কয়েকদিন আগেও ফিফা সভাপতি পদে অবস্থানটা পোক্তই ছিল জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। এমনকি ২০২৭ সালের নির্বাচনেও জয় পাওয়া অনেকটা পরিষ্কার ছিল তাঁর। কিন্তু একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা যেন হঠাৎ করেই বদলে দিয়েছে সব হিসাব।
বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে ফিফা। আর এই সিদ্ধান্ত এখন প্রশ্ন তুলেছে— ফিফার সভাপতি পদে কি টিকে থাকতে পারবেন ইনফান্তিনো?
ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাস ইনফান্তিনোর জন্য হতে পারে সবচেয়ে কঠিন সময়। তাকে অনাস্থা ভোটের মুখে পড়তে হতে পারে, আগামী মার্চের নির্বাচনে হারতে পারেন, কিংবা নিজেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারেন।
কী ছিল ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা?
ইনফান্তিনো ফিফার একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেখানে বাইরের বিনিয়োগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রস্তাব ছিল, নতুন প্রতিষ্ঠানটির ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জোশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের নামও সামনে আসে।
ইনফান্তিনোর যুক্তি ছিল, এই অর্থ ফিফার সদস্য দেশগুলোর উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি ফেডারেশন তাৎক্ষণিকভাবে ২ কোটি ডলার এবং পরে ২০৩৭ সালের মধ্যে আরও ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার পাওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু এই পরিকল্পনাই বড় ধরনের বিরোধিতার জন্ম দেয়।
কেন বিরোধিতা করল ইউরোপ-এশিয়া?
ফিফার সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধিতা আসে ইউরোপের উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনক্যাকাফ থেকে।
এই তিন অঞ্চলের মোট ১৪৩টি সদস্য দেশ পরিকল্পনার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ইনফান্তিনোর প্রস্তাব পাস করতে প্রয়োজন ছিল ১০৬ ভোট। কিন্তু বিরোধিতার পর হাতে থাকা সমর্থনের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৬৮-তে। ফলে পরিকল্পনাটি কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
উয়েফা আরও কঠোর অবস্থান নেয়। তারা হুমকি দেয়, পরিকল্পনা বাতিল না হলে ইউরোপের ৫৫টি দেশ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের মতো দল বাদ পড়লে টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক আকর্ষণও কমে যেত। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাতে প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো।
কেন সমালোচনার মুখে পড়েছে এই পরিকল্পনা?
সমালোচকদের প্রশ্ন, ফিফার কি আদৌ বাইরের বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন ছিল? কারণ, ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে থেকেই ফিফার হাতে ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ডলারের নগদ অর্থ। বিশ্বকাপ থেকে আরও বড় অঙ্কের আয়ও এসেছে। ফলে অর্থের সংকট মেটাতে মালিকানার অংশ বিক্রির প্রয়োজন ছিল না বলেই মনে করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণত দুটি কারণে মালিকানার অংশ বিক্রি করে— প্রথমত, অর্থের প্রয়োজন হলে; দ্বিতীয়ত, বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কৌশলগত অংশীদার আনতে। কিন্তু ফিফার ক্ষেত্রে এই দুই কারণই খুব একটা প্রযোজ্য নয়।
আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে, যদি ফিফা সত্যিই অংশীদার বিক্রি করতে চাইত, তাহলে উন্মুক্ত দরপত্রের আয়োজন করা হলো না কেন? অনেকের মতে, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় গেলে ফিফা আরও ভালো প্রস্তাব পেতে পারত।
ইনফান্তিনোর ক্ষমতা কি কমছে?
২০১৬ সালে ফিফার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইনফান্তিনো সংগঠনটির আয় ও সদস্য দেশগুলোর অর্থ সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন। গত ১০ বছরে প্রতিটি সদস্য দেশের জন্য ফিফার অর্থ সহায়তা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে এবং ফুটবল প্রকল্পে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ।
এ কারণেই বিশ্বের অনেক ফুটবল ফেডারেশন এখনো তার পাশে রয়েছে। তাদের কাছে ফিফার অর্থ সহায়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। ফিফার দুই শীর্ষ কর্মকর্তাও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেন। সাবেক যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল প্রধান ও ফিফা উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো প্রতিবাদ জানিয়ে পদ ছাড়েন। আর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামোর অভিযোগ করেন, পরিকল্পনা তৈরির সময় ফিফার কর্মীদের যথেষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
সামনে কী হতে পারে?
তবে ইনফান্তিনোকে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়। ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট আনতে প্রয়োজন ৪৩টি সদস্য দেশের উদ্যোগ। এরপরও একজন শক্তিশালী বিকল্প প্রার্থী প্রয়োজন হবে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রার্থী সামনে আসেননি।
এ ছাড়া ইনফান্তিনোর রয়েছে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কাতারের রাজপরিবার এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এসব সমর্থন থাকলে তাকে সরানো কঠিন হতে পারে।
তবে সমালোচকদের মতে, ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন বিশ্বাসযোগ্যতা। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে তিনি যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, সেটিই এখন তার নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ফিফার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা ইনফান্তিনো কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, নাকি বিশ্বকাপ বিক্রির বিতর্কই তার ক্ষমতার শেষ অধ্যায়ের শুরু হবে— সেটিই এখন দেখার বিষয়।