কীভাবে বেছে নেওয়া হয় বালন দ’র বিজয়ী?

ফুটবলে ব্যক্তিগত অর্জনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি কোনটা? বিশ্বকাপ না জিতেও যে ট্রফিটা একজন ফুটবলারকে রাতারাতি ইতিহাসের পাতায় তুলে দেয়, সেটা বালন দ’র। গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের বালন দ’র-এর সেরা ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা। আর আগামী ২৬ অক্টোবর লন্ডনে এক জমকালো অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হবে এ বছরের গোল্ডেন বল বিজয়ীর নাম, জানা যাবে গত এক বছর ফুটবল বিশ্বে কে রাজত্ব করেছেন?

কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ফুটবলের বহুল-আরাধ্য এই 'গোল্ডেন বল' আসলে কীভাবে নির্ধারিত হয়? বছরের সেরা তারকাকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যের ভোটিং মেকানিজমটাই বা কী? বছরের সেরা পারফর্মার ঠিক কারা বাছাই করেন? কোন কোন নিয়ম বা মানদন্ড মেনে বিজয়ী নির্ধারিত হয়? অর্থাৎ, ঠিক কীভাবে-কোন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়, কার হাতে উঠবে বালন দ’র? চলুন সহজ ভাষায় বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক।

এক নজরে ইতিহাস ও বিবর্তন

আজ থেকে সাত দশক আগে, ১৯৫৬ সালে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল আনো এবং জ্যাক ফেরাঁর মাথায় আসে বর্ষসেরা ফুটবলারকে পুরস্কৃত করার ভাবনা। শুরুতে এটি ছিল শুধুই ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য। তাই নাম ছিল 'ইউরোপিয়ান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার'। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এতে আসে বড় বিবর্তন। 

১৯৯৫ সালে ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলারদের জন্য খুলে দেওয়া হয় দরজা। আর ২০০৭ সাল থেকে বালন দ’র হয়ে ওঠে পুরো বিশ্বের পুরস্কার— অর্থাৎ, যেকোনো দেশের, যেকোনো ফুটবলারই হতে পারেন এর বিজয়ী।

২০১০ থেকে ২০১৫— এই ছয় বছর ফিফার ‘বর্ষসেরা পুরস্কার’ ও ফ্রান্স ফুটবলের ‘বালন দ’র’- একসঙ্গে মিলে হয়েছিল ‘ফিফা বালন দ’র’। এরপর আবার আলাদা হয়ে যায় দুই পুরস্কার। আর ২০২২ সাল থেকে বালন দ’রের মূল্যায়নের সময়ও বদলে যায়। আগে যেখানে এক ক্যালেন্ডার ইয়ার বা পঞ্জিকা বর্ষ বিবেচনা করা হতো, সেটার বদলে এখন বিবেচনা করা হয় একটি পূর্ণ ফুটবল মৌসুম।

২০২৬ সালের বালন দ’র: কোন সময়ের পারফরম্যান্স?

এবারের বালন দ’রের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত পারফরম্যান্স। অর্থাৎ, একজন ফুটবলার পুরো মৌসুমে কী করেছেন— গোল, অ্যাসিস্ট, ম্যাচে প্রভাব, দলের সাফল্য— সবই এসেছে হিসাবের মধ্যে। 

এর সঙ্গে আছে আন্তর্জাতিক ফুটবলও। পুরুষদের ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ ও আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের মতো প্রতিযোগিতাও এই সময়ের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ শুধু ক্লাব ফুটবল নয়— দেশের জার্সিতে পারফরম্যান্সও হতে পারে বালন দ’র জয়ের দৌড়ে বড় ফ্যাক্টর।

কীভাবে তৈরি হয় ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা?

এবার আসি মূল প্রক্রিয়ায়। বালন দ’র জিততে হলে প্রথমেই জায়গা করে নিতে হবে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। এই তালিকা তৈরি করে ফরাসী সাময়িকী 'ফ্রান্স ফুটবল' ও সংবাদমাধ্যম লে'কিপের সম্পাদকীয় দলের সদস্যরা, এবং আগের সংস্করণের অন্তত একজন ভোটার, নির্দিষ্ট কিছু সাবেক তারকা ও অ্যাম্বাসেডর। অর্থাৎ, শুরুতেই একজন ফুটবলারের পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে তৈরি হয় ৩০ জনের তালিকা। এরপর শুরু হয় আসল ভোটাভুটি।

কারা দেন ভোট? 

তালিকা তো হলো, এবার ভোট দেবেন কারা? আগে জাতীয় দলের কোচ ও অধিনায়করা ভোট দিতে পারলেও, বর্তমানে ভোটাধিকার রয়েছে শুধুই সাংবাদিকদের হাতে। তবে যেকোনো সাংবাদিক নয়। পুরুষ বালন দ’রের জন্য ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের নির্বাচিত ১ জন করে অভিজ্ঞ ফুটবল সাংবাদিক ভোট দিতে পারেন। আর নারী বালন দ’রের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি শীর্ষ ৫০টি দেশের একজন করে সাংবাদিক।

ভোটিংয়ের পয়েন্ট ও হিসাব-নিকাশ

প্রতিটি দেশের সেই ১ জন সাংবাদিক ৩০ জনের তালিকা থেকে নিজের পছন্দের সেরা ১০ জন ফুটবলারকে বেছে নেন এবং তাদের ১ থেকে ১০ নম্বর ক্রমানুসারে সাজান। আর প্রতিটি অবস্থানের জন্য রয়েছে আলাদা পয়েন্ট।

আর এখানেই শুরু হয় পয়েন্টের খেলা। একজন সাংবাদিকের ভোটে প্রথম হওয়া খেলোয়াড় পান ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় হওয়া খেলোয়াড় ১২ পয়েন্ট, এবং তৃতীয় হওয়া খেলোয়াড় ১০ পয়েন্ট। এভাবে পরের সাতটি স্থানে থাকা খেলোয়াড়রা পাবেন যথাক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ এবং সর্বশেষ ১ পয়েন্ট।

অর্থাৎ, একজন খেলোয়াড় যত বেশি সাংবাদিকের পছন্দের খেলোয়াড়ের তালিকায় উপরের দিকে থাকবেন, তাঁর মোট পয়েন্ট তত বাড়বে। এভাবে ১০০ জন সাংবাদিকের দেওয়া সব পয়েন্ট যোগ করা হবে। যিনি সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পাবেন, তাঁর হাতেই উঠবে বালন দ’র।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি দুজন খেলোয়াড়ের পয়েন্ট সমান হয়ে যায়, তখন কী হবে? সেক্ষেত্রে দেখা হবে, সাংবাদিকের ‘প্রথম পছন্দ হিসেবে কে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। তাতেও যদি টাই বা অমীমাংসিত থাকে, তখন দেখা হয় দ্বিতীয় স্থানের ভোট।

সাংবাদিকদের ভোটিংয়ের মানদণ্ড

তবে সাংবাদিকরা ইচ্ছেমতো ভোট দিতে পারেন না। ফ্রান্স ফুটবল তিনটি মূল মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রথমত, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স এবং ম্যাচে decisive বা নির্ধারকের প্রভাব। অর্থাৎ, একজন ফুটবলার নিজে কেমন খেলেছেন, তার নামের পাশে কতটি গোল-অ্যাসিস্ট আছে, মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তিনি কতটা পার্থক্য গড়ে দিতে পেরেছেন, কিংবা সার্বিকভাবে দলের হয়ে তিনি কতটা প্রভাবশালী ছিলেন- এই বিষয়গুলোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় ভোটিংয়ের ক্ষেত্রে। 

দ্বিতীয়ত, দলের পারফরম্যান্স ও শিরোপা জেতা। একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর দল মৌসুমে কী অর্জন করেছে, সেটিও বিবেচনায় থাকে। চ্যাম্পিয়নস লিগ, ঘরোয়া লিগ, কাপ কিংবা আন্তর্জাতিক শিরোপা- এই সবই এখানে প্রভাব ফেলতে পারে।

আর তৃতীয়ত, ক্লাস ও ফেয়ার প্লে। অর্থাৎ, মাঠে ও মাঠের বাইরে একজন খেলোয়াড়ের আচরণ কেমন ছিল, সেটিও বিবেচনায় রাখা হয় ভোটদানের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, সহজ করে বললে, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এরপর দলের সাফল্য, এবং সবশেষে খেলোয়াড়সুলভ আচরণ ও ফেয়ার প্লে।

অন্যান্য ক্যাটাগরি ও পুরস্কার

বালন দ’র ঘোষণার এই অনুষ্ঠানে গোল্ডেন বলের পাশাপাশি ফুটবলের আরও কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই যেমন, ২১ বছরের কম বয়সী সেরা উদীয়মান ফুটবলারের জন্য কোপা ট্রফি। মৌসুমের সেরা গোলরক্ষকের জন্য থাকে ইয়াসিন ট্রফি। বর্ষসেরা পুরুষ ও নারী কোচেদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি। এছাড়া আরও কিছু ট্রফিসহ দেওয়া হয় বর্ষসেরা ক্লাবের পুরস্কার।

ব্যালেন্স, বিতর্ক কিংবা নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে এভাবেই নির্ধারিত হয় ফুটবলের সবচেয়ে সম্মানজনক ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিগত অ্যাওয়ার্ড। আর এবারের বালন দ’র পুরস্কার দেওয়া হবে আগামী ২৬ অক্টোবর। লন্ডনের সেই জমকালো অনুষ্ঠানে জানা যাবে, কাঙ্ক্ষিত এই সোনার বল কার হাতে উঠতে যাচ্ছে।