খেলাটির নাম যখন ফুটবল, আর মঞ্চ যখন বিশ্বকাপ, তখন কোনো পরাশক্তিই এখানে নিরাপদ নয়! সোমবারই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দেখেছে বিশ্ব। লুই দে লা ফুয়েন্তের ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে টুর্নামেন্টের নবাগত, ক্ষুদ্র দেশ কেপ ভার্দে। স্পেনের এই ধাক্কার রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে কানসাস সিটিতে মাঠে নামছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ উত্তর আফ্রিকার শক্তিশালী দল আলজেরিয়া।
স্পেনের এই পরিণতির পর এখন প্রশ্ন, আলজেরিয়া কি পারবে আর্জেন্টিনার জন্য 'কেপ ভার্দে' হয়ে উঠতে? বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে প্রথম ম্যাচেই বড় কোনো অঘটন এড়াতে কতটা প্রস্তুত লিওনেল স্কালোনির দল?
স্পেনের ভুল থেকে আর্জেন্টিনার শিক্ষা
সোমবার কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্পেন ৭৪ শতাংশ বল দখলে রেখেও গোল করতে পারেনি, কারণ তাদের আক্রমণে ধার ছিল না। আর ঠিক এই জায়গাতেই আর্জেন্টিনা অনেক বেশি পরিপক্ক। স্কালোনির দল লাতিন আমেরিকার কঠিন বাছাইপর্বে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল প্রধানত তাদের ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের কারণে।
তবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনা দল কিন্তু পুরোপুরি কাতার বিশ্বকাপের মতো মেসি-নির্ভর নয়। ৩৯-এ পা দিতে যাওয়া লিওনেল মেসি তার রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন ঠিকই, কিন্তু স্কালোনির বর্তমান ছকে মেসি ছাড়াও গোল করার লোক আছে। ডি মারিয়ার অনুপস্থিতিতে লেফট উইংয়ে আছেন থিয়াগো আলমাদা, তার সঙ্গে ফর্মের তুঙ্গে থাকা লাউতারো মার্টিনেজ এবং হুলিয়ান আলভারেজ। স্পেন যেভাবে শুরুর একাদশে ইয়ামাল বা নিকো উইলিয়ামসকে বেঞ্চে রেখে কিছুটা ‘অলস ফুটবল’ খেলেছিল, স্কালোনি নিশ্চয়ই আলজেরিয়ার বিপক্ষে সে পথে হাঁটবেন না।
আলজেরিয়া কি কেপ ভার্দের মতো রক্ষণাত্মক দেয়াল তুলবে?
কেপ ভার্দে যেভাবে স্পেনের আক্রমণ রুখে দিয়েছে, আলজেরিয়ার পক্ষে কি সেটা সম্ভব? পরিসংখ্যান বলছে, শক্তিমত্তার দিক থেকে কেপ ভার্দের তুলনায় আলজেরিয়া অনেক এগিয়ে। ফিফা র্যাংকিংয়ে কেপ ভার্দের অবস্থান যেখানে ৬৪, আলজেরিয়া আছে ২৭তম অবস্থানে। কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচের অধীনে শেষ ২৮ ম্যাচের ২১টিতেই জিতেছে ডেজার্ট ওয়ারিওররা। তবে তাদের মূল শক্তি কেপ ভার্দের মতো শুধু 'পার্ক দ্য বাস' বা রক্ষণাত্মক ফুটবল নয়, বরং কুইট কাউন্টার অ্যাটাকেই তাঁরা বড় দলগুলোকে ধরাশায়ী করে থাকে।
কেপ ভার্দে যেভাবে লো ডিফেন্সিভ ব্লকে খেলে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়েছে, আলজেরিয়া ঠিক এই ব্র্যান্ডের ফুটবল খেলে না। বড় দলগুলোর বিপক্ষে কখনও কখনও প্রয়োজনে লো ব্লক ডিফেন্স করলেও আলজেরিয়ান খেলোয়াড়রা শুধু ডিফেন্স সামলাতে রক্ষণভাগে বসে থাকবে না। বরং ট্রানজিশনে দ্রুতগতিতে আক্রমণে উঠে কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে সিদ্ধহস্ত এই দলটি। বিশেষ করে দুই উইংয়ে রিয়াদ মাহারেজ ও আমুরাকে সামলানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে আর্জেন্টিনার ফুলব্যাক মলিনা-মন্তিয়েল-মেদিনাদের জন্য।
তবে আলজেরিয়ার জন্য বড় ধাক্কা হলো তাদের অভিজ্ঞ সেন্টারব্যাক রামি বেনসেবাইনি ইনজুরির কারণে এই ম্যাচে খেলছেন না। কিন্তু তাদের আছে হিশাম বুদাউইয়ের মতো এক 'মিডফিল্ড ইঞ্জিন', যিনি প্রতি ম্যাচে ১১ থেকে ১২ কিলোমিটার দৌড়ে মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
আর গোলপোস্টে জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকা জিদান আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে হতাশ করতে প্রস্তুত আছেন। ঠিক যেমনটা স্পেনের বিপক্ষে করে দেখিয়েছেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। আলজেরিয়া যদি কেপ ভার্দের মতো মাঝমাঠের স্পেস বন্ধ করে দিতে পারে, তবে লেফটব্যাক তাগলিয়াফিকোর অনুপস্থিতিতে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে হয়তো কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।
মাহরেজ-আমুরার আক্রমণ বনাম আর্জেন্টিনার 'দিবু’ মার্টিনেজ
স্পেন ম্যাচে কেপ ভার্দে কেবল রক্ষণই সামলায়নি, বেশ ক'বার কাউন্টার অ্যাটাকে স্পেনকে কাঁপিয়েও দিয়েছিল। আলজেরিয়ার হয়ে এই কাজটি করার জন্য প্রস্তুত আছেন দলের ৩৫ বছর বয়সী অধিনায়ক রিয়াদ মাহরেজ। আগের মতো পুরো ৯০ মিনিট একই ক্ষিপ্রতায় (ইনটেনসিটিতে) খেলার গতি হয়তো তাঁর নেই, কিন্তু ৬০-৬৫ মিনিটও যদি মাঠে থাকেন তাহলে দূরপাল্লার শটে, কিংবা বক্সের ভেতর ফাইনাল পাস বাড়িয়ে ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন সাবেক এই ম্যান সিটি তারকা। বিশেষ করে কাউন্টার অ্যাটাকে রাইট উইংয়ে তার গতি যেকোনো ডিফেন্সের জন্যই বড় হুমকি।
তবে সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় প্রতিপক্ষের জন্য মাহরেজের চেয়েও বেশি বিপদজনক বোধহয় দলের আরেক উইঙ্গার মোহামেদ আমুরা, যিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ১০টি গোল করেছেন। এক্ষেত্রে একটি মজার তথ্য উল্লেখ করা আবশ্যক। এখন পর্যন্ত আমুরা ১৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছেন এবং এর প্রতিটিতেই জিতেছে আলজেরিয়া। অর্থাৎ, আমুরা গোল পেলে আলজেরিয়া জিতবে, এটাই যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে!
তবে আলজেরিয়ার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে প্রস্তুত বাজপাখি নামে পরিচিত এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। আঙ্গুলের চোট থেকে সম্পূর্ণ ফিট হয়ে আলজেরিয়া ম্যাচেই গোলপোস্টে ফিরছেন এই অ্যাস্টন ভিলা তারকা।
হেড-টু-হেড ও রেকর্ড কী বলছে?
অতীতে আলজেরিয়া-আর্জেন্টিনা একবারই মুখোমুখি হয়েছিল। ২০০৭ সালের সেই রোমাঞ্চকর প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৪-৩ ব্যবধানে। কাকতালীয়ভাবে সেই ম্যাচেই লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে ক্যারিয়ারে প্রথমবার জোড়া গোল করেছিলেন।
আলজেরিয়ার সাথে ম্যাচের আগে রেকর্ড আর্জেন্টিনার পক্ষেই কথা বলছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকার দলগুলোর বিপক্ষে শেষ ৬টি ম্যাচের সবকটিতেই জিতেছে আলবিসেলেস্তারা।
তবে কেপ ভার্দের সাথে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ড্র করা, তাঁদের একের পর এক আক্রমণ নবাগত এক দলের ডিফেন্সের সামনে মুখ থুবড়ে পড়া প্রমাণ করে যে, মাঠের লড়াইয়ে অতীত রেকর্ড কোনো কাজে আসে না।
এখন প্রশ্ন, আলজেরিয়া কি পারবে কেপ ভার্দের মতো রূপকথা লিখে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিতে? নাকি চ্যাম্পিয়নের মতোই মিশন শুরু করবেন লিওনেল মেসিরা? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।