আরও একটি বিশ্বকাপ চলে এল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো-ভক্তদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—৪১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি কি এবার পারবেন অধরা সেই সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে?
২০২২ সালের বিশ্বকাপেও রোনালদোকে দলে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। গত চার বছরেও সেই বিতর্ক এতটুকু কমেনি। অবশ্য বাছাইপর্বেও রোনালদো ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান অংশ। তিনি ফিট থাকলে কোচ রবার্তো মার্তিনেজ তাঁকে মূল একাদশে রাখবেন, এটি অনেকটাই নিশ্চিত।
রোনালদো দলে থাকুন বা না থাকুন, পর্তুগালের এই দলটিতে কিন্তু প্রতিভার কোনো কমতি নেই। এটি হতে যাচ্ছে দলটির টানা সপ্তম বিশ্বকাপ। এবারও ট্রফি জয়ের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবেই মাঠে নামছে তারা।
রোনালদোর ‘লাস্ট ড্যান্স’
রোনালদোই যে পর্তুগালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু পারফরম্যান্সই নয়, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণেও তিনি আকর্ষণের কেন্দ্রে। সিআরসেভেন (CR7) নামে পরিচিত এই কিংবদন্তির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলে রেকর্ড ১৪৩ গোল নিয়ে তিনিই সর্বকালের সেরা গোলদাতা।
তবে রোনালদোর ফিটনেস নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন আছে। হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে গত মার্চে পর্তুগালের প্রীতি ম্যাচগুলোতে তিনি খেলতে পারেননি। এ ছাড়া বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সহিংস আচরণের জন্য লাল কার্ডও পেয়েছিলেন। এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এরই মধ্যে তিনি কাটিয়ে উঠেছেন। তবে সাম্প্রতিক বড় টুর্নামেন্টগুলোতে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল বেশ হতাশাজনক। ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি করেছিলেন মাত্র ১ গোল এবং ইউরো ২০২৪-এ পাঁচটি ম্যাচ খেলেও কোনো গোলের দেখা পাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন কিংবা মায়ামির তীব্র গরমে ধকল সামলানো দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তা ছাড়া কৌশলগত দিক থেকেও কিছু দুশ্চিন্তা আছে। যেমন—রোনালদোর গতি এখন আর আগের মতো নেই। আর তাঁকে ছাড়াই পর্তুগালের আক্রমণভাগ অনেক সময় বেশি বিপজ্জনক দেখায়। অবশ্য রোনালদো যদি ফিট থাকেন, তবে তাঁকে বাদ দেওয়া কোচের জন্য কঠিন। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে নিজেকে উজাড় করে দিতে মুখিয়ে থাকবেন তিনি। তাঁর সামনে রয়েছে নতুন রেকর্ডের সুযোগও। পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে ইউসেবিওর করা সর্বোচ্চ ৯ গোলের রেকর্ড ভাঙতে রোনালদোর প্রয়োজন আর মাত্র ২টি গোল।
কোচ মার্তিনেজ বলেন, ‘আমরা যখন ক্রিশ্চিয়ানোকে নিয়ে কথা বলি, তখন আসলে দুজন খেলোয়াড়কে বোঝায়। একজন হলেন বিশ্ব ফুটবলের আইকন, আর অন্যজন হলেন আমাদের অধিনায়ক—যার জাতীয় দলে থাকার যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা অন্য সব খেলোয়াড়ের মতোই সমান। আমাদের অধিনায়ক একটি উদাহরণ। আমরা চাই তিনি ড্রেসিংরুমে একই স্তরের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব বজায় রাখুন।’
রোনালদোর জন্য সবচেয়ে ভালো খবর হলো, তিনি পেছনে পাচ্ছেন বিশ্বসেরা এক মিডফিল্ডের সমর্থন। ব্রুনো ফার্নান্দেজ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে চলতি মৌসুমে তাঁর চেনা ফর্ম ফিরে পেয়েছেন। নিজের প্রিয় ১০ নম্বর পজিশনে খেলে প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ড ২১টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ফার্নান্দেজের পাশাপাশি ভিতিনহা, জোয়াও নেভেস এবং বের্নার্দো সিলভাদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া মিডফিল্ড দিয়ে পর্তুগাল যেকোনো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিশ্বের যেকোনো শক্ত রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করা তাদের জন্য কোনো কঠিন বিষয় নয়।
বিশেষ করে ভিতিনহা এখন আছেন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে। পিএসজির এই মিডফিল্ডার ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর দৌড়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। দলের মাঝমাঠের মূল চাবিকাঠি তাঁর হাতেই। অন্যদিকে তাঁর ক্লাব সতীর্থ ২১ বছর বয়সী জোয়াও নেভেস ইউরোপের অন্যতম সেরা ও চতুর মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। তবে দুই উইং দিয়ে রাফায়েল লেয়াও এবং কনসেইসাও প্রতিপক্ষের জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি তৈরি করতে পারেন। অবশ্য চলতি মৌসুমে লেয়াওয়ের ফিটনেস ও পারফরম্যান্স কিছুটা চিন্তার কারণ হতে পারে।
চাপে আছেন মার্তিনেজ
পর্তুগালের স্প্যানিশ কোচ রবার্তো মার্তিনেজের ওপর এখনো অনেকেই পুরোপুরি আস্থা আনতে পারেননি। বিশেষ করে দলের তারকা রোনালদোর বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো সাহস এখনো তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। এ ছাড়া বেলজিয়াম ও পর্তুগালের কোচ হিসেবে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে তাঁর ট্র্যাক রেকর্ড খুব একটা আহামরি নয়।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে মার্তিনেজ অবশ্য নিজের দলকে কিছুটা লাইমলাইট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি কেবল তারাই ফেবারিট হতে পারে, যারা এর আগে অন্তত একবার বিশ্বকাপ জিতেছে। তবে আমাদের দলের প্রতিভা এবং স্পিরিট বিবেচনা করলে আমরা সবাই স্বপ্ন দেখতেই পারি। হ্যাঁ, আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি এবং ট্রফির অন্যতম দাবিদার হতে পারি, তবে মূল ফেবারিট নই।’
কেমন হলো পর্তুগালের গ্রুপ?
পর্তুগালের জন্য ‘কে’ গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে যাওয়া খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা নয়। প্রথম দুই ম্যাচে তারা খেলবে তুলনামূলক দুর্বল ডিআর কঙ্গো এবং উজবেকিস্তানের বিপক্ষে। তবে গ্রুপের শেষ ম্যাচে তাদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে শক্তিশালী কলম্বিয়ার বিপক্ষে। র্যাঙ্কিংয়ে ১৩ নম্বরে থাকা দলটিতে লুইস দিয়াজ, হামেস রদ্রিগেজ এবং ড্যানিয়েল মুনোজের মতো তারকারা রয়েছেন। এই ম্যাচটি মূলত গ্রুপ সেরা নির্ধারণের লড়াই হতে যাচ্ছে।
পর্তুগালের গ্রুপ পর্বের ম্যাচের সময়সূচি (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী):
১৮ জুন: পর্তুগাল বনাম ডিআর কঙ্গো (হিউস্টন, যুক্তরাষ্ট্র) – রাত ১১:০০ টা
২৪ জুন: পর্তুগাল বনাম উজবেকিস্তান (হিউস্টন, যুক্তরাষ্ট্র) – রাত ১১:০০ টা
২৮ জুন: কলম্বিয়া বনাম পর্তুগাল (মায়ামি, যুক্তরাষ্ট্র) – ভোর ৫:৩০ টা
সূত্র: আল জাজিরা