অক্টোবরের শেষ থেকে চলতি সপ্তাহ- দেড় মাসের ব্যবধানেই মুদ্রার দুই পিঠ দেখা হয়ে গেছে শাবি আলোনসোর। অক্টোবরের শেষে মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোয় বার্সাকে হারানোর পর পয়েন্ট টেবিলে বার্সার চেয়ে ৫ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল রেয়াল মাদ্রিদ।
এরপর থেকেই যেন মাদ্রিদের দুর্দশার শুরু। একের পর এক ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে শীর্ষস্থান তো হাতছাড়া করেছেই, বার্সার চেয়ে ৪ পয়েন্ট ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে শাবি আলোনসোর দল। মাদ্রিদের দুর্দশার সর্বশেষ চিত্র দেখা গেছে গত রোববার রাতে। ঘরের মাঠ সান্তিয়াগে বের্নাবাউতে সেলতা ভিগোর কাছে ২-০ ব্যবধানে হেরে বসে মাদ্রিদ।
দলের একের পর এক বিপর্যয়ে কোচের চেয়ারটা ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছিল শাবির। সেলতার বিপক্ষে ম্যাচের পর সেটা আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, এবার শাবির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে। প্রায় একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছে ক্রীড়া বিষয়ক আরেক সংবাদমাধ্যম এএসপিএন-ও।
বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেলতার বিপক্ষে মাদ্রিদের পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট হয়ে সমর্থকেরা মাঠেই দুয়ো দিয়েছেন। শুধু সমর্থকদের মনে নয়, অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে মাদ্রিদের বোর্ড পরিচালকদের মধ্যেও। মাদ্রিদে আলোনসোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে জরুরি বৈঠকেও বসেন তারা।
বৈঠকে আলোনসোর ভবিষ্যতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন বোর্ড পরিচালকেরা। সূত্রের বরাত দিয়ে বিসিবি ও ইএসপিএন উল্লেখ করেছে, স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাবটিতে আলোনসোর ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে ম্যান সিটির বিপক্ষে ম্যাচের ওপর।
আগামীকাল বুধবার রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যান সিটির মুখোমুখি হবে মাদ্রিদ। ওই ম্যাচে জয় ভিন্ন যেকোনো ফলই আলোনসোকে মাদ্রিদের চেয়ার থেকে নামিয়ে দিতে পারে!
তা মৌসুমের এমন পর্যায়ে আলোনসোকে সরানো হলে রেয়াল মাদ্রিদের হাল ধরবেন কে? সেটা নিয়েও আলোচনা হয়ে গেছে মাদ্রিদের বোর্ড পরিচালকদের বৈঠকে। ইএসপিএন উল্লেখ করেছে, আলোনসোর উত্তরসূরি হিসেবে জিনেদিন জিদান ও আলভারো আরবেলোয়াকে বিবেচনা করছে মাদ্রিদ।
ফরাসি কিংবদন্তি জিদান এর আগেও দুই দফায় মাদ্রিদের ডাগআউট সামলেছেন। তবে এখন মাদ্রিদ ছাড়ার পর আর কোনো ক্লাব বা দলের হাল ধরেননি তিনি। অন্যদিকে আরবেলোয়া বর্তমানে মাদ্রিদের ‘বি’ দল কাস্তিয়ার কোচ।
বোর্ড পরিচালকদের বৈঠকে স্কোয়াড পরিচালনার ‘দুর্বলতার’ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সূত্রের বরাতে বিবিসি উল্লেখ করেছে, ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে আলোনসোর সম্পর্ক ‘খারাপ’ হয়েছে বলেই মাদ্রিদের সঙ্গে নতুন চুক্তির বিষয়টি স্থগিত রেখেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা- বোর্ড পরিচালকদের অনেকেই এমনটা মনে করছেন।
ভিন্ন সূত্রের বরাতে ইএসপিএন জানিয়েছে, মাদ্রিদের স্কোয়াডের ভেতরেও এক ধরনের উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আলোনসো যে কৌশলে দলকে খেলাতে চাচ্ছেন, সেই কৌশল খেলোয়াড়রা ঠিকঠাক বুঝতে পারছেন না!
বিবিসি উল্লেখ করেছে, সেলতা ভিগোর বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে খেলার গতি বাড়াতে, হাই প্রেসিংয়ে খেলতে চিৎকার করছিলেন আলোনসো। কিন্তু মাদ্রিদের খেলোয়াড়রা যেন কোচের পরিকল্পনায় বিশ্বাস রাখতে পারছিলে না! আলোনসোর কৌশল এমবাপ্পে-ভিনিসিয়ুসরা মাঠে ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে পারেননি বলে লিখেছে বিসিবি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমের পরিস্থিতিও ছিল হতাশাজনক। সেখানে উচ্চস্বরে তর্ক-বিতর্ক তো ছিলই, পাশাপাশি অনেককিছু ছেঁড়ার ঘটনাও ঘটেছে। কেউ যখনই রেফারিকে দোষ দিতে গেছেন, তখন উত্তর এসেছে ‘এটা বাজে অজুহাত।’
আবার ম্যাচে লাল কার্ড দেখা ফ্রান গার্সিয়াকেও অশালীন ভাষায় শাসিয়েছেন আলোনসো- এমনটাই উল্লেখ করেছে বিসিবি। যে রেফারিংকে ড্রেসিংরুমে বাজে অজুহাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সেই রেফারিংয়ের প্রতিই অসন্তোষ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন আলোনসো নিজেই।
আলোনসোর ড্রেসিংরুম সামলানোর বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বোর্ড পরিচালকদের বৈঠকে। সেখানে অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েকদিনে কিছু খেলোয়াড়ের ওপর ভীষণ নমনীয় ছিলেন আলোনসো।
এছাড়া মাদ্রিদে বর্তমানে নেতৃত্বের ঘাটতির বিষয়টিও চোখে পড়ছে। লুকা মদ্রিচ, লুকাস ভাসকেস, দানি কারভাহালরা না থাকায় নেতৃত্ব সঙ্কট আরও প্রকট হয়েছে। এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে সঙ্কট আরও বাড়িয়েছে এদের মিলিতাওয়ের চোট। সেলতা ভিগোর বিপক্ষে পাওয়া চোটে অন্তত তিন-চার মাসের মতো মাঠের বাইরে থাকতে হবে ব্রাজিলিয়ান অভিজ্ঞ এ ডিফেন্ডারকে।
এমন সঙ্কট আর শঙ্কা নিয়ে সিটির বিপক্ষে রেয়াল মাদ্রিদ কতটা কী করতে পারবে সেটাই এখন দেখার। মাদ্রিদে আলোনসোর ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে একটি মজার বিষয় উল্লেখ করেছে বিসিবি। এর আগে লেভারকুসেনের কোচ থাকার সময় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোনসো একবার জানিয়েছিলেন, যেসব ক্লাবে খেলেছেন, তার যেকোনোটিতে কোচিং করাতে চান। এর বাইরে আরেকটি দলকে কোচিং করার আগ্রহের কথা সেসময় জানিয়েছিলেন আলোনসো- সেটা ইংলিশ ক্লাব ম্যান সিটি। এবার সেই ম্যান সিটির কারণেই আলোনসোর চাকরি চলে যায় কিনা, কে জানে!