বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ মানেই দক্ষতা ও কৌশলের পাশাপাশি স্নায়ুর লড়াই। এমনই এক স্নায়ুর লড়াইয়ে আজ রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও ফিফা র্যাংকিংয়ের ৮ নাম্বারে থাকা বেলজিয়াম।
একদিকে টানা ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত থাকা ২০১০-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন, অন্যদিকে নিজেদের হারিয়ে খোঁজা বেলজিয়ামের 'গোল্ডেন জেনারেশন'। হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রে ১৮ বছরের এক তরুণ তুর্কি, যিনি ইতোমধ্যেই স্পেনের ‘মেসি’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। নাম লামিন ইয়ামাল।
প্রশ্ন হচ্ছে, লামিন ইয়ামালকে কি রুখতে পারবে বেলজিয়ামের ডিফেন্স? তাঁদের 'গোল্ডেন জেনারেশনের’ হাতে কি অবশেষে সেই সাফল্য ধরা দেবে যার প্রতীক্ষায় আছে সমর্থকরা? চলুন এই আলোচনাতেই যাওয়া যাক।
দু'দল যেভাবে এল কোয়ার্টার ফাইনালে
প্রথমেই দেখা যাক, কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত স্পেন ও বেলজিয়ামের যাত্রাটা কেমন ছিল। নবাগত কেপ ভার্দের সাথে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকাপের স্পেনের শুরুটা খুব ভালো হয়নি স্পেনের। তবে পরের দুই ম্যাচে সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপ 'এইচ' থেকে ৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকেই নকআউটের টিকিট পায় স্প্যানিশরা। এরপর রাউন্ড অব ৩২-তে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এবং রাউন্ড অব ১৬-এ রোনালদোর পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে কোচ দে লা ফুয়েন্তের দল।
অন্যদিকে, কোচ রুডি গার্সিয়ার বেলজিয়াম গ্রুপ 'জি'তে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে এবং ইরান ও মিশরের সাথে ড্র করে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউটে আসে। এরপর রাউন্ড অফ ৩২-তে সেনেগালের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয় তারা। এরপর রাউন্ড অব ১৬-এ স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েই কোয়ার্টারে পা রাখে বেলজিয়ানরা।
স্পেনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর
তবে স্পেনকে রুখে দেওয়ার কাজটা মোটেই সহজ হবে না বেলজিয়ামের জন্য। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এবারের টুর্নামেন্টের ৫ ম্যাচসহ বিশ্বকাপে টানা ৬ ম্যাচে কোনো গোল হজম করেনি। অর্থাৎ, টানা ১০ ঘণ্টা ৯ মিনিট ধরে স্পেনের জালে কেউ বল জড়াতে পারেনি। চলতি বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে প্রত্যাশিত গোল (বা এক্সজিএ) হচ্ছে মাত্র শূন্য দশমিক তিন শূন্য (০.৩০), যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো দলের চেয়ে কম।
রক্ষণের পাশাপাশি স্পেনের মিডফিল্ডও যে বিশ্বসেরা সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিডফিল্ডে প্রতিটি পজিশনে তাঁদের অন্তত দু’জন করে সেরা খেলোয়াড় আছেন, সম্প্রতি এমন দাবি করে স্প্যানিশ কোচ বলেছেন, তাঁদের মিডফিল্ডই এই মুহূর্তে বিশ্বসেরা। এই যেমন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার রদ্রি এই টুর্নামেন্টে একাই দিয়েছেন ৮০টি লাইন-ব্রেকিং পাস, যা ২০১০ সালের জাভি–ইনিয়েস্তাদের সোনালী যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই স্প্যানিশ আর্মাডাকে ভাঙা তাই যেকোনো দলের জন্যই এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
কেন ইয়ামালই স্পেনের 'মেসি'
২০১০ সালে স্পেন যখন প্রথম ও শেষবার বিশ্বকাপ জয় করে তখন লামিন ইয়ামালের বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। আজ সেই ছেলেটিই স্পেনের আক্রমণভাগের মূল স্তম্ভ এবং দলের সবচেয়ে বড় তারকা। যদিও সদ্য হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে ফিরে ৫ ম্যাচে ইয়ামাল গোল পেয়েছেন মাত্র ১টি, কিন্তু সার্বিকভাবে তাঁর পারফরম্যান্স বা ম্যাচে তাঁর প্রভাব শুধুই পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যাবে না।
চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই ১৭টি সফল ড্রিবল করেছেন এই বার্সেলোনা তারকা। সতীর্থ দানি ওলমো তো বলেই দিয়েছেন, ইয়ামাল মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ২-৩ জন ডিফেন্ডার তাকে মার্ক করতে ব্যস্ত থাকে, আর তাতেই তৈরি হয় স্পেস। ড্রিবলিং-এর দুর্দান্ত দক্ষতা আর নিখুঁত অ্যাসিস্ট দেওয়ার ক্ষমতার কারণেই ইয়ামালকে রুখতে আলাদা করে ছক কষতে হচ্ছে বেলজিয়ামকে।
ম্যাচের আগে ইয়ামাল প্রসঙ্গে স্পেন কোচ বলেছেন, সবাই এখন মাঠে লামিন ইয়ামালের ‘ভার্সন টু-পয়েন্ট-সামথিং’ বা আরও উন্নত ভার্সন দেখতে পাবেন। কোচের মতে, ইয়ামাল মাঠে থাকা মানেই পিওর ম্যাথমেটিক্স। সে যখন একা ২-৩ জন ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে নেয়, তখন মাঠের বাকি অংশে স্পেস তৈরি হয় এবং সেই সুযোগটাই নেয় স্পেন।
কীভাবে থামবে স্পেনের ‘মেসি’?
কিন্তু বেলজিয়ামের গোলপোস্টেও আছেন রিয়াল মাদ্রিদের অভিজ্ঞ গোলকিপার থিবো কুর্তোয়া, যিনি স্প্যানিশ লা লিগায় ইয়ামালকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বেলজিয়াম ডিফেন্সকে কুর্তোয়া ইতোমধ্যেই ইয়ামালকে থামানোর একটি নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ব্লুপ্রিন্ট দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ইয়ামালকে ওয়ান-অন-ওয়ান বা একা আটকানো অসম্ভব। তাকে থামাতে হলে মাঠে ‘টু-অন-ওয়ান’ বা টু-ভি-ওয়ান পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ, সবসময় দুজন খেলোয়াড়কে দিয়ে তাঁকে কড়া পাহারায় রাখতে হবে।
মজার ব্যাপার হলো, ইয়ামাল নিজেও এই ছকটা জানেন। আর তাই এই বিস্ময়বালক আগেই বলে রেখেছেন, ভবিষ্যতে তিনি আক্রমণভাগে সেন্ট্রাল পজিশনে, অর্থাৎ নাম্বার টেনের ভূমিকায় খেলতে চান। কারণ তাঁর মতে, একমাত্র মাঝমাঠেই ৩ জন খেলোয়াড় একসাথে কাউকে মার্ক করতে পারে না।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন কিছু
তাহলে আজকের ম্যাচে বেলজিয়ামের কি কোনো সুযোগ নেই? পরিসংখ্যান বলছে, শেষ ১১ ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে জয় পায়নি বেলজিয়াম। এদিকে তাঁদের মাঝমাঠের প্রাণ আমাদু ওনানা এসিএল ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছেন। তাই স্পেন ম্যাচের আগে দুশ্চিন্তা বেড়েছে বেলজিয়াম শিবিরে।
কিন্তু গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়া তা মানতে নারাজ। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বেলজিয়াম এখন ছন্দে ফিরছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। লুকাকু বেঞ্চ থেকে নেমে গোল করে ফর্মে থাকার জানান দিয়েছেন। এছাড়া ফর্মে আছেন ট্রোসার্ড ও চার্লস ডে কেটলারে।
বিশ্বকাপের নকআউটে স্পেনের বিপক্ষে সাফল্য পাওয়ার ইতিহাস কিন্তু আছে বেলজিয়ামের। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও স্পেনকে টাইব্রেকারে বিদায় করেছিল বেলজিয়াম। ৪০ বছর আগের সেই সাফল্য থেকে প্রেরণা খোঁজার চেষ্টা নিশ্চয়ই করবেন ইউরি তিয়েলেমানস, কুর্তোয়ারা।
এছাড়া ডি ব্রুইনা ও লুকাকুদের ‘গোল্ডেন জেনারেশনের’ এটাই শেষ বিশ্বকাপ। আর তাই মাঠে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করবেন তাঁরা, এটাই স্বাভাবিক।
অপ্টা সুপারকম্পিউটার অবশ্য আজকের ম্যাচে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ, আর বেলজিয়ামের মাত্র ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে ফুটবল তো আর কম্পিউটারে খেলা হয় না, খেলা হয় সবুজ মাঠে।
আজ লস অ্যাঞ্জেলেসে যে জিতবে, সেমিফাইনালে তার জন্য অপেক্ষা করছে কিলিয়ান এম্বাপ্পের ফ্রান্স। স্পেনের 'মেসি' ইয়ামাল কি পারবেন তার জাদুতে স্পেনের অপরাজেয় যাত্রা ধরে রাখতে? নাকি কুর্তোয়ার গ্লাভস আর লুকাকু-ডি ব্রুইনাদের অভিজ্ঞতার সামনে খেই হারাবে স্প্যানিশ আর্মাডা? উত্তরটা সময়ের জন্যই তোলা রইলো।