গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদ পালন হয়। এ বছরও হলো। এ নিয়ে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা অবশ্য ঝিমিয়ে পড়েছে ঈদের পরই।
ঝিমিয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিই বটে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে যে এখন দেশজুড়ে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। গরমের এমনই তীব্রতা যে রাস্তায় নামলে রিকশা না খুঁজে যদি উটের খোঁজ কেউ করেও বসেন, খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না।
দুনিয়াটাই আসলে উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। বেশ ধুমধাম করে বৈশাখ পালন হলো। কোথায় কালবৈশাখি ঝড় হবে—তা নয়, রোদের তেজে জ্বলে যাচ্ছি সবাই। বাংলাদেশে সবাই ঘেমেনেয়ে একাকার, ওদিকে দুবাই কিনা আমাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বান ডেকে এনেছে! মেঘের সঙ্গে কারসাজি করতে গিয়ে ডুবতে বসেছিল বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মরুর দেশগুলো। আর এদিকে যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আমরা উত্তপ্ত হচ্ছি।
এই অবস্থায় গত শীতে যাদের মন গ্রীষ্মের জন্য আইঢাই করে উঠছিল, তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে ফেসবুকে। তাদের ‘গ্রীষ্মপ্রেমী’ বলে ডাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এমন গ্রীষ্মপ্রেমীদের জন্য নানারকম ডিসকাউন্ট দেওয়ার ঘোষণাও আসছে।
যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে প্রকৃতিই দিন দিন দেশকে মধ্যপ্রাচ্য করে তুলতে চাইছে। এতে অবশ্য দোষের কিছু নেই। মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসী জীবন দেখে যে কারও সে শখ হতে পারে। তাপমাত্রা নিয়মিত চল্লিশ ডিগ্রি ছাড়াবে, ধীরে ধীরে সবুজ গায়েব হবে, দেশের এদিক-ওদিক মরু উঁকি দেবে!
এর মধ্যেও কিছু মানুষ অতীতকে আঁকড়ে ধরতে চান। তারা এখনো এই গরমে চা–কফি খেতে ডাকেন। ভরদুপুরের সূর্যকে পাত্তা না দিয়ে উত্তপ্ত ক্যাফেইন শরীরে নেওয়ার আহবান জানান। কোথায় এই গরমকে সম্মান দেখিয়ে শরবত চেখে দেখার প্রস্তাব দেবে, তা নয়; তারা কিনা ডাকে চায়ে চুমুক দিতে!
এমন বিপথগামীদের থেকে দূরে থাকতেই হবে। নিজ হাতে যারা নিজেদের উন্নতি আটকাতে চায়, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করুন। কোথায় দুবাইয়ের জীবনের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস করবে, তা না! উল্টো এখনো ঔপনিবেশিক আমলে শাসকদের শিখিয়ে দেওয়া অভ্যাস ধরে রেখে সময়–অসময়ে কাপে চুমুক দিতে আহ্বান জানানো রীতিমতো দুঃসাহসের শামিল!
অনেকে তো আরও এক ধাপ এগিয়ে আছেন। দেশকে সেই ভুলেভরা সময়ে ফেরাতে চান তাঁরা। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডাক দিচ্ছেন গাছ লাগিয়ে সব ভরিয়ে ফেলার। আরে সভ্যতার জন্ম হয়েছে আগুন লাগিয়ে। আর সে আগুনটা ঠিকমতো জিইয়ে রেখেছে কীভাবে? গাছ কেটেই তো! এই যে সুযোগ পেলেই অট্টালিকা তুলতে, ফ্যাক্টরি বসাতে বা রাস্তা বানানোর প্রস্তাব তুলতে না তুলতে গাছ সাফ করে দেওয়া হয়, তা কি আর এমনি এমনি? দেশকে মরুর ভূমি বানাতে হবে তো। তাপমাত্রা কমিয়ে, সবুজ ছড়িয়ে কে কবে কী করতে পেরেছে? বেশি ঠান্ডা হতে গিয়ে ডাইনোসর পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে গেল, আর মানুষ কোন ছার!
তাই লাইনে আসুন। পুরোনো অভ্যাস ছাড়ুন। কেউ এই গরমে চা–কফি খেয়ে গা জুড়াতে বললে তাদের ভুল ধরিয়ে দিন। কাজ না হলে কষে ধমক দিন, তাদের এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, এরা আপনার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিতে চায়। ভুলেও এদের ফাঁদে পা দেবেন না!