বালন দ'র দেম্বেলের

‘এই দিন’ হেরে গেল ‘সেই দিনে’র কাছে

বাংলাদেশ সময় তখন রাত তিনটা ছুঁই ছুঁই। বালন দ’র ২০২৫ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে তিয়েখ দ্যু শাতেলের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদিনিওকে ডেকে নিলেন উপস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রুদ খুলিত ও কেট স্কট। রোনালদিনিও খাম খুলে নাম ঘোষণা করলেন, বালন দ’র ২০২৫ উঠছে উসমান দেম্বেলের হাতে। 

ফরাসি তারকার বালন দ’র জেতাটা কি খুব বেশি চমকে দেওয়ার মতো ছিল? মে মাসের শেষ দিকে যখন মিউনিখে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে প্রথমবারের মতো ইউরোপ সেরার পুরস্কার জিতল ফরাসি ক্লাব পারি সাঁ জার্মেই (পিএসজি), দেম্বেলের বালন দ’র তো সেদিনই নিশ্চিত হয়েছিল! বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। গতকাল সেটাও পেয়ে গেলেন। 

চ্যাম্পিয়নস লিগের সঙ্গে লিগ আঁ ও কুপ দো ফ্রান্স- পিএসজিকে গত মৌসুমে ট্রেবল জেতানোর পথে ৫৩ ম্যাচে ৩৫ গোল করেছেন ফরাসি এ রাইট উইঙ্গার। এর মধ্যে পিএসজির ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পথে করেছেন ৮ গোল। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে অ্যাসিস্ট করেছেন আরও ১৬টি। ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে চেলসির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হলেও দেম্বেলের বালন দ’র নিয়ে খুব বেশি সংশয় ছিল না।

সামান্যতম সংশয় থাকলে সেটা বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকে নিয়ে হয়তো ছিল। কিন্তু স্প্যানিশ ১৮ বছর বয়সী রাইট উইঙ্গারকে দর্শক বানিয়ে শেষ পর্যন্ত রোনালদিনিওর হাত থেকে ব্যক্তিগত সেরার এ মুকুটটা তুলে নিয়েছেন দেম্বেলেই। অবশ্য ইয়ামালও একেবারে খালি হাতে ফেরেননি। আগের বারের মতো এবারও কোপা ট্রফি জিতেছেন ইয়ামাল। ২১ বছরের কম বয়সী সেরা ফুটবলারের হাতে তুলে দেওয়া হয় এ পুরস্কার।

একদিক থেকে দেখলে বার্সেলোনার 'এই দিন' হেরে গেল 'সেই দিনে'র কাছে। তাদের বর্তমান সুপারস্টারকে হারিয়ে দিলেন অতীতের ফ্লপ তারকা। ২০১৭ সালে দেম্বেলেকে দলে টেনেছিল বার্সেলোনা। স্প্যানিশ ক্লাবটিতে ছয় মৌসুম থাকলেও সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি ফরাসি তারকা। পারফরম্যান্সের চেয়ে বরং বেশি আলোচনায় এসেছন চোটের কারণেই। পরে ২০২৩ সালে বার্সা ছেড়ে পিএসজিতে যান। সেখানে এনরিকের অধীনে নিজেকে ফিরে পান দেম্বেলে।

মেয়েদের বালন দ’র অবশ্য বার্সেলোনার ঘরেই গেছে। টানা তৃতীয়বারের মতো এ পুরস্কার জিতেছেন আইতানা বোনমাতি। প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে তিনবার বালন দ’র জেতার কীর্তিও গড়েছেন তিনি।

দেম্বেলের এমন স্মরণীয় রাতে দর্শক সারিতে পিএসজি কোচ ও সতীর্থ খেলোয়াড়দের পাননি দেম্বেলে। তিয়েখ দ্যু শাতেলেতে এ পুরস্কার ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে আজ মাঠে নেমেছিল পিএসজি। অবশ্য মার্শেইয়ের বিপক্ষে পিএসজির এ ম্যাচটা ছিল গত রোববার। বাজে আবহাওয়ায় স্থগিত হয়ে যায় ম্যাচটি। পুনঃসূচিতে বালন দ’রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় পিএসজির ম্যাচ। তবে দেম্বেলে চোটে থাকায় এ অনুষ্ঠানে যেতে কোনো সমস্যা হয়নি। 

পিএসজি না থাকলেও দেম্বেলের বালন দ’রের পাশাপাশি আরও তিনটি পুরস্কার গিয়েছে প্যারিসের ক্লাবটিতে। গত মৌসুমের সেরা ক্লাবের পুরস্কার পেয়েছে পিএসজি। আর দলটির কোচ পেয়েছেন সেরা কোচের পুরস্কার ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি। আর দলটির আগের মৌসুমের গোলকিপার (বর্তমানে ম্যানসিটিতে) জানলুইজি দোন্নারুম্মা।

ষষ্ঠ ফরাসি ফুটবলার হিসেবে বালন দ’র জেতার পর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে দেম্বেলে বলেছেন, ‘সবাইকে ধন্যবাদ। আমার সঙ্গে যা হলো, সেটা অবিশ্বাস্য। আমি বাকরুদ্ধ। পিএসজির সঙ্গে দারুণ একটা মৌসুম কাটিয়েছি। অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। একটু নার্ভাস লাগছে। এটা সহজ নয় আসলেই।’

পিএসজি উইঙ্গার যোগ করেন, ‘রোনালদিনিওর মতো কারও হাত থেকে এই ট্রফি পাওয়া সত্যিই বিশেষ কিছু। ২০২৩ সালে আমাকে দলে নেওয়ার জন্য পিএসজিকে ধন্যবাদ। সভাপতি, পুরো দল, ক্লাব- সবাই মিলেই অসাধারণ একটি পরিবার। প্রথম দিন থেকেই সভাপতি আমাকে বিশেষভাবে দেখেছেন।’

শুধু সভাপতি নয়, বিশেষ এই দিনে কোচ ও সতীর্থদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি এমবাপ্পে, ‘পিএসজির সব স্টাফদেরও ধন্যবাদ। লুইস এনরিকে আমার বাবার মতো। আমার ক্যারিয়ারের জন্য তিনি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমার সব সতীর্থদেরও ধন্যবাদ। আমরা প্রায় সবকিছু জিতছি। এই (বালন দ’র) ট্রফি ব্যক্তিগত হলেও, এটা আসলে আমাদের সম্মিলিত অর্জন।’

ক্যারিয়ারের বিশেষ দিনে আগের ক্লাবগুলোকেও মনে করেছেন দেম্বেলে, ‘আগে যেসব ক্লাবে খেলেছি: রেঁনে, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড এবং আমার স্বপ্নের ক্লাব বার্সেলোনা- সবাইকে ধন্যবাদ। সেখানে অনেক কিছু শিখেছি। মেসি ও ইনিয়েস্তার মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেছি। দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল।’

 

এক নজরে বালন দঅর ২০২৫:

বালন দ’অর (পুরুষ): উসমান দেম্বেলে (পিএসজি, ফ্রান্স)

বালন দ’র (নারী): আইতানা বোনমাতি (বার্সেলোনা, স্পেন)

ছেলেদের কোপা ট্রফি: লামিন ইয়ামাল (বার্সেলোনা, স্পেন)

মেয়েদের কোপা ট্রফি: ভিকি লোপেজ (বার্সেলোনা, স্পেন)

ইয়াসিন ট্রফি (পুরুষ): জিয়ানলুইসি দোন্নারুম্মা (পিএসজি/ম্যানচেস্টার সিটি, ইতালি)

ইয়াসিন ট্রফি (নারী): হান্না হাম্পটন (চেলসি, ইংল্যান্ড)

জার্ড মুলার ট্রফি (পুরুষ): ভিক্টর ইয়োকেরেস (স্পোর্তিং সিপি/আর্সেনাল, সুইডেন)

জার্ড মুলার ট্রফি (নারী): এভা পাইওর (বার্সেলোনা, পোল্যান্ড)

ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি (পুরুষ): লুইস এনরিকে (পিএসজি)

ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি (নারী): সারিনা ভিগমান (ইংল্যান্ড)

বর্ষসেরা ক্লাব (পুরুষ): পিএসজি

বর্ষসেরা ক্লাব (নারী): আর্সেনাল

সক্রেটিস অ্যাওয়ার্ড: শানা ফাউন্ডেশন (স্পেন)