২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের গাজায় নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। সে হামলায় গাজায় এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহতের সংখ্যাও কম নয়। এছাড়া দেশটির অধিকাংশ নাগরিকই এখন বাস্তুচ্যুত।
এমন পরিস্থিতিতে গাজাবাসীর পক্ষে দাঁড়াচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবিক সংস্থাগুলো। ক্রীড়াঙ্গনেও গাজার প্রতি সহানুভূতির বার্তার খবর মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায় সংবাদমাধ্যমে। এবার গাজার পাশে দাঁড়াতে নরওয়ের ‘ব্যতিক্রমী’ উদ্যোগ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নরওয়ের উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী বলা হচ্ছে কেন? আগামী ১১ অক্টোবর ইউরোপীয় অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে ঘরের মাঠে ইসরায়েলকে আতিথ্য দেবে নরওয়ে। ওই ম্যাচে টিকিট বিক্রির অর্থ গাজার মানবিক সহায়তার কাজে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নরওয়েজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এনএফএ)।
যে ইসরায়েলের আক্রমণে গাজার বিধ্বস্ত পরিস্থিতি, সেই ইসরায়েল ম্যাচ থেকে প্রাপ্ত আয় যাবে গাজার সহায়তায়! ব্যতিক্রমী না বলে উপায় কী!
গতকাল সোমবার সিদ্ধান্তটি জানায় এনএফএ। নরওয়েজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ওই ম্যাচের টিকিট বিক্রির সব অর্থ শান্তিতে নোবেল জয়ী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসের হাতে তুলে দেবে এনএফএ। সে অর্থ ব্যয় হবে গাজায়। ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন ধারণা করছে, টিকিট বিক্রি থেকে কয়েক লাখ ডলার আয় হতে পারে!
নরওয়েজিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই অর্থ গাজা এবং পার্শ্ববর্তী যুদ্ধকবলিত এলাকায় মানবিক ত্রাণ সহায়তার কাজে ব্যয় করা হবে।’
নরওয়ে অবশ্য গতমাসেই ফুটবল থেকে প্রাপ্ত আয় ফিলিস্তিনের জনগণের সহায়তার কাজে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন বলা যেতে পারে এবারের ঘোষণা!
ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রসঙ্গ এলেই অবধারিতভাবে সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি সংঘাত সামনে চলে আসে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের ওপর হামলা চালায় রাশিয়া। ওই সংঘাতের জেরে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পাশাপাশি উয়েফার অনেক সদস্য দেশ রাশিয়ার বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে গেলেও ইসরায়েল এখনো নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি। এমনকি কোনো দেশ ইসরায়েলের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানানো বা ইসরায়েলকে তেমন চাপের মুখেও ফেলেনি।
এ প্রসঙ্গে নরওয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট লিসে ক্লাভেনেস সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমরা ফিফা ও উয়েফার সদস্য হিসেবে তাদের যেকোনো প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলের অংশগ্রহণ মেনে নিতে বাধ্য। তবে একইসঙ্গে ওই অঞ্চলে যে মানবিক বিপর্যয় চলছে, বিশেষ করে গাজায় বেসামরিক মানুষদের ওপর যে নির্বিচারে হামলা হচ্ছে, সেটা নিয়ে নির্লিপ্ত থাকতে পারি না। আর থাকবও না।’
নরওয়ে এবারের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিজেদের সেরা ফর্মে আছে। ‘আই’ গ্রুপে নিজেদের খেলা ৫ ম্যাচে সবগুলো জিতে পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষে থাকা নরওয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার দ্বারপ্রান্তে। নরওয়ের সঙ্গে একই গ্রুপে আছে ইতালিও। আর সেই ইতালির মাঠে ১৪ অক্টোবর আতিথ্য নেবে ইসরায়েল।
গাজা পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলা কতটা কঠিন, সেটা স্বীকার করেছেন ইতালির ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল গ্রাভিনা। গতকাল ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রাভিনা বলেছেন, ‘এই ম্যাচ নিয়ে ইতালির জনগণের সংবেদনশীলতা নিয়ে আমরা ভালোভাবেই অবগত। আমরা মানবিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দেই। ফিলিস্তিনে যা ঘটছে, সেটা আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করছে।’
সর্বশেষ দুটি বিশ্বকাপে না খেলা ইতালি এখন পর্যন্ত এবারের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৪ ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে আছে। তিনে থাকা ইসরায়েলের পয়েন্টও সমান ৯। তবে ইসরায়েল একটা ম্যাচ বেশি খেলেছে। এখন কোনো কারণে ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচটি যদি ইতালি খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আজ্জুরিরা ৩-০ ব্যবধানে হেরেছে বলে গণ্য করা হবে। এতে ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ শঙ্কার মুখে পড়বে ইতালির।
এ প্রসঙ্গে ইতালির ফেডারেশন প্রধান গ্রাভিনা বলেছেন, ‘যেহেতু ইসরায়েলের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েছি, তাই ওদের বিপক্ষে না খেললে এর মানে দাঁড়াবে, আমরা বিশ্বকাপ খেলতে চাই না। বিষয়টা নিয়ে সবার ধারণা রাখা দরকার।
অন্যদিকে নরওয়ে-ইসরায়েল ম্যাচটা হবে নরওয়ের উলেভাল স্টেডিয়ামে। ওই ম্যাচ নিয়ে বাড়তি নিরাপত্তা প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে এনএফএ। ২৩ হাজার টিকিট বিক্রি থেকে মোট কত আয় হবে, সেটা স্পষ্ট নয়। তবে দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, দেশের অন্যতম একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।