তিন পাতার বিদায়বার্তায় শেষ মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়

দিনটা যে একদিন আসবে, এটা জানাই ছিল। কী ঘোষণা হবে, সেটাও খুব কাঙ্ক্ষিত আর অনুমিত। তারপরও যেন মেসির একটা ঘোষণা থমকে দিল গোটা ফুটবল বিশ্বকেই। চিরতরে জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেল লিওনেল মেসি। 

বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ৯টা। মায়ামিতে বেলা ১১টা। সামাজিক মাধ্যমে একটা ছোট্ট পোস্ট করলেন মেসি, সেখানেই জানিয়ে দিলেন বার্তাটা- আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর কখনো দেখা যাবে না তাঁকে। যাঁকে ছাড়া আন্তর্জাতিক ফুটবল কল্পনা করাই কঠিন, সেই মানুষটাই বলে দিলেন, এবার থামার পালা।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। আঠারো বছরের এক কিশোর, প্রথমবার গায়ে জড়ালেন আকাশি-নীল জার্সি। নিজের অভিষেক ম্যাচে মাঠে ছিলেন মোটে সাতচল্লিশ সেকেন্ড, লাল কার্ড দেখে উঠে যেতে হয়েছিল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। সেদিন কেউ ভাবেনি, এখান থেকেই লেখা হবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এক অধ্যায়।

তারপর কেটে গেছে একুশটা বছর। দুইশো সাতটা ম্যাচ, একশ পঁচিশটা গোল, আর অগণিত জাদুকরী মুহূর্ত। কিন্তু মেসির পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।

২০১৪, ২০১৫, ২০১৬ — পরপর তিনটা ফাইনালে হার। কান্না, হতাশা, আর সমালোচনার পাহাড়। অনেকে বলেছিল, মেসি বুঝি আর্জেন্টিনার জন্য অপয়া।

এক পর্যায়ে অভিমানে জাতীয় দল থেকে সরেও দাঁড়িয়েছিলেন মেসি। কিন্তু ভাগ্যিস, সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসেছিলেন। আর তারপরই বদলে গেল সবকিছু। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, তারপর ফিনালিসিমা, আর ২০২২ সালে সেই স্বপ্নের বিশ্বকাপ। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের আকাশে উঠল সোনালি ট্রফি। এবার আর্জেন্টিনার চোখে জল ছিল ঠিকই, তবে সে জল আনন্দের।

এরপর খেললেন আরও একটা বিশ্বকাপ, আরও একটা ফাইনাল। এবারও গড়লেন অসংখ্য রেকর্ড, ৩৯ বছর বয়সেও প্রায় একাই টেনে দলকে তুললেন আরেকটা ফাইনালে। কিন্তু এবার শিরোপাটা হাতছাড়া হয়ে গেল। কেউ তখনও জানত না, এটাই হতে যাচ্ছে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

তারপর একদিন, খুব সাধারণ একটা নোটপ্যাড থেকে ছেঁড়া তিনটা পাতা, একটা কলম, আর ভেতরে জমে থাকা এক না-বলা সিদ্ধান্ত। বড় হাতের অক্ষরে, নিজের হাতে লিখলেন সেই বিদায়বার্তা। সেখানে লেখা ছিল, নিজেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে উজাড় করে দিয়েছেন, তাঁর আর দেওয়ার মতো কিছুই বাকি নেই।

বিশটা বছরের ভালোবাসা, লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা একেকটা মুহূর্ত— সবকিছু সঙ্গে নিয়েই বিদায় নিলেন এই কিংবদন্তি। যাঁরা তাঁর বাঁ পায়ের জাদু দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন, তাঁদের মনে রেখে গেলেন এক অদ্ভুত শূন্যতা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর কখনোই মাঠে দেখা যাবে না মেসিকে। কিন্তু চিরতরে থেকে যাবেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে। শুধু কি আর্জেন্টিনার? গোটা ফুটবলেরই ইতিহাসে। মেসি থেকে যাবেন অসংখ্য রাতের দুর্দান্ত সব স্মৃতিতে, চোখ শীতল করা দৃষ্টিনন্দন গোলগুলোর রিপ্লেতে। বিশ্বকাপের ছবিতে। সেই কান্নায়, সেই উল্লাসে। 

বিদায়, লিওনেল মেসি। ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন, দুই দশকের এই অবিস্মরণীয় যাত্রার জন্য।