রম্য রচনা

কিউরিয়াস মাইন্ডের জ্ঞানপিপাসা যেভাবে মেটে

এই পৃথিবীতে শত শত কোটি মানুষ। তার মধ্যে ১৬/১৭ কোটি এ দেশে জায়গা নিয়েছে। তবে জানার ইচ্ছা বা আগ্রহ – অন্য অনেক জাতির তুলনায় আমাদের কিঞ্চিৎ বেশি। পরিমাণ বোঝাতে কিঞ্চিৎ শব্দটির ব্যবহার কিছুটা অকিঞ্চিৎকর হয়ে গেল কিনা, সেটি অবশ্য বড় প্রশ্ন। তবে মনে রাখতে হবে, যে কোনো প্রশ্নই কিন্তু জ্ঞানের পথে আমাদের এগিয়ে নেয়। সেটি যেমন আপনাকে যে কোনো ঘটনায় ব্যক্তিগত বিষয়ে অবিরত জিজ্ঞেস করে যাওয়া বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য একবার কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইনে অর্ডার করার পর, বার বার টাইমে-বেটাইমে সেই প্রতিষ্ঠানের সেলসম্যানের জিজ্ঞাসিত – ‘কেমন আছেন, স্যার/ম্যাডাম? – এর ক্ষেত্রেও!

বাঙালিরা নিজেদের অতিথিবৎসল ভাবতে ভালোবাসে। বিশেষ করে এই বঙ্গের বাঙালিরা একদিকে যেমন অতিথিকে ঠেসে খাওয়াতে চায়, তেমনি খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে ঠেস মারতেও ছাড়ে না। নিজেই একবার মনে করে দেখুন তো! কোথাও হয়তো অতিথি হয়ে গেছেন। মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন হলে নিশ্চিতভাবেই আপনাকে ভাল-মন্দ খাওয়াবে। কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে অস্বস্তিও গুঁজে দেবে কানে। যদিও কিঞ্চিৎ নিকটবর্তী আত্মীয় বা বন্ধু হয়, এবং আপনি বেকার হন, তবে দেখবেন কিছু কথার পরই আপনার অবস্থা নিয়ে প্রশ্নবাণ আসা শুরু হয়ে গেছে। কবে চাকরি বা ব্যবসা করবেন – এ নিয়ে দেখবেন আপনার চেয়ে ওই কিঞ্চিৎ নিকটবর্তী মানুষগুলোরই দুশ্চিন্তা বেশি! আর যদি আপনি বেকার নন, কিন্তু অবিবাহিত হয়ে থাকেন - তবে সেখানে ঘটক পাখি ভাই ও বোনেরা এসে হাজির হবে। তারা এমনভাবে আপনার জন্য পাত্র বা পাত্রী খুঁজতে শুরু করবে, যেন মনে হবে কেবলই আপনি বিয়ে করেননি বলে তাদের রাতে ঘুম হচ্ছে না। আর যদি বিবাহিত, কিন্তু আপনার সন্তান এখনও না হয়ে থাকে - তবে দেখবেন কেন সন্তান নিচ্ছেন না, তার প্রাণিবিজ্ঞানজনিত কারণ অনুসন্ধানেও ফেলুদার সেইসব ভাই-বোনেরা কত তৎপর!

কেন আপনার উদ্যোগ কম? কেন হচ্ছে না? কেন হবে না? – এই তিন ধরনের প্রশ্ন ওপরের তিন অবস্থাতেই সমভাবে কার্যকর। এসব প্রশ্ন ধেয়ে আসবে আপনার দিকে পাখির ছোঁড়া সেই ঈষৎ তরল এবং সাদা-কালোর পূর্ণ মিশ্রণের মতো করে। পাখি যেমন ওপর থেকে ছাড়ে, কিন্তু আপনার মাথার ওপরে চোখ নেই বিধায় আপনি শিকার হয়েই যান – ঠিক তেমনই এমন সব কথাকে উপলক্ষ করে আপনার প্রতি এসব প্রশ্নের তির ছুড়ে মারা হবে যে, আপনি ওসব কথা বলার জন্য কেবলই আফসোস করে যাবেন। টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার করার বৃথা চেষ্টা করে যাবেন তখন ঠিকই, কিন্তু ধোয়া ছাড়া (মতান্তরে ওখান থেকে পাততাড়ি গোটানো ব্যতিরেকে) নিস্তার মিলবে না।

এসব ক্ষেত্রেই বোঝা যায়, এই দেশের মানুষের জ্ঞানপিপাসা কতটা গভীর। খুব বৈচিত্র্যময় কিউরিয়াস মাইন্ড না থাকলে অবশ্য এতটা গভীরতা অর্জন করা যায় না। এমন জ্ঞানপিপাসা আরও নানা ধরনের আছে। যেমন: হয়তো কোনো সুপারশপে গেলেন, ওখানে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পরই দেখবেন, শপসংশ্লিষ্ট কেউ না কেউ এসে আপনাকে জিজ্ঞেস করে বসবে – ‘আপনার কিছু লাগবে?’ তা কিছু না্-ই যদি লাগে, তবে কি আর আপনি সেখানে বেড়াতে গিয়েছেন?

এর বাইরে যদি অনলাইনে কোথাও অর্ডার দিয়ে থাকেন, তবে তো কথাই নেই। কিছুদিন পর পরই সেখান থেকে ফোনে বা মেসেজে আসতে থাকবে বার্তা – ‘কিছু কি লাগছে?’ আসতে পারে সবচেয়ে দুর্লভ রেটে (৯৯ বা ৮৯ টাকায়) এক ডজন ডিম পাওয়ার অভিনব অফারও। কথা হলো, কিছু লাগলে তো বলা হয়ই। না লাগলেও জোর করে লাগানোর অনুভূতি জন্মানোর এই বিরক্তিকর চেষ্টা তবে কেন?

এক্ষেত্রে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। একদিন ভর দুপুরে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। পেশার কারণেই এখন চেনা-অচেনা – সব নম্বর থেকেই আসা ফোন ধরার অভ্যাস হয় গেছে। ফোন এলেই মনে হয় প্রয়োজনীয় কিছু। ডিজুসের সারা রাত কথা বলার ওই চল বা বয়স – সবই বেনো জলে ভেসে গেছে কিনা! কিন্তু ফোন ধরতেই একজন অত্যন্ত কোমল কন্ঠে কিছু কথা বলার অনুমতি চাইলেন। আমি পরিচয় জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন একটি গ্রোসারি কোম্পানি থেকে বলছেন। আমি তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিলাম, কিচ্ছুটি লাগবে না। তারপরও তিনি কিছু তথ্য জানাতে চাইলেন। এ দেশের ব্যবসার চল বুঝি বলেই বলতে দিলাম। সব জানিয়ে তিনি ফের জিজ্ঞেস করলেন, ‘দুধ-ডিম-মাংস কি লাগবে?’ বুঝুন এবার! তবে আর শুরুতেই জানিয়ে কি লাভ হলো?

অথবা অফিসে হয়তো ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে উর্ধ্বতনের কাছে পাওনা ছুটি চাইলেন কদিনের। সব অফিসেই তো কিছু দিনের ছুটি পাওনা বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু আবেদনের কিছুক্ষণ পরই হয়তো বস ডেকে শুধাবেন, ‘ছুটি কেন দরকার?’ আরে বাবা, লিখেই তো দেওয়া হলো – ব্যক্তিগত কারণ। এরপর যদি সেই কারণ অফিসের বসের কাছে সবিস্তারে জানাতেই হয়, তবে আর সেটা কতটা ব্যক্তিগত থাকল, বলুন?

আমাদের জ্ঞানপিপাসার গভীরতার প্রমাণ আরও অনেক কিছুতেই মেলে। এই যেমন ধরুন, ছোট পরিবার নিয়েও কিছুটা বড় ফ্ল্যাট ভাড়া করতে গেলেন। বাড়িওয়ালাও তখন জিজ্ঞেস করে বসবে, ‘আপনার জন্য এই ফ্ল্যাট কি বড় হয়ে যাবে না? দরকার হবে? কেন?’ আহা রে, কী মায়া! মনে হবে যে, ‘না’ উচ্চারণ করলে বা কারণ দর্শালে হয়তো তিনি ছোট আকারের ফ্ল্যাট নগদে বানিয়ে চাবি হাতে তুলে দেবেন এই মুহূর্তে!

জ্ঞানের প্রতি এমন আকাঙ্ক্ষা বা পিপাসার্ত বোধ করার বিষয়টি অবশ্য আমরা সব জায়গায় দেখাই না। ধরুন, কেউ এই মহানগরীর বিশাল রাস্তার ফুটপাতের এক কোণায় দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে হাইরাইজের ফাঁক গলে দেখা দেওয়া সরু আকাশটার দিকে। তার চোখে হয়তো সারা জীবনের কান্না এসে জড়ো হয়েছে। আমরা কি জিজ্ঞেস করি কখনো – ‘কী হয়েছে?’ শুধাই না কখনোই। এমনকি কাউকে রাস্তায় অসহায় হতে দেখলেও কয়জনেই বা আগাই বলুন? বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমাদের বয়ে নিয়ে চলা রিকশাওয়ালাকেই কজনেই বা জিজ্ঞেস করি, ছাতাটা লাগবে কিনা? কিংবা শীতের রাতে গরম পোশাক গায়ে চাপিয়ে জবুথবু হয়ে বাড়ি ফেরার সময় আমরা কজনেই বা রিক্ত হস্তের অন্য মানুষদের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, শীত বেশি করছে কিনা?

প্রতীকী ছবিঅবশ্য গসিপের উপলক্ষে বা অন্যের জীবনের সিসিটিভি ক্যামেরা হওয়ার সুযোগ পেলে আমাদের জ্ঞানপিপাসার তল পাওয়া কঠিন। কাউকে বিরক্ত করাতেও আমাদের জুড়ি মেলা ভার। আমরা উল্টো বিরক্ত মানুষটিকেই বলি - ‘ভালোর জন্যই তো জানতে চাইলাম, তাই না!’

অতএব, এটি বলাই যায় যে, এ দেশের বাঙালিদের জ্ঞানপিপাসা বেশ ভিন্ন মাত্রার। আমরা জ্ঞানপিপাসু বটে, তবে সেই জ্ঞানের ক্ষেত্রের গভীরতা ঠিক ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি বা সাহিত্য-দর্শন দিয়ে মাপা যাবে না। আমরা যে বড্ড অন্যের জীবনমুখী! তবে সেই মুখাপেক্ষিতা অন্যের জীবনের নিমিত্তে নয়, বরং নিজের জীবনের সমুদ্রসম সময় কাটানোর ‘গরম মশলা’র অনুসন্ধান। সেদিক থেকে আমাদের তাই আক্ষরিক অর্থেই পরজীবী বলা যায়!

যা-ই হোক, কিছু দিকে তো আমাদের কৌতুহল আছে। আকালের দিনে এই বা কম কীসে! চলুন তবে, জ্ঞানপিপাসা মেটানোয় ব্রতী হওয়া যাক। একবার ভিড়ে মিশে গেলেই দেখবেন আর বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে না। কারণ এক শেয়াল হুক্কা হুয়া করলেই তো চারপাশ থেকে প্রশ্ন আসবে - ক্যায়া হুয়া, ক্যায়া হুয়া!

চলুন তবে, শেয়াল হওয়াতেই প্রাণপাত করা যাক। নচিকেতার গান মেনে বললে, ওটাই আমাদের অ্যাম্বিশান কিনা!