ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬

মরক্কো ঝড়েই কি উড়ে যাবে ফ্রান্স?

বিশ্বকাপের নকআউটে সবচেয়ে বড় ফাঁদ কোনটা জানেন? যখন কোনো দল ভাবে তাঁরা ম্যাচটা সহজেই জিতে যাবে। কেননা তখনই প্রতিপক্ষ তাঁদের হতাশ করবে এবং ছোট একটি ভুলেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হবে। বোস্টনের ফক্সবরো স্টেডিয়ামে আজ (বৃহস্পতিবার) রাত ২টায় ফ্রান্সের জন্য এই ফাঁদটাই পেতে রেখেছে মরক্কো। 

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের রানার্স-আপ ফ্রান্স আজ কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আফ্রিকার ‘জায়ান্ট কিলার’ মরক্কোর। একদিকে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এমবাপ্পে-অলিসে-দেম্বেলেদের ফ্রান্স, অন্যদিকে নতুন কোচের অধীনে নিজেদের নতুন করে খুঁজে পাওয়া মরক্কো। আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণ, প্রেসিং, ডিফেন্ডিংসহ দুর্দান্ত সব ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স- একটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের সকল উপাদানই দেখা যেতে পারে এই ম্যাচে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কিলিয়ান এমবাপ্পেদের বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে মরক্কো কতটা বাধা হতে পারবে? আফ্রিকান ঝড়েই কি তবে থামবে ওলিসে-দেম্বেলেদের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, নাকি নতুন ইতিহাস রচনায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে মরক্কো? চলুন উত্তরের খোঁজে যাওয়া যাক।

দু'দল যেভাবে এল কোয়ার্টার ফাইনালে

কাগজের কলমে ফ্রান্স ফেভারিট হলেও, কোয়ার্টার ফাইনালে আসার পথটা কিন্তু দুই দলের জন্যই ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা। ফ্রান্স গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০ এবং নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা করেছিল। নরওয়ের বিপক্ষে উসমান ডেম্বেলে করেন হ্যাটট্রিক। এরপর রাউন্ড অব ৩২-তে সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিলেও, রাউন্ড অব ১৬-এ এসে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে চরম পরীক্ষা দিতে হয়েছে ফরাসিদের। প্যারাগুয়ের ডিফেন্সিভ দেওয়ালের সামনে ফ্রেঞ্চ আক্রমণভাগ যখন খেই হারিয়ে ফেলেছিল, তখন ম্যাচের ৭০ মিনিটে এমবাপ্পের পেনাল্টিতে শেষ রক্ষা হয় তাঁদের।

অন্যদিকে মরক্কোর গল্পটা রূপকথার চেয়ে কম নয়। ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড আর হাইতির মতো কঠিন গ্রুপে পড়েও তারা অপরাজিত থেকে নকআউটে আসে। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপ শুরু করে অ্যাটলাস লায়ন্সরা। এরপর স্কটল্যান্ড ও মরক্কোকে হারায় তাঁরা।

তবে আসল নাটক শুরু হয় নকআউটে। রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের সাথে ১২০ মিনিটের ১-১ লড়াই শেষে পেনাল্টি শুটআউটে ডাচদের স্তব্ধ করে দেন গোলকিপার ইয়াসিন বুনু। আর শেষ ১৬-তে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা জানান দেয়, বিশ্বকাপে তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি, ট্রফি জিততে এসেছে। 

মরক্কোর প্রতিশোধ নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে মরক্কোর রূপকথা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে। তবে এবার চার বছর পর মরক্কো আর কেবল কোনো 'চমক' নয়, তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি হওয়ার দাবিদার, যাদের বর্তমান ফিফা র‍্যাংকিং ৬। 

নকআউটে নেদারল্যান্ডস আর কানাডাকে হারিয়ে তাঁরা টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের মূল লক্ষ্য শুধু প্রতিশোধ নয়, দেশের মানুষকে গর্বিত করা। এখন পর্যন্ত ৬ বারের সাক্ষাতে ফ্রান্স জয় পেয়েছে ৪ বার, মরক্কো ১ বার এবং অন্য ম্যাচটি ড্র হয়েছে।

এমবাপ্পে বনাম হাকিমি দ্বৈরথ

কিলিয়ান এমবাপ্পে আর আশরাফ হাকিমির মুখোমুখি লড়াই এই ম্যাচের অন্যতম বড় আকর্ষণ। দু’জনেই লম্বা সময় পিএসজি’তে খেলেছেন, অর্থাৎ সাবেক দুই সতীর্থের সাক্ষাৎ হচ্ছে আজ জাতীয় দলের জার্সিতে।

ফ্রান্সের আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র এমবাপ্পে, যিনি ৭ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসির ঠিক পেছনেই আছেন। কিন্তু মরক্কোর ডিফেন্সের ডানপ্রান্তে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আশরাফ হাকিমি, যাকে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা রাইট-ব্যাক বলা হয়। এমবাপ্পে বনাম হাকিমি- এই লড়াইতে যার জয় হবে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণটাও তাঁদের হাতে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

সাইবারির ইনজুরিতে মরক্কোর কৌশল

ম্যাচের আগে মরক্কো শিবিরের সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে, দুর্দান্ত ফর্মে থাকা স্ট্রাইকার ইসমাইল সাইবারি হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে এই ম্যাচ খেলতে পারছেন না। গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচেই গোল করা এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয়ের নায়ক সাইবারির অনুপস্থিতি মরক্কোর জন্য বিশাল এক ধাক্কা। 

এক্ষেত্রে কোচ ওয়াহবি আজদিন উনাহিকে ওপরে খেলাতে পারেন এবং 'ফলস নাইন' হিসেবে ইসমাইল সাইবারির জায়গায় নতুন কাউকে ব্যবহার করতে পারেন। কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করা উনাহিই এখন মরক্কোর মাঝমাঠের প্রধান ভরসা।

ফ্রেঞ্চ ত্রয়ীকে থামাতে মরক্কোর পরিকল্পনা

ম্যাচের আগে আরেকটি বড় প্রশ্ন, কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল অলিসে আর উসমান দেম্বেলেকে থামাতে মরক্কোর পরিকল্পনা কী? মরক্কো পরিচিত বিশ্বের অন্যতম সুশৃঙ্খল ডিফেন্সিভ দল হিসেবে। ফ্রেঞ্চ আক্রমণভাগকে রুখতে কোচ ওয়াহবি মূলত ৩টি মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মাঠে নামতে পারেন।

প্রথমত, বল পজেশনে যেহেতু ফ্রান্সের ডমিনেট করার সম্ভাবনা বেশি, তাই তাঁরা হয়তো লো-ব্লক ডিফেন্স লাইন নিয়ে খেলার কৌশলে যাবে। এক্ষেত্রে মাঝমাঠের সেন্ট্রাল হাফ-স্পেসগুলো তারা এমনভাবে বন্ধ রাখবে যাতে ফ্রান্সের 'প্লে-মেকার' মাইকেল অলিসে পাস বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ফাঁকা স্পেস না পান। প্যারাগুয়ে ঠিক এই কৌশলেই ফ্রান্সকে হতাশ করেছিল।

দ্বিতীয়ত, উইং পজিশনে ডাবল গার্ড নিয়ে খেলতে পারে মরক্কো। এমবাপ্পে আর দেম্বেলের গতি সামলানো আশরাফ হাকিমি বা নুসাইর মাজরাউইয়ের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাই মরক্কোর সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা অনবরত উইংয়ে চলে আসবেন এবং ফ্রেঞ্চ উইঙ্গারদের সামনে টু-ভি-ওয়ান ওভারলোড তৈরি করবেন। অর্থাৎ, এমবাপ্পে বল পেলেই দুজন ডিফেন্ডার তাঁকে ঘিরে ধরবেন।

আরেকটি কৌশল হতে পারে, খেলার টেম্পো বা গতি নষ্ট করা। মরক্কো চাইবে ফ্রান্স যাতে হাই-টেম্পোতে অ্যাটাকিং থার্ডে পেনিট্রেট করতে না পারে। অর্থাৎ, ফ্রান্সকে ডিরেক্ট ফুটবলের পরিবর্তে মিডফিল্ডে সাইডওয়েজ পাস খেলতে বাধ্য করতে চাইবে তাঁরা। এতে করে ফ্রেঞ্চ ফুটবলাররা হতাশ হয়ে ভুল করতে পারে। আর সেই সুযোগে ব্রাহিম দিয়াজ এবং হাকিমির গতিকে কাজে লাগিয়ে ট্রানজিশনে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে ফ্রান্সের ডিফেন্সে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবে মরক্কো।

কার্ড নিয়ে ফ্রান্সের দুশ্চিন্তা

মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের আগে কার্ড নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে ফ্রান্স শিবিরে। ব্র্যাডলি বারকোলা, মানু কোনে এবং দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার মাইকেল অলিসে- এই তিনজনের নামের পাশেই রয়েছে একটি করে হলুদ কার্ড। মরক্কোর বিরুদ্ধে যদি তারা আরেকটি কার্ড দেখেন, তবে দল সেমিফাইনালে উঠলেও তাঁরা সে ম্যাচে খেলতে পারবেন না। বিশেষ করে অলিসের অনুপস্থিতি ফ্রান্সের জন্য হবে অপূরণীয় ক্ষতি। প্যারাগুয়ে ম্যাচে ইনজুরিতে থাকা অরেলিয়ান চুয়ামেনির খেলা নিয়েও সংশয় কাটেনি।

রেফারিং নিয়ে বিতর্ক

ম্যাচের রেফারিং নিয়েও কিন্তু জল ঘোলা হচ্ছে। এই ম্যাচের দায়িত্বে আছেন আর্জেন্টিনার রেফারি ফাকুন্দো তেলো। শুধু তাই নয়, এই ম্যাচের ৪ সহকারী অফিশিয়ালও আর্জেন্টাইন। ২০২২ ফাইনালের পর থেকে ফ্রান্স-আর্জেন্টিনা যে বৈরিতা তৈরি হয়েছে, তাতে ফ্রেঞ্চ মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানালেও ফ্রেঞ্চ কোচ দিদিয়ের দেশম জানিয়েছেন, তিনি রেফারির ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন।

শক্তিমত্তায় ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও, মরক্কোর ডিফেন্সিভ লক এবং গোলকিপার ইয়াসিন বুনুর চ্যালেঞ্জ তাঁদেরকে পেরোতে হবে। এছাড়া আশরাফ হাকিমি ও মাজরাউইরা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ম্যাচে প্রথমে গোল করার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এমবাপ্পের টানা দ্বিতীয় ফাইনালের স্বপ্ন কি বোস্টনেই শেষ হবে, নাকি আফ্রিকার দেশ হিসেবে মরক্কো লিখবে নতুন কোনো মহাকাব্য? উত্তরটা জানতে অপেক্ষা আর মাত্র কয়েক ঘন্টার।