কথায় আছে, বাঘ এক পা পিছিয়ে যায় থাবা মারার আগে। ব্রাজিলও যেন ঠিক সেটাই করেছে। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র, চারদিকে সমালোচনা, মাঠজুড়ে অগোছালো ফুটবল। বিশ্বকাপের শুরুটা মোটেও ব্রাজিলসুলভ ছিল না। কিন্তু বড় দলগুলোকে আলাদা করে দেয় একটা ব্যাপার- তারা জানে কীভাবে জবাব দিতে হয়। হাইতির বিপক্ষে সেই জবাবের প্রথম কণ্ঠস্বর ছিলেন মাতেউস কুনিয়া। জোড়া গোলে ব্রাজিলকে এনে দিলেন স্বস্তি, আর ফিরিয়ে দিলেন আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু গল্পটা শুধু কুনিয়ার নয়। গল্পটা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নিজেকে ফিরে পাওয়ারও। দুই ম্যাচে দুই গোল, এক অ্যাসিস্ট। পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বিশ্বকাপে এটাই ভিনিসিয়ুসের পারফরম্যান্স। কিন্তু পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে না, প্রতিপক্ষের রক্ষণে কতটা ত্রাস ছড়াচ্ছেন এই ব্রাজিলিয়ান। কীভাবে একাই নাচিয়ে ছাড়ছেন ডিফেন্ডারদের। ব্রাজিল সমর্থকেরা তো মনে প্রাণে এই ভিনিসিয়ুসকেই এতদিন ধরে চাইছিল জাতীয় দলের জার্সিতে।
ভিনিসিয়ুসকে নিয়ে কেন এতদিন হাহাকার ছিল, সেটাও দেখা যাক। বিশ্বকাপ শুরুর আগ পর্যন্ত ব্রাজিলের জার্সিতে ভিনিসিয়ুস খেলেছেন ৪৯টি ম্যাচ। তাতে গোল ছিল মোটে ৯টি। অথচ সেই একই ভিনিসিয়ুস তাঁর ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে গোলের পর গোল করে যাচ্ছিলেন। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দিলেই ভিনি যেন আর গোলপোস্টের ঠিকানা খুঁজে পেতেন না।
ফলে সমালোচনা শুরু হতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। কথা চাউর হলো, ভিনিসিয়ুস শুধুই রেয়াল মাদ্রিদের, ব্রাজিলের নয়। নিজ দেশের সমর্থকেরাই দুয়ো দিতে থাকলেন। তাতে হতাশ হলেও ভেঙে পড়লেন না ভিনি। অপেক্ষায় থাকলেন শিকারী বাঘের মতো।
সেই অপেক্ষাটা ফুরোলো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে। মরক্কোর বিপক্ষে সেদিন যেখানে পুরো ব্রাজিল দলটাই খাবি খেয়েছে, সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন একমাত্র ভিনিসিয়ুস। শুরুতে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিল সেদিন হার এড়ায় ভিনির দর্শনীয় এক গোলে। এরপর আর গোল না পেলেও দ্বিতীয় গোলের সন্ধানে সেদিন মরক্কো রক্ষণকে রীতিমতো নাচিয়ে ছেড়েছেন তিনি।
সেই যে ছন্দে ফেরার বার্তা দিলেন, সেটার ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন শনিবার হাইতির বিপক্ষে ম্যাচেও। ব্রাজিলের ৩-০ গোলের জয়ে নিজে গোল করেছেন একটি, আর কুনিয়াকে দিয়ে করিয়েছেন আরেকটি। কুনিয়ার অন্য গোলটিতেও আছে ভিনির পরোক্ষ অবদান। অর্থাৎ, ব্রাজিলের জয়ের পুরোটাই ভিনিসিয়ুসময়।
প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ কীভাবে বদলে গেলেন ভিনিসিয়ুস? এই বদলের পেছনে আছে কার্লো আনচেলত্তি নামের এক ম্যাজিশিয়ান। যার জাদুর কাঠির স্পর্শে রেয়াল মাদ্রিদে নিজেকে নতুন রূপে খুঁজে পেয়ে ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস, সেই আনচেলত্তি-ই এখন ব্রাজিলের কোচ। ব্রাজিলে গিয়ে আনচেলত্তি ব্রাজিলকে ফিরিয়ে দিয়েছেন মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুসকে।
আগে মাদ্রিদে যা করতেন, এখন ব্রাজিলের হয়েও সেটাই করছেন ভিনি। বাঁপ্রান্ত ধরে দারুণ ক্ষিপ্রতায় ওপরে উঠে কাট ইন করে বক্সে ঢুকে ডান পায়ে শট নিচ্ছেন। প্রতিপক্ষ জানে, ঠিক এটাই করবেন ভিনি। কিন্তু তারপরও তাকে থামাতে পারছে না।
ভিনি নাকি কথা দিয়েছেন, এবার বিশ্বকাপে ৬টি গোল করবেন। এর দুটি করেছেন মাত্র। চারটি আসা এখনো বাকি। সেই চ্যালেঞ্জ যদি পূরণ করতে পারেন ভিনি, ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের কঠিন পথটাও সহজ হয়ে উঠবে অনেকটাই।