বিশ্বজুড়েই ফুটবল প্রেমীরা বোধহয় এখন আগামী বুধবারের অপেক্ষায় দিন গুনছে। সেদিন আলিয়াঞ্জ আরেনাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের ফিরতি লেগে বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি হবে পারি সাঁ জার্মেই (পিএসজি)।
তা একটা ফাইনালে ওঠার লড়াই নিয়ে ফুটবল প্রেমিদের কেন এত আগ্রহ থাকবেই বা কেন? গতকাল মঙ্গলবার সেমিফাইনালের প্রথম লেগে দুদল মিলে এমন একটা ম্যাচ উপহার দিয়েছে, তাতে যদি আগ্রহ না জন্মায়, সেটাই বরং বিস্ময়ের কারণ হতে পারে!
পিএসজি-বায়ার্ন সেমিফাইনালের মহারণ— তর্কযোগ্যভাবে বর্তমানে ইউরোপিয়ান দুই সেরা দলের লড়াই। পার্ক দে প্রিন্সেসে মাঠের লড়াইয়ে কেউ যেন কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে চাইল না। তাতে ফুটবল বিশ্ব দেখল আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ঠাসা অনেক দিন আলাপ করার মতো জমজমাট এক ম্যাচ। সে ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৫-৪ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি।
তাতে একাধিক রেকর্ডেও উঠেছে এই ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা ইউরোপিয়ান কাপ ইতিহাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সেমিফাইনালের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৯ গোল দেখা গেল। এর আগে ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে রেঞ্জার্সকে ৩-৬ ব্যবধানে হারিয়েছিল ফ্র্যাঙ্কফুর্ট।
৯ গোলের ম্যাচে ওই রেকর্ডটা যৌথভাবে হলেও আরেক জায়গায় সব কীর্তিকে ছাড়িয়ে গেছে এ ম্যাচ। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সেমিফাইনালে দুদলই চার বা এর চেয়ে বেশি গোল করেছে। আর যদি চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার এমন ঘটনা ঘটল। এর আগে ২০০৮-০৯ মৌসুমের কোয়ার্টার ফাইনালে দ্বিতীয় লেগে চেলসি ও লিভারপুলের ম্যাচটি ৪-৪ সমতায় শেষ হয়েছিল।
গতকালের ম্যাচে একটা সময় মনে হয়েছিল বড় ব্যবধানে জিততে যাচ্ছে পিএসজি। ৫৮ মিনিটের মধ্য ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল ফরাসি জায়ান্টরা। তবে ১০ মিনিটের মধ্যেই দুদলের গোল ব্যবধান কমিয়ে ১-এ নামায় বায়ার্ন। এতে আগামী বুধবারের দ্বিতীয় লেগের লড়াই নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে আরও বেড়ে যায়।
গতকাল ম্যাচের শুরু থেকেই দুদল গতিময় ফুটবল উপহার দিতে থাকে। এরমধ্যে ১৭ মিনিটে হ্যারি কেইনের পেনাল্টি গোলে এগিয়ে যায় বাভারিয়ানরা। তাতে একটা রেকর্ডেও উঠে যায় ইংলিশ স্ট্রাইকারের নাম। টানা পাঁচ চ্যাম্পিয়নস লিগের নক আউট গোলে রবের্ত লেভানদফস্কির পাশে বসেন কেইন।
তবে সমতায় ফিরতে বেশি সময় নেয়নি পিএসজি। ওসমান দেম্বেলে সহজ সুযোগ মিস করার পর ২৪ মিনিটে বক্সের বাম দিক দিয়ে ঢুকে অসাধারণ এক গোলে স্কোরলাইন ১-১ করেন কাভারেস্খেলিয়া।
৩৩ মিনিটে কর্নার থেকে হেডে গোল করে পিএসজিকে এগিয়ে দেন জোয়াও নেভেস। ৭ মিনিট পর ওলিসের গোলে ম্যাচে সমতা (২-২) টানে বায়ার্ন। যেন কেউ কাউকে এগিয়ে যেতে দেবে না। তবে এরপরও প্রথমার্ধের শেষ দিকে ভিএআর যাচাইয়ে পাওয়া পেনাল্টিতে গোল করে পিএসজিকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন দেম্বেলে।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও বেশি জমে ওঠে। ৫৬ মিনিটে আশরাফ হাকিমির পাসে দ্বিতীয় গোল করেন কাভারেস্খেলিয়া, একই সঙ্গে দুই গোলের লিড (৪-২) পায় পিএসজি। দুমিনিট পরে ব্যবধান আরও বাড়ান (৫-২) দেম্বেলে। মনে হয়েছিল, বায়ার্ন বোধহয় আর পাল্লা দিতে পারবে না! কিন্তু জার্মান জায়ান্টরা সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে ১০ মিনিটের মধ্যেই দুই গোল ফেরত দিয়ে বসে।
ম্যাচের শেষ দিকে আর গোল না হলেও দুদল যে আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়েছে, তাতে দ্বিতীয় লেগের আগ্রহ নিশ্চিতভাবেই অনেকটা বেড়ে গেছে সমর্থকদের।
গতকালের জমজমাট ম্যাচে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতিও জেগে উঠেছে বায়ার্নের। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমের পর এই প্রথম ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার এক ম্যাচে ৫ গোল হজম করল বাভারিয়ানরা। কিন্তু এরপরও বায়ার্ন যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে শিষ্যদের প্রশংসাতেই ভাসালেন দলটির কোচ ভানসাঁ কম্পানি।
ম্যাচ শেষে কম্পানি বলেছেন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগে অ্যাওয়ে ম্যাচে পাঁচ গোল হজম করলে সাধারণত আপনি বিদায় নেন। কিন্তু আমরা এত সুযোগ তৈরি করেছি যে, আরও বেশি গোল করতে পারতাম।’
বায়ার্ন কোচ যোগ করেন, ‘আজ রক্ষণভাগের খেলাও ভালো হয়েছে। ম্যাচে তীব্র লড়াই হয়েছে, কিন্তু ব্যবধানটা খুবই সামান্য। আপনি হয় পুরো শক্তি দিয়ে খেলবেন, না হলে পিছিয়ে পড়লে রক্ষণাত্মক হবেন— যেমন আমরা ৫-২ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু এই মানের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে দ্বিতীয় পদ্ধতিটা (রক্ষণাত্মক) কাজ করে না, তাই আপনাকে আক্রমণেই যেতে হয়।’