সেই মেটলাইফ। সেই মেসি। সেই পুরোনো হতাশা। যে স্টেডিয়ামে এক দশক আগে কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি, সেই একই স্টেডিয়ামে আরেকবার স্বপ্নভঙ্গ হলো আর্জেন্টাইন মহাতারকার। মেসির আরেকবার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন এবার শেষ করে দিল স্পেন। ফাইনালের মঞ্চে স্প্যানিশদের কাছে স্রেফ দুমড়ে মুচড়ে গেল স্কালোনির দল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর্জেন্টিনা কি শুধু ভাগ্যের কাছে হেরেছে? নাকি স্পেনের কাছে কৌশল, শক্তি আর পরিকল্পনায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা?
ম্যাচের স্কোরলাইন হয়তো বলবে আর্জেন্টিনা শুধু ১ গোলে হেরেছে। কিন্তু মাঠের গল্পটা ছিল একেবারে ভিন্ন। একপেশে ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে পাত্তাই দেয়নি স্পেন। মাস্টারমাইন্ড খ্যাত স্কালোনির কৌশল কেন কাজ করল না স্প্যানিশদের সামনে?
দারুণ ছন্দে থাকা স্পেনকে ঠেকাতে শারীরিক ফুটবল বেছে নিয়েছিলেন স্কালোনি। প্রথমার্ধজুড়ে আর্জেন্টিনার ফাউল, খেলা থামিয়ে দেওয়া—সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল একটাই, স্পেনের পাসিং ফুটবলকে ধীর করে দেওয়া।
কিন্তু স্পেন সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তারা নিজেদের পরিকল্পনা থেকে একটুও সরেনি। বল পায়ে রেখে ধৈর্য ধরেছে। প্রেসিং করেছে নিখুঁতভাবে। সবচেয়ে বড় কথা—আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধ থেকে বের হতেই দেয়নি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
ম্যাচের আগে অনেকেই বলেছিলেন, মূল লড়াইটা হবে মধ্যমাঠে। যেখানে আর্জেন্টিনার ভরসা এনসো ফের্নান্দেস, আলেক্সিস মাক আলিস্তাররা। কিন্তু স্পেনের রদ্রি-ফাবিয়ান রুইসরা সেই জায়গাতেও দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। আর্জেন্টিনার আক্রমণের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। একইসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় মেসির কাছে বল পৌঁছানোর পথও।
স্পেন ভালো করেই জানত, মেসিকে জায়গা না দিলে আর্জেন্টিনার আক্রমণ অর্ধেক শক্তি হারাবে। তাই মেসিকে ঘিরে ছিল একাধিক স্প্যানিশ খেলোয়াড়। ফলে বল পেলেও সেভাবে সুযোগ তৈরি করতে পারেননি মেসি।
আরেকটি বড় সমস্যা ছিল আর্জেন্টিনার ক্লান্তি। এবারের বিশ্বকাপে আগেই দুবার অতিরিক্ত সময়ে খেলেছে আর্জেন্টিনা। ফলে বয়সের ভারে ধীর হয়ে যাওয়া দলটির পায়ে সেই সতেজতা ছিল না। তার ওপর প্রথমার্ধেই চোটের কারণে উঠে যান ডিফেন্ডার—লিসান্দ্রো মার্তিনেস। পরে বদলি হয়েছেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরোও। রক্ষণের পাশাপাশি আক্রমণ বিল্ডআপেও দুজন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। তাদের না থাকয় আর্জেন্টিনা আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া এনসো ফের্নান্দেসের লাল কার্ড ব্যাকফুঠে ঠেলে দিয়েছে আর্জেন্টিরাকে।
ম্যাচে আর্জেন্টিনা কতটা হাসফাস করেছে, সেটা বলছে পরিসংখ্যানও। স্পেনের দখলে ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ বল। স্পেন শট নিয়েছে ২০টি। আর আর্জেন্টিনা? মাত্র ২টি শট! সেটাও লক্ষ্যে ছিল না। ম্যাচের ১১৭ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা তেমন আক্রমণই তৈরি করতে পারেনি।
বিপরীতে এমিলিয়ানো মার্তিনেস ঢাল না হয়ে দাঁড়ালে আরও বড় ব্যবধানে হারতে পারত আর্জেন্টনা। শুধু ফাইনালেই ১২টি সেভ করেছেন মার্তিনেস। কিন্তু একজন গোলকিপার আর কতক্ষণ দলকে বাঁচাবেন?
অন্যদিকে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সিদ্ধান্তগুলোও ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া। বদলি হিসেবে নামা খেলোয়াড়রাই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেন। নিকো উইলিয়ামস মাঠে এসে দুই প্রান্তে গতি বাড়ান। শেষ পর্যন্ত সেই আক্রমণ থেকেই আসে জয়সূচক গোল। ডান দিক থেকে পেদ্রো পোরোর ক্রস, নিকো উইলিয়ামসের কাটব্যাক, আর ফেরান তোরেসের ফিনিশিং। শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার দেয়াল।
তাহলে আর্জেন্টিনা কোথায় হারল? তারা হারল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে। হারল নিজেদের আক্রমণ তৈরি করতে না পারায়। হারল মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায়। আর হারল এমন এক স্পেনের কাছে, যারা চাপের মধ্যেও নিজেদের ফুটবল দর্শন থেকে একটুও সরেনি।



