ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ফাইনালের আগে 'আসল ফাইনাল'?

দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও সাক্ষাৎ হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বুধবার দিবাগত রাত ১টায় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ১৯৬৬’র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

একদিকে ৬০ বছরের খরা কাটিয়ে ট্রফি জয়ের স্বপ্নে বিভোর হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড, অপরদিকে লিওনেল মেসির শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে শেষ পালক যোগ করার মিশনে আর্জেন্টিনা। অনেকেই এই ম্যাচটিকে ফাইনালের আগে 'আসল ফাইনাল' বলছেন। কিন্তু কেন? এটা কি কেবলই এজন্য যে, নকআউট পর্বে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে এই দুই দলকে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ? চলুন আলোচনায় যাওয়া যাক।

ফুটবল যখন ইতিহাসের মুখোমুখি

ফুটবল বিশ্বে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ মানে কেবলই ফুটবলের লড়াই নয়। মাঠের ফুটবলের সাথে মাঠের বাইরের আবেগ ও ভূ-রাজনীতির এক জটিল মিশ্রণও রয়েছে এতে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত যুদ্ধ এই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে যে তিক্ততার জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, তার আঁচ লেগেছে ফুটবল মাঠেও। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো মারাদোনার সেই 'হ্যান্ড অব গড' খ্যাত গোল, কিংবা ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়া, এসব ঘটনাই এই দ্বৈরথকে এক অনন্য নাট্যরুপ দিয়েছে। 

মেসির সামনে প্রথমবার ইংল্যান্ড

লিওনেল মেসি- ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে শুরু করে ৮টি ব্যালন্ড ডি'অর- ক্যারিয়ারে কী জেতেননি তিনি? কিন্তু ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সব পরাশক্তির বিরুদ্ধে খেললেও, কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি তিনি। আজই প্রথম থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামছেন এলএমটেন। এবারের বিশ্বকাপে ৮ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে ইতোমধ্যেই শীর্ষে অবস্থান করছেন ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন তারকা। 

আর্জেন্টিনার লক্ষ্য ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ ধরে রাখা। তবে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার পথটা একেবারেই মসৃণ ছিল না। মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ৩ গোল করে জয় পায় স্কালোনির দল। এছাড়া কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডকে হারাতে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলতে হয়েছে তাঁদেরকে। তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলের ক্লান্তি হতে পারে দুশ্চিন্তার কারণ। 

ইংল্যান্ডের নির্ভরশীল আক্রমণভাগ

ফুটবলকে সাধারণত বলা হয় ‘উইক লিঙ্ক স্পোর্ট’ বা দুর্বলতম খেলোয়াড়ের খেলা। অর্থাৎ, দল কতটা শক্তিশালী তা নির্ভর করে দলের সবচেয়ে দুর্বল ফুটবলারটির ওপর। কিন্তু হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিনহামের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ইংল্যান্ড যেন এই প্রচলিত ধারণাটি পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।

চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ১৩টি গোলের ১২টিই করেছে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম। অর্থাৎ, দলের ৯২ শতাংশ গোল এই দু'জন করেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কোনো দলের আক্রমণভাগ নির্দিষ্ট দুজন খেলোয়াড়ের ওপর এতটা নির্ভরশীল কখনও ছিল না। 

আর্জেন্টিনার শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা

আর্জেন্টিনার মূল শক্তি অবশ্যই ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি এবং তাদের আক্রমণভাগ। যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দুর্দান্ত ক্ষমতা আছে এই দলটির। কিন্তু নকআউট পর্বে এসে ধারাবাহিকতার অভাব আলবিসেলেস্তেদের এক বড় দুর্বলতার জায়গা হিসেবে চোখে পড়েছে। 

কেপ ভার্দে, মিশর কিংবা সুইজারল্যান্ড- তিন ম্যাচেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের বিপক্ষে তাঁদেরকে ভুগতে হয়েছে। বিশেষ করে, প্রতিপক্ষ যদি মাঝমাঠ জমাট রেখে খেলে তবে গোল বের করা যে আর্জেন্টিনার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ, তা স্পষ্ট হয়েছে নকআউটের এই তিন ম্যাচে। এছাড়া দলের ক্লান্তি এবং মাঝেমধ্যেই রক্ষণভাগের খেই হারিয়ে ফেলার বিষয়টিও তাঁদেরকে ভোগাতে পারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

তবে এটাও ঠিক, নকআউট পর্বে এসে আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে, খাঁদের কিনারায় দাঁড়িয়ে পুরো দল এক হয়ে কীভাবে লড়াই করতে হয়, এবং ম্যাচের মাঝেই পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশলে পরিবর্তন এনে কীভাবে সমস্যার সমাধান করে জয় তুলে নিতে হয়। এক্ষেত্রে নিজেদের হার-না-মানা মানসিকতার পরিচয়ও দিয়েছে মেসি, রোমেরো, হুলিয়ান আলভারেজরা।

ইংল্যান্ডের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের মূল শক্তি তাদের বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাক এবং আক্রমণভাগে কেইন-বেলিনহাম জুটি। এছাড়া মাঝমাঠে ডেক্লান রাইস, অ্যান্ডারসন, সাকা, অ্যান্থনি গর্ডনরা আছেন কেইন-বেলিংহামকে সার্ভিস দেওয়ার জন্য।

তবে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের রক্ষণভাগের এলোমেলো পারফরম্যান্স। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর কোচ থমাস টুখেল নিজেই ইংলিশ রক্ষণকে 'স্লোপি' বা দুর্বল বলেছেন। তার ওপর সেন্টার ব্যাক জন স্টোনস টানা ১২০ মিনিট খেলার পর আর্জেন্টিনা ম্যাচে প্রথম থেকে খেলার জন্য কতটা ফিট থাকবেন, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। 

এছাড়া আজ অসুস্থতা কাটিয়ে ডেক্লান রাইস প্রথম একাদশে থাকবেন কিনা, সেটাও এখনও নিশ্চিত নয়। মিডফিল্ডে রাইসের সার্ভিস পাওয়া না গেলে, অ্যাটাকিং থার্ডে কেইন-বেলিংহামরা কতটা ফ্রি-ফ্লোয়িং ফুটবল খেলতে পারবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

চোখ থাকবে যাদের ওপর

আর্জেন্টিনার হয়ে স্পটলাইটে থাকবেন যথারীতি লিওনেল মেসি (৮ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট)। তাঁকে সাহায্য করতে সদা প্রস্তুত থাকবে রদ্রিগো, এনসো, পারেদেস, মলিনা, মন্তিয়েল ও হুলিয়ান আলভারেজরা। এছাড়া ইংলিশ ডিফেন্সের জন্য হুমকি হতে পারেন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজও। 

আর মাঝমাঠে ইঞ্জিন হিসেবে থাকবেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, যার প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কাজে লাগবে। এছাড়া দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কেইন-বেলিংহামদের রুখতে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের কাছ থেকেও সেরাটা প্রত্যাশা করবে আর্জেন্টিনা। 

অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের বাজির ঘোড়া নিঃসন্দেহে জুড বেলিনহাম এবং অধিনায়ক হ্যারি কেন। উভয়েই ৬টি করে গোল করেছেন এবং একটি করে অ্যাসিস্ট দিয়েছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে একই দেশের দুজন খেলোয়াড়ের ৬ বা তার বেশি গোল করার রেকর্ড এটাই প্রথম। এছাড়া আছেন টুর্নামেন্টে ৩টি অ্যাসিস্ট দেওয়া অ্যান্থনি গর্ডন। পাশাপাশি প্রতি ৯০ মিনিটে ১টি করে অ্যাসিস্ট দেওয়ার যে সক্ষমতা বুকায়ো সাকার আছে সেটা এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা।

হেড-টু-হেড পরিসংখ্যান কী বলে?

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত মোট ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে ৬ বার, আর্জেন্টিনা ২ বার এবং বাকি ৬টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। এছাড়া বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা মুখোমুখি হয়েছে ৫ বার। সেখানেও ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে ইংল্যান্ড। 

এর মধ্যে আছে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার সেই বিখ্যাত জয়, যেখানে দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম। তবে ২০০২ বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে বেকহ্যামের গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল থ্রি লায়ন্সরা। অর্থাৎ, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই আলোচিত ম্যাচের পর ৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময়ে ইংল্যান্ড কখনও আর্জেন্টিনার কাছে হারেনি। 

সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী

অপটা সুপারকম্পিউটারের মতে, নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় ইংল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আর্জেন্টিনার ৩২ শতাংশ। আর ম্যাচটি ড্র হয়ে অতিরিক্ত সময় বা পেনাল্টি শুটআউটে গড়ানোর সম্ভাবনা ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে ইংল্যান্ড সামান্য এগিয়ে আছে। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার ফাইনালে উঠার সম্ভাবনা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

ইতিহাসের টানটান উত্তেজনা, ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, মেসি-হ্যারি কেইন দ্বৈরথ, কিংবা পেনাল্টি বক্সে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মনস্তাত্ত্বিক খেলা- সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ আর ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের এক মহাকাব্যিক লড়াই দেখার অপেক্ষায় আছে ফুটবল বিশ্ব। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ডই কি যাবে ফাইনালে? নাকি রূপকথার শেষ অধ্যায়ে আরও একধাপ এগিয়ে যাবেন লিওনেল মেসি? উত্তরের জন্য অপেক্ষা আর মাত্র কয়েক ঘন্টার।