বয়স ৩৯ এর ঘর পেরিয়েছে। ফুটবলে একজনের পক্ষে যা যা জেতা সম্ভব, তার সবটাই জিতেছেন। যে জাতীয় দলের জার্সিতে এক সময় অপূর্ণতা ছিল, সেটাও ঘুচিয়েছেন। সর্বশেষ ৪ বিশ্বকাপের তিনটাতেই দলকে ফাইনালে তুলেছেন। একবার জিতেছেন শিরোপাও। এর বাইরে দুবার কোপা আমেরিকা ও আরেকবার জিতেছেন ফিনালিসিমা।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষের সময়টা যে এসেছিল, সেটা অনেকটাই অনুমেয় ছিল। অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষটা টানলেন মেসি। গতকাল সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়ে দিলেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর কখনো দেখা যাবে না তাঁকে।
মেসির অবসরের পর তাঁকে নিয়ে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন জাতীয় দলের সতীর্থ থেকে করে বর্তমান ও সাবেক অনেক ফুটবলার এবং কোচ। এর মধ্যে জোসে মরিনিও যা বলেছেন, সেটা হয়তো অনেকের মনের কথা। রেয়াল মাদ্রিদ কোচ জানিয়েছেন, মেসিকে ছাড়া ফুটবল আর আগের মতো থাকবে না!
মেসির অবসর প্রসঙ্গে মরিনিও বলেছেন, ‘অসাধারণ ও অবিস্মরণীয় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন। (মেসিকে ছাড়া) পরের কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ আর কখনোই আগের মতো হবে না।’
পেশাদার ক্যারিয়ারে মেসির জীবনের বড় একটা অধ্যায় কেটেছে বার্সেলোনায়। সেই কাতালান ক্লাবের বর্তমান কোচ হানসি ফ্লিকের ভাষায়, ‘সময় খুব দ্রুত চলে যায়। মেসিই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। এই বিশ্বকাপেও সে অসাধারণ খেলেছে। ওর এই (অবসরের) সিদ্ধান্তে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এটাই জীবন।’
অন্যদিকে জাতীয় দলের সতীর্থরা যেন মেসির এ অবসর মানতেই পারছেন না। আর্জেন্টিনার তরুণ সেনসেশন নিকো পাজ যেমন লিখেছেন, ‘না, লিওওও। তোমার দেওয়ার মতো আরও অনেক বাকি আছে।’
জাতীয় দলের আরেক সতীর্থ এনসো ফের্নান্দেস লিখেছেন, ‘লিও, তুমি যখন (২০১৬ সালে) জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলে, তখন ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি তখন অল্প বয়সী, তোমার সঙ্গে কখনো এক দল হয়ে খেলার সুযোগ পাব কি না— সেটা বুঝতে তোমার বয়সের সঙ্গে নিজের বয়স মিলিয়ে হিসাব কষতাম। কথাটা বোকার মতো শোনাতে পারে, কিন্তু আমি সত্যিই তা-ই করতাম... ভাগ্য ভালো যে তুমি ফিরে এসেছিলে... আমি শুধু তোমার সঙ্গে খেলার সুযোগই পাইনি; আমরা একসঙ্গে ক্যাম্প করেছি, একই ড্রেসিংরুম ভাগ করে নিয়েছি, কঠিন সময় পার করেছি, অবিশ্বাস্য সব মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’
চেলসিতে খেলা এ মিডফিল্ডার আরও লিখেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া পরবর্তীতে জাতীয় দলের ক্যাম্পের কথা কল্পনা করাও কঠিন। মাঠে তোমাকে ১০ নম্বর জার্সি পরতে আর না দেখাটা— এত বছর ধরে অভ্যস্ত চোখের কাছে বিষয়টি অসম্ভব বলে মনে হয়। ইতিহাসের অংশ হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমরা তোমাকে খুব মিস করব, অধিনায়ক।’
আর্জেন্টিনার আরেক মিডফিল্ডার লেয়ান্দ্রো পারেদেস লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, এই খবরের (মেসির অবসর) জন্য আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না... জাতীয় দলের এই সুন্দর যাত্রায় তোমার পাশে থেকে খেলতে পেরেছি, এ জন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমাদের এত অসাধারণ মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!’
মেসির বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত রদ্রিগো দে পলের ভাষায়, ‘দেশের প্রতি তোমার ভালোবাসা, কখনো হার না মানতে ভেতরের লড়াই, অবিচার সহ্য করার শক্তি এবং সব খেলোয়াড়ের প্রতি মানবিকতা— সবকিছুর জন্য শুধু ধন্যবাদ। সর্বকালের সেরা, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না যে আমাদের মুখে কত হাসি ফুটিয়েছ। তুমি অমর।’
জাতীয় দলের সাবেক সতীর্থ আনহেল দি মারিয়া অবশ্য খুব বেশি কিছু লেখেননি। কিন্তু দি মারিয়ার তিন শব্দই যেন অনেক কথা বলে। সাবেক এ ফুটবলার লিখেছেন, ‘চিরকালীন ধন্যবাদ, অধিনায়ক।’
আর স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেসের ভাষায়, ‘লিও, তুমি আমাদের জন্য যা করেছ, কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো যথেষ্ট শব্দ আমার জানা নেই। মাঠের ভেতর তোমার সব অর্জনই নয় শুধু, মাঠের বাইরে আমাদের যা শিখিয়েছ, তা আমি সব সময় মনে রাখব: কখনো হার না মানা, প্রতিটি হোঁচটের পর আবারও চেষ্টা চালানো, নীরবে কাজ করা এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজেদের ওপর সব সময় বিশ্বাস রাখা। তোমার নেতৃত্ব শুধু গোল, অ্যাসিস্ট বা শিরোপার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এত দিন ধরে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে তুমি আমাদের জন্য যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেটিই ছিল আসল...আমরা তোমাকে খুব মিস করব, অধিনায়ক।’