দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাতারে বিশ্বকাপ জয়, আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলতে নামবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে পারবে? কিংবা ব্যাক টু ব্যাক চ্যাম্পিয়ন তকমা গায়ে লাগাতে পারবে?
প্রশ্নটা যত সহজে করা হলো, উত্তরটা এত সহজ নয়। টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের সর্বশেষ কীর্তি দেখা গেছে ব্রাজিলের হাত ধরে। ১৯৫৮ এর পর ১৯৬২ সালেও বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। সেই ঘটনার পেরিয়ে গেছে ৬৪ বছর। আর্জেন্টিনার সামনে সেই অবিশ্বাস্য কীর্তির পুনরাবৃত্তির সুযোগ।
লিওনেল স্কালোনির দল কি সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারবে? আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপের দলটাই বা কেমন হলো? এই দলের শক্তি আর দুর্বলতার জায়গা কোথায়? কারা হতে পারেন এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ট্রাম্প কার্ড? প্রায় ৩৯ বছর বয়সী মেসিই বা কী করতে পারেন। আজকের ভিডিওতে আলোচনা করব এই বিষয়গুলো নিয়েই।
বলা হয়ে থাকে, বিশ্বকাপ জেতা যতটা সহজ, ধরে রাখা নাকি তার চেয়েও বেশি কঠিন। আর সেই অসাধ্য সাধনে স্কালোনি স্কোয়াডে খুব বেশি ঝাঁকুনি দেননি। কাতারে বিশ্বকাপজয়ী দলের ১৭ জনকে রেখেছেন এবারের ২৬ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াডে। পুরোনো সৈনিকদের ওপরই ভরসার অন্যতম কারণ, এই দলটা এক হয়ে খেলতে জানে। একে অপরকে চেনে নিজের পরিবারের মতো।
আর এ কারণেই বলা হচ্ছে, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা অভিজ্ঞতা। একদম ক্লিয়ারভাবে বললে, এই স্কোয়াডে আছেন—লিওনেল মেসি, এমিলিয়ানো মার্টিনেস, রদ্রিগো দে পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্তার, এনসো ফের্নান্দেসের মতো তারকারা। যারা জানেন, কীভাবে বিশ্বকাপ জিততে হয়।
এটাই সবচেয়ে বড় পয়েন্ট। ভালো খেলার মতো অনেক দলই আছে, কিন্তু “জিততে জানে”— এটা পুরো আলাদা একটা ব্যাপার। আর্জেন্টিনার এই দলটার মধ্যে সেই ‘উইনিং মেন্টালিটি’ আছে। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, একই বছরে বিশ্বকাপ, ২০২৪-এ আরেকটা কোপা—সব মিলিয়ে বড় টুর্নামেন্ট মানেই যেন এক অন্য আর্জেন্টিনা!
আরেকটা বড় শক্তির জায়গা হলো- মিডফিল্ড। অনেকেই বলে, আর্জেন্টিনার এই মিডফিল্ডটা এখন বিশ্বের অন্যতম ব্যালেন্সড মিডফিল্ড। এনসো, ম্যাক অ্যালিস্তার, আর দে পল— এই তিনজন মিলে যেমন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, প্রেসিং করতে পারেন, সমানতালে অবদান রাখতে পারেন আক্রমণেও। মানে, সব দিকেই একটা ভারসাম্য আছে।
আবার আরেকটা মজার বিষয়, আর্জেন্টিনা এখন আর শুধু মেসি-নির্ভর দল নয়। আগে যেমনটা ছিল, মেসি মানেই আর্জেন্টিনা, এখন সেটা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন হুলিয়ান আলভারেস, লাওতারো মার্টিনেসের ফুটবলাররা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। এছাড়া থিয়াগো আলমাদা, নিকো পাজ, জিউলিয়ানো সিমেওনে কিংবা হোসে মানুয়েল লোপেসের মতো তরুণ প্রতিভাবানদের স্কোয়াডে রেখেছেন স্কালোনি, যারা হতে পারে এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ট্রাম্প কার্ড।
অর্থাৎ, আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ এখন ডাইভার্সিফাইড। আগে একটাই প্ল্যান ছিল— মেসিকে বল দিতে হবে, মেসি একা কিছু করবে। আর এখন সেটা বদলে প্ল্যান B, C, D- সবই আছে।
তাই বলে মেসিকে হিসেবের বাইরে রাখা হবে, ব্যাপারটা এমন নয়। মেসি তো মেসিই। নিজেই একটা আস্ত ইতিহাস। প্রায় ৩৯ বছর বয়সেও যেভাবে দাপটের সঙ্গে খেলে যাচ্ছেন, মুহূর্তের ঝলকেই যেকোনো ম্যাচের ফল নিয়ে আসতে পারেন আর্জেন্টিনার পক্ষে।
কিন্তু এত কিছুর পরও আর্জেন্টিনার শঙ্কার কিছু জায়গা আছে। যার প্রথমটাই- মেসির বয়স। মেসি মায়ামিতে খেলছেন, গোল করছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ তো আলাদা ব্যাপার। এখানে শরীর, ফিটনেস, রিকভারি—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট বেশ ভুগিয়েছে মেসিকে। তাই প্রশ্ন থাকবে— মেসি টুর্নামেন্ট নিজের শতভাগ দিতে পারবেন তো?
আর্জেন্টিনার আরেকটা বড় শঙ্কার জায়গা- ডিফেন্স। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, ওতামেন্দি, মলিনা কিংবা তাগলিয়াফিকোরা আছেন ঠিকই- কিন্তু এরপরও চোট আর বয়সের ভারে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ কিছুটা নুয়ে পড়েছে। বিকল্প থাকলেও অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে সেখানে।
এছাড়া চোট কিংবা ফিটনেসজনিত সমস্যাও আর্জেন্টিনার মাথাব্যথার বড় কারণ হতে পারে। মেসি এখনো পুরো ফিট নন, এমি মার্তিনেস আঙুলের চোটে ভুগছেন। এছাড়া রোমেরো, মলিনা, মন্তিয়েল, নিকো পাজ, পারেদেস কিংবা নিকো গনসালেসরাও পুরোপুরি ফিট হয়ে ওঠেননি।
এছাড়া বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে আনহেল ডি মারিয়ার শূন্যতাও বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। বিগ ম্যাচে ডি মারিয়ার অভিজ্ঞতা, গতি, ড্রিবলিং—এগুলো অনেক সময়ই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিত। এখন প্রশ্ন হলো, এবার ডি মারিয়ার সেই শূন্যতা কে পূরণ করবে?
সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার দলটা ভারসাম্যপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু একেবারে পারফেক্ট বলার উপায় নেই। আগেই বলা হয়েছে, ব্যাক টু ব্যাক বিশ্বকাপ জেতা কতটা কঠিন। ১৯৬২ এর ব্রাজিলের পর আর কেউ সেটা করতে পারেনি। এছাড়া এবার প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোও ছেড়ে কথা বলবে না। ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের স্কোয়াডের গভীরতা তো সবারই জানা, আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে হিসাবের বাইরে রাখার তো প্রশ্নই ওঠে না।
তাহলে ব্যাক টু ব্যাক শিরোপা জয়ের দৌড়ে আর্জেন্টিনার অবস্থানটা কোথায়?
এখানে ঘুরে ফিরে আসতে পারে, আর্জেন্টিনা দলের উইনিং মেন্টালিটির কথা। তারা জানে কীভাবে বড় ম্যাচ খেলতে হয়, কীভাবে ফাইনাল জিততে হয়, কীভাবে চাপ সামলাতে হয়। আর ডাগআউটে স্কালোনির মতো কুল হেডেড একজন মাস্টারমাইন্ড তো আছেনই। স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি ট্যাকটিকসে নয়, বরং ইউনিটিতে। তিনি একটা দল বানিয়েছেন, যেখানে সবাই একে অন্যের জন্য লড়ে।
এছাড়া মেসি ইফেক্ট তো আছেই। সতীর্থদের কাছেও, মেসি একটা ইমোশনের মতো। এটাই হতে পারে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। সতীর্থরা তো চাইবেনই, তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে আরেকটা শিরোপা দিয়ে বিদায় জানাতে।