আফকনে নাটক শেষে জয়ী সেনেগাল

সবাইকে ‘অপমান’ করার অভিযোগ তাঁর দলের বিরুদ্ধে, সবকিছুর শেষে তিনিই চাইলেন ক্ষমা

‘আজ (রোববার) রাতে পাপে থিয়াও যা করেছেন, সেটা আফ্রিকার জন্য অপমানের। অবশ্য এখন তিনি আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন, তাই যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু ম্যাচটা ১০ মিনিটেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল’- আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের (আফকন) মহানাটকীয় ফাইনাল শেষে সেনেগাল কোচকে নিয়ে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগি।

আফকনের ফাইনালে কে জিতেছে, সেটা তো রেগরাগির মন্তব্যেই স্পষ্ট। প্রিন্স মওলা আবদুল্লাহ স্টেডিয়ামের নাটকীয় ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে পাপে গায়ের একমাত্র গোলে মরক্কোকে ১-০ ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন হলো সেনেগাল। এর আগে ২০২১ সালে আফকনের শিরোপা জিতেছিল দলটি। তাতে মহাদেশসেরার এ টুর্নামেন্টে ১৯৭৬ সালের চ্যাম্পিয়ন মরক্কোর শিরোপাখরা আরও দীর্ঘ হলো।

সেটা না হয় হোক। কিন্তু মরক্কোর কোচ সেনেগাল কোচের কর্মকাণ্ড নিয়ে এভাবে মন্তব্য করলেন কেন? আর ম্যাচই বা বন্ধ ছিল কেন?

ঘটনাবহুল এ ম্যাচটি নিয়ে ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সেটার হেডলাইন দিয়েছে, ‘যেদিন ফুটবলের মৃত্যু হয়েছিল!’

তা ম্যাচে কী এমন ঘটেছিল, যা সেনেগালের দ্বিতীয় শিরোপা জয় ছাপিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে? ম্যাচের টাইমলাইনের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যন্ত কোনো দল গোল করতে পারেনি। তবে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মরক্কোর জালে বল জড়ায় সেনেগাল। ইদ্রিসা গায়ের হেড পোস্টে লাগার পর ফিরতি বলে হেডেই জালে বল জড়ান সারে। কিন্তু বল গোললাইন অতিক্রম করার আগেই রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজান।

হেড করার আগে আশরাফ হাকিমিকে ধাক্কা মেরেছিলেন গায়ে। ধাক্কার মাত্রাটা খুব বেশি জোরে ছিল না বলে এটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও তখনই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ক্ষোভের মাত্রা সীমা অতিক্রম করে খানিক পরে!

৯৮ মিনিটে (৯০+৮ মিনিট) ব্রাহিম দিয়াস ফাউলের শিকার হলে ভিএআর যাচাইয়ে মরক্কোর পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি জ্যাকস এনদালা এনগাম্বো। কিন্তু রেফারির এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি পাপে থিয়াও। ক্ষুব্ধ সেনেগাল কোচ তাঁর শিষ্যদের মাঠ থেকে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মিনিট চারেক পর সেনেগালের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই মাঠ ছেড়ে উঠে যান। তবে মাঠে ছিলেন সাবেক লিভারপুল তারকা সাদিও মানে। তিনি সতীর্থ মাঠে থেকে খেলা চালিয়ে যেতে বললেও শুরুতে কাজ হয়নি।

এর কিছুসময় পর আবার মাঠে ফিরে খেলা চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সেনেগালের খেলোয়াড়ের। সব মিলিয়ে প্রায় ১৭ মিনিট বন্ধ থাকার পর আবার খেলা শুরু হয়। ঠিক যেখানে থেমেছিল, সেখান থেকেই।

মরক্কোর হয়ে পেনাল্টি নিতে যান ব্রাহিম দিয়াস। বল জালে জড়াতে পারলেই দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর পর আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন হবে মরক্কো। এমন মাহেন্দ্রক্ষণের আগে তালগোল পাকিয়ে ফেললেন দিয়াস। স্পটকিকে পানেনকা শট নেন রেয়াল মাদ্রিদ উইঙ্গার। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে অনায়াসেই সেই শট মুঠোবন্দী করেন সেনেগাল গোলকিপার এদুয়ার মঁদি।

ব্যস, ওখানেই থেমে যায় নির্ধারিত সময়ের খেলা। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আর সেই অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে ইদ্রিসা গায়ের পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অনেকটা দৌড়ে মরক্কো বক্সের ঢুকেই শট নেন পাপে গায়ে। ২৬ বছর বয়সী এ মিডফিল্ডারের দুর্দান্ত গোলটাই সেনেগালকে এ টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় শিরোপা এনে দেয়। অথচ এই সেনেগালই কিছু সময় আগে ম্যাচ শেষ না করেই মাঠ ছেড়েছিল।

সে কারণে ম্যাচ শেষ সংবাদ সম্মেলনে সেনেগাল কোচের কর্মকাণ্ড নিয়ে ওমন ক্ষোভ প্রকাশ করেন মরক্কো কোচ। সঙ্গে এটাও দাবি করেছেন, ম্যাচ এতক্ষণ বন্ধ ছিল বলেই দিয়াসের মনোযোগ নষ্ট হয়েছে, ‘আমার মনে হয়, ব্রাহিম (দিয়াস) পেনাল্টি নেওয়ার আগে অনেকটা সময় কেটে গেছে। এটাই ওর মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে।’

তাই বলে সেটাকে অজুহাত হিসেবে দেখতে রাজি নন রেগরাগি, ‘অবশ্য এটা ব্রাহিমের নেওয়া ওই পেনাল্টির কোনো অজুহাত নয়। সে যেভাবে শট নিয়েছে, সেই দায় আমাদেরই।’

এরপর আবার সেনেগাল কোচকে কাঠগড়ায় তুলেছেন মরক্কোর কোচ, ‘এ ম্যাচটি ছিল আফ্রিকার জন্য অপমানের। একজন কোচ যখন তাঁর খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে বলেন… এমনকি এসব শুরু হয়েছিল ম্যাচ পূর্ব সংবাদ সম্মেলনেই (সেখানে মরক্কোর বিরুদ্ধে খেলার চেতনাবিরুদ্ধ মনোভাবের অভিযোগ তুলেছিলেন সেনেগাল কোচ)… আপনি জিতুন বা হারুন, সব অবস্থাতেই শালীন থাকতে হবে।’

মরক্কোর কোচ সংবাদ সম্মেলন করলেও সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াওয়ের সংবাদ সম্মেলন হয়নি। প্রেস কনফারেন্স রুমের পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় সেটি বাতিল করা হয়।

তবে ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম বেইন স্পোর্টসের সঙ্গে আলাপকালে থিয়াও স্বীকার করেছেন, দলকে মাঠ ছাড়তে বলার সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল না। আর সেজন্য ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। সেনেগাল কোচ বলেছেন, ‘(রেফারির সিদ্ধান্তে) আমরা একমত ছিলাম না। সব ঘটনা আবার নতুন করে বলতে চাই না। তবে ফুটবলের জন্য, আমি ক্ষমা চাই।’

থিয়াও আরও বলেন, ‘পরে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার পর আমি ওদের (খেলোয়াড়দের) আবার মাঠে ফিরিয়ে আনি। আসলে মুহূর্তের উত্তেজনায় এমন প্রতিক্রিয়া হতেই পারি। আমরা রেফারির ভুলগুলো মেনে নিয়েছি। আমরা এটা (মাঠ ছাড়া) ঠিক হয়নি। কিন্তু যা হওয়ার, সেটা হয়ে গেছে। এখন আমরা ফুটবলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

কোচের নির্দেশ মোতাবেক সেনেগালের প্রায় সব ফুটবলার উঠে গেলেও মাঠে ছিলেন সাদিও মানে। ম্যাচ শেষে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাবেক লিভারপুল তারকা বলেছেন, ‘ফুটবল একটা বিশেষ কিছু। পুরো বিশ্ব আমাদের দেখছিল। তাই আমাদের ভাবমূর্তির ভালো রাখার উদাহরণ তৈরি করত হতো।’

মানে যোগ করেন, ‘আমার মনে হয়, রেফারি পেনাল্টি দিয়েছে বলে খেলা ছেড়ে চলে যাওয়াটা সত্যিই পাগলামি হতো। বিশেষ করে আফ্রিকার ফুটবলে এটাই হতো সবচেয়ে বাজে দৃষ্টান্ত। আমার মনে হয়, এমন কিছুর চেয়ে হেরে যাওয়াও ভালো।’

বর্তমানে আল নাসরে খেলা মানে আরও বলেছেন, ‘এটা সত্যিই ভীষণ খারাপ হয়েছে। ফুটবল ১০ মিনিটের জন্য থেমে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমরা কী-ই বা করতে পারি? আমরা যা করেছি, সেটা মেনে নিতে হবে। তবে ভালো দিক হলো, আমরা মাঠে ফিরে খেলেছি। আর ম্যাচে যা হওয়ার, হয়েছে।’