ফোন ধরতেই এই প্রশ্ন। ভালো আছি, নাকি খারাপ আছি—কিছুই জানতে চাইলেন না কলদাতা। বুঝলাম, কাজের আলাপ আগে! বিদেশি তো, কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না হয়তো!
মনে মনে এমনটা বুঝে নিয়েছিলাম ঠিকই। কি আর করার, বোকা মন! মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল নিমেষে। আগেই কানে–মুখে শুনেছিলাম, এভাবেই নাকি চাকরি আসে যোগ্যদের কাছে। তবে এমন সরাসরি ফোন করে যে আসে, তা কল্পনা করিনি। কোনো কুশল জিজ্ঞাসা নেই, শরীর–মনের খবর নেওয়া নেই, স্রেফ—‘ক্যান ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড ইংলিশ?’
উচ্চারণ ঠিক বাঙালিদের মতো ছিল না। তবে প্রশ্নটা করেই উত্তর পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। ভেতো বাঙালি হওয়ায় এবং বাংলা মিডিয়ামে পড়ে ইংরেজি শেখা এই অধম আবার উত্তর দিতে গিয়ে আটকে যাচ্ছিল বার বার। আটপৌরে মধ্যবিত্ত যেমন হয় আর কি। পথে পড়ে থাকা টাকাও তুলে নিয়ে পকেটে ভরতে পারে না নির্দ্বিধায়। চারপাশে ফেরি করে বরং শুধায়—‘আপনার টাকা? আপনার টাকা?’
তাই মুখ ফুটে বেরিয়ে গেল—‘নো’! আর তাতেই হলো সর্বনাশ, বিদায় নিল জীবনের পৌষ মাস। প্রশ্নটা বুঝেই যে উত্তরটা দেওয়া হয়েছিল আত্মবিশ্বাসের অভাবে, সেটি না বুঝেই কলদাতা খট করে কল কেটে দিল!
পরে জানা গেল, সবই দেশি সংস্করণের বিদেশি! তাই হয়তো হাতে সময় ছিল না। যতই বিদেশি মোড়কে দেশি জিনিস মোড়ানো হোক না কেন, জিনিসের প্রকৃতি তো দেশিই থাকে। আর আমাদের তো ‘বড়োই তাড়াহুড়া’, ধান্দা দেখলে আর মাথার ঠিক থাকে না!
এখানে বলে রাখা ভালো ইংরেজি ইন্দো–ইউরোপীয় গোত্রের একটি ভাষা। মূলত ইংল্যান্ডে এই ভাষার জন্ম। ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো বিশ্বেই এর বাজার বেশ। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ইংরেজি অন্যতম প্রধান ভাষা। তবে ভিন্ন ভিন্ন দেশ অনুযায়ী এর সংস্করণ ভিন্ন। আর বাংলাদেশে এটি মর্যাদার সমার্থক। ইংরেজি বলতে পারলেন, তো কেল্লা ফতে। কী বলছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, সেটা ইংরেজিতে বলছেন কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
তো এমন একটি ভাষা বুঝলেই বা ইংলিশে টক করতে পারলেই এখন বাংলাদেশে চাকরি মিলছে হরেদরে বা মোবাইল ফোনে। চাকরি মিললেও টাকা মিলছে, নাকি হাপিস হচ্ছে—তা নিশ্চয়ই আপনারা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন। তবে এর মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের নেটিভ ইংরেজিভাষীরা এখন নাকি আতঙ্কে আছেন! নিজে কল পাওয়ার পর এ নিয়ে খোঁজ–খবর নিতে গিয়ে অখ্যাত ও পুরোপুরি অনির্ভরশীল একটি সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভয়ে আছে ইংরেজি ভাষার জন্মভূমি ইংল্যান্ডের মানুষেরা। সেই সঙ্গে শঙ্কায় নাকি আছে আমেরিকার জনগণও। ইয়েস–নো–ভেরি গুড বললেই বাংলাদেশে মিলছে চাকরি—এমন গুজব শুনে ক্ষণে ক্ষণে আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠছে ব্রিটিশ–আমেরিকানরা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঠিকঠাক মতো সংগঠিত হওয়ার আগেই নাকি চাকরির বাজার হারিয়ে ফেলার ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে তারা!
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ ও আমেরিকান ইংরেজিতে যা বলেছেন, তার বাংলা অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায়, সেটি এখন আপনাদের জানানোর চেষ্টা করা যাক। তারা বলেছেন, ‘আমরা শুনেছি, বাংলাদেশে ইংরেজি বললেই নাকি চাকরি মিলছে চিঁড়া–মুড়ির মতো। আমরা ছোটবেলা থেকে ইংরেজি বলে আসছি। অথচ এসব চাকরি আমাদের কাছে আসছে না, চলে যাচ্ছে বাংলাদেশে। এদিকে এ কারণে আমাদের এখানে অর্থনীতি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। আমাদের চাকরির বাজার সংকোচিত হচ্ছে। এতে করে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর এক ধরনের অনাস্থা ও আত্মবিশ্বাসহীনতাও সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা তবে কি খেয়ে বাঁচব?’
ওই অশরীরী সূত্র মারফত ব্রিটিশ–আমেরিকানদের কিছু আকুতিও এ দেশে এসে পৌঁছেছে। যদিও এ বিষয়টি কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। ব্রিটিশ–আমেরিকানরা নাকি এই ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘দয়া করে আমাদের পেটে লাথি মারবেন না। বাংলাদেশি ভাই–বোনেরা, প্লিজ এসব চাকরি করবেন না। এতে করে একজন নেটিভ ইংরেজিভাষী চাকরি হারাবে, বেকার হয়ে পড়তে হবে তাকে। আপনারা বাংলাতেই স্থির থাকুন।’
‘ক্যান ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড ইংলিশ’—এই প্রশ্নের জবাবে ‘নো’ বলার শর্ত দিয়ে ব্রিটিশ–আমেরিকানরা অবশ্য আরেকটি লোভনীয় অফারও দিয়েছে। তারা বলেছে, যেহেতু বাংলাদেশিদের কাছেই এসব চাকরির অফার বেশি আসছে, সেক্ষেত্রে তাদের যে এক ধরনের দক্ষতা আছে, সেটি নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ইংরেজি শিখতে চলে আসতে পারে ব্রিটিশ–আমেরিকানরা। যদি এ ধরনের অনলাইন কোর্স চালু করা হয়, তবে বেশি সুবিধা হবে বলে মতামত তাদের!
বুঝতেই পারছেন, ঘটনা কতদূর গড়িয়েছে! এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা আপনাদের। তবে যাই করবেন, নিজ দায়িত্বে করবেন। মনে রাখবেন, একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না।