে সম্মান দেখানো, আরও বেশি করে যখন আবেগ আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে।’ খোঁচাটা যে মার্তিনেসের উদ্দেশে, তা বুঝতে কষ্ট হয় না।
ইন্তেরের সঙ্গে তিনি কখনো প্রতারণা করেননি, ইন্তেরে তিনি সুখী নন – এমন কথা কখনো বলেননি, আগেও আরও ভালো প্রস্তাব থাকলেও যাননি জানিয়ে শেষে তুরস্ক জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা টেনে আবার মার্তিনেসকে খোঁচা মেরে চালহানোলু লিখেছেন, ‘আমার দেশের হয়ে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরার সম্মান আমি পেয়েছি। আমি শিখেছি যে, নেতৃত্ব মানে আপনার দলের পাশে থাকা। সুযোগ বুঝে অন্যের দিকে আঙুল তোলা নয়।’
তাঁর ভবিষ্যৎ কোন ক্লাবে, সেটা সময়ই বলবে জানিয়ে বিবৃতির শেষ বাক্যে আবার মার্তিনেসকে খোঁচা মেরেছেন চালহানোলু, ‘…তবে ইতিহাস সব সময় তাদেরই মনে রাখে যারা (প্রতিকূল মুহূর্তে) ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তাঁদের নয় যাঁরা সবচেয়ে জোরে চিৎকার করে।’