দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। আগামী ১১ জুন বৃহস্পতিবার পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। মেক্সিকো, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র—তিন দেশ মিলে আয়োজন করছে ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম এই মহাযজ্ঞ। তবে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে এখন আলোচনার তুঙ্গে ফুটবলাররা। এটি কি হতে চলেছে লিওনেল মেসির শেষ জাদু? নাকি ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দেখাবেন আরও একটি 'লাস্ট ডান্স'? একদিকে যেমন আছেন অভিজ্ঞ সব কিংবদন্তি, অন্যদিকে আছেন লামিন ইয়ামাল বা আরদা গুলারের মতো উদীয়মান তরুণেরা। আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে আসা এবারের বিশ্বকাপের 'টপ টেন' তারকাদের নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন।
চিরকালীন দুই নায়ক
তালিকার প্রথমেই যাঁর নাম আসবে, তিনি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। চার বছর আগে কাতারে নিজের অধরা স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। ৩৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে মেসি এবার নামছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে—যা একটি অনন্য রেকর্ড। যদিও তাঁর বয়স এবং ফিটনেস নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু মাঠের সেই জাদুকরী বাঁ পা এখনো যেকোনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে যথেষ্ট।
অন্যদিকে আছেন ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের জার্সিতে ইউরো জিতলেও বিশ্বকাপের ট্রফিটা এখনো তাঁর কাছে অধরা। কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে রোনালদো নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন। তাঁর শারীরিক ফিটনেস এবং গোলের নেশা এখনো তরুণদের ঈর্ষার কারণ। ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় এসে রোনালদো কি পারবেন নিজের ট্রফি ক্যাবিনেটের সেই শেষ শূন্যস্থানটি পূরণ করতে?
আগামীর রাজা
কিলিয়ান এমবাপ্পে—২০২২ ফাইনালের সেই হ্যাটট্রিক হিরো। গোল্ডেন বুট জিতলেও ট্রফি হারানোর সেই আক্ষেপ তিনি এবার মিটিয়ে নিতে চাইবেন। ২৭ বছর বয়সেই এমবাপ্পে এবার নামছেন ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিতে। তাঁর গতি আর নিখুঁত ফিনিশিং এবারও ডিফেন্ডারদের জন্য হবে এক দুঃস্বপ্ন।
তবে এবারের বিশ্বকাপে সবার নজর থাকবে একজনের দিকে—স্পেনের ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। ইউরো ২০২৪ জয়ের পর ইয়ামাল এখন বিশ্ব ফুটবলের নতুন সেনসেশন। কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বুট জেতার রেকর্ডে চোখ থাকবে এই উইঙ্গারের। ইয়ামালের ড্রিবলিং আর স্কিল কি পারবে স্পেনকে আরও একটি সোনালি সাফল্য এনে দিতে?
গোল মেশিন ও ইংল্যান্ডের ভরসা
গত বিশ্বকাপে নরওয়ে না থাকলেও, এবার বিশ্বমঞ্চে অভিষেক হতে যাচ্ছে সময়ের সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডের। ২৫ বছর বয়সী এই গোল মেশিন ইউরোপিয়ান ফুটবলে সব রেকর্ড তছনছ করে দিচ্ছেন। বাছাইপর্বে ১৬ গোল করা হালান্ড এবার নরওয়ের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’কে কতদূর নিয়ে যান, সেটাই দেখার বিষয়।
অন্যদিকে বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে বুন্দেসলিগা জেতা হ্যারি কেইন আছেন তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে। ২০১৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট বিজয়ী কেইন যদি এবারও সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, তবে ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুবার গোল্ডেন বুট জেতার রেকর্ড গড়বেন তিনি।
সাম্বার ছন্দ ও ব্ল্যাক স্টারদের তালিজমান
পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার তাদের হেক্সা মিশন শুরু করছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাঁধে ভর করে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ২০২৪-এর ফিফা বেস্ট প্লেয়ার নির্বাচিত হওয়া ভিনি এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর উইঙ্গার। নেইমার দলে থাকলেও, ব্রাজিলের মূল আক্রমণভাগের দায়িত্ব থাকবে তাঁর ওপরই।
আফ্রিকান ফুটবলের চমক হিসেবে এবার আলোচনায় আছেন ঘানার অ্যান্টোনি সেমেনিও। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে চমৎকার মরশুম কাটানো এই ২৬ বছর বয়সী উইঙ্গার এখন ঘানার তালিজমান। মোহাম্মদ কুদুসের অনুপস্থিতিতে সেমেনিওই হতে পারেন ঘানার সব আশা-ভরসার প্রতীক।
টার্কিশ ম্যাজিক ও ইজিপশিয়ান কিং
দুই দশক পর বিশ্বকাপে ফিরছে তুরস্ক। আর তাদের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ তুর্কি আরদা গুলার। ২০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের কাছে তুর্কি সমর্থকদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
আর এই তালিকার শেষ নাম—মোহাম্মদ সালাহ। ৩৩ বছর বয়সী সালাহ ক্লাব ফুটবলে সব জিতলেও দেশের হয়ে ট্রফি জেতার আক্ষেপটা রয়েই গেছে। চোট কাটিয়ে ফেরা ‘ইজিপশিয়ান কিং’ তাঁর শেষ বিশ্বকাপে মিশরকে কতদূর টেনে নিয়ে যান, সেটাই হবে এবারের অন্যতম বড় আকর্ষণ।
১০ জন তারকা, ১০টি আলাদা গল্প। কেউ ট্রফি ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবেন, কেউ নামবেন প্রথমবারের মতো রাজত্ব গড়ার জন্য। ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসবেন কে? মেসি নাকি এমবাপ্পে? নাকি নতুন কোনো তারকার উদয় হবে বিশ্বমঞ্চে?