রম্য রচনা

মাঠ বড়, বল ভারি, ব্যাটের কাঠ খারাপ—চার/ছক্কা মারব কীভাবে?

এবারের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসরে প্রথম ম্যাচটি খেলে ফেলেছে বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল। যদিও এটি ছিল প্রস্তুতিমূলক বা ওয়ার্ম–আপ ম্যাচ, তবে আসরের প্রথম ম্যাচ এটিই। এতে আইপিএলের আয়োজক দেশ ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলার বাঘেরা। সেই ম্যাচে প্রবল পরাক্রমে হেরে গেছেন শান্ত–লিটনরা। টি–টোয়েন্টিতে ৬০ রানের বেশি ব্যবধানে হারলে তা বড় ব্যবধান বলেই মেনে নেওয়া হয়।

এই ম্যাচের পরপরই সরস টিমের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের সঙ্গে প্ল্যানচেট ও টেলিপ্যাথির তার ও ইন্টারনেটবিহীন যুগল প্রযুক্তির মাধ্যমে কথা বলা হয়। নেওয়া হয় তার একটি কল্পিত ও আষাড়ে সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারের সকল প্রশ্ন ও উত্তরকে এক শব্দে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দেওয়াই যায়। তারপরও পাঠকদের তীব্র জ্ঞানপিপাসা মেটাতে আমরা সেই ‘অসমাপ্ত’ সাক্ষাৎকার পুরোপুরি তুলে ধরছি।

প্রথম প্রশ্ন: ফার্স্ট ম্যাচ, ইয়োর পারফর্ম, হোয়্যাট হ্যাপেনিং?

উত্তর: ভেরি ভেরি মাচ হ্যাপেনিং। আসলে অনেক হ্যাপেনিং। ক্রিকেট খেলাটার ইংরেজি নামের অর্থ যতই ‘ঝিঁঝিঁ পোকা’ হোক, আসলে প্রথম ম্যাচটা আমরা ফ্লাড লাইটের আলোতে খেলিনি। সূর্যের আলোয় খেলা হয়েছে। সবকিছুই ফিলিপস বাত্তির মতো স্পষ্ট ছিল। তবে যখন প্রথমে আমরা বোলিং করলাম, তখন বোলার ছাড়া আর সবার বল দেখতে একটু সমস্যা হয়েছে। কেউ ক্যাচ ছেড়েছে। আবার যখন ব্যাটিং করেছি, তখন বোধহয় বলে ভ্যানিশিং ক্রিম লাগানো হয়েছিল। ফলে বল দেখতে ব্যাটারদের অনেক সমস্যা হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করেছি। ব্যাট হাতে ব্যাটিং করার চেষ্টা করেছি, বল হাতে বোলিং করার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছি ব্যাটের সাথে বলের সংযোগ ঘটাতে। বল করার সময় উইকেট টু উইকেট লাইন–লেংথ বজায় রেখে বল করতে চেয়েছি। হয়তো বল তারপরও অফ বা লেগ স্টাম্পের এক বা তিন হাত দূর দিয়ে গেছে। তবে আমরা চার–ছয় খেয়েও চেষ্টা বন্ধ রাখিনি। চেষ্টা করে গেছি। চার–ছয় তো খেতেই পারি। একটা কথা বলে দিই, আমরা স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে খেলি না। সেখানে যে অবস্থাই থাকুক, আমাদের সাহস কমে না। সেটা ব্যাটিং ও বোলিং—দুই ক্ষেত্রেই।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: মানে, ইয়োর পারফর্ম, হোয়্যাট হ্যাপেনিং?

উত্তর: আমার মনে হয় আমি উত্তর দিয়েছি। আপনারা হয় বুঝতে পারছেন না, না হয় বেশি বুঝছেন। দেখুন, বড় মানুষেরা বলে গেছেন—‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট।’ আমি মনে করি, যিনিই এই কথা বলেছেন, তিনি আমাদের কথা ভেবেই বলেছেন। তাই আমরা ক্লাস ধরে রাখার চেষ্টা করে গেছি। ফর্ম তো ছোটখাটো বিষয়, আসবে যাবে। মনে রাখতে হবে, এই দুনিয়াটা ‘পিত্তলদি’। ছোট বিষয় নিয়ে না ভেবে, বড় নিয়ে ভাবাই ভালো। হয়তো আমি ছক্কা মারতে গিয়ে মিডফিল্ডেই ক্যাচ তুলে দিলাম, আউট হয়ে গেলাম। কিন্তু আউট হওয়াটা বড় কথা নয়। এই দুনিয়ায় অনেকেই অসময়ে আউট হয়ে যায়। আমাদেরও হতে পারে। কিন্তু ওই যে ছক্কা মারার জন্য ব্যাটটা চালালাম, সেটাই বড়।

তৃতীয় প্রশ্ন: ইনসুইং বা আউটসুইং—কোন বলে আমাদের ব্যাটারদের সমস্যা হচ্ছে?

উত্তর: ইন, আউট—কোনো ব্যাপার না। ইনসুইং হলে আমরা বোল্ড হয়ে দেখিয়ে দিতে পারব। আউটসুইং হলে স্রেফ বলে চোখ না রেখেই শ্যাডো প্র্যাকটিস করার মতো ব্যাট চালিয়ে স্লিপে ক্যাচ তুলে দিতে পারব। প্রয়োজনে ইয়র্কারে কাট করার দক্ষতাও আমরা একটু কষ্ট করলে আপনাদের দেখাতে পারব। সুতরাং কোনোটাই আসলে আমাদের ভোগাতে পারবে না। আমরা পারফর্ম করেই যাব, সেটা যেমনই হোক।

চতুর্থ প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলের বোলিংয়ের সময় ব্যাট চালিয়ে ভালোই স্কোর করে ফেলল ভারতীয়রা। ওভারে প্রায় ৯ রানের বেশি নিয়ে ফেলল। কিন্তু আমরা প্রথম কয়েক ওভারে যেন বলে ব্যাট লাগাতেই পারছিলাম না! কেন?

উত্তর: আপনারা যে আসলেই বেশি বেশি বোঝেন, এই প্রশ্নটিই তার একটি ভালো উদাহরণ। যেখানে ওভারে বৈধ বল হয় মাত্র ৬টা, সেখানে ৯ রান করে নেওয়ার তো কোনো মানেই হয় না! আমরা কিন্তু নিয়ম মেনে খেলি। খেয়াল করলে দেখবেন, আমরা ছয়ের মতো করেই নিয়েছি। একটু বেশি ছিল অবশ্য। সেটা মেনে নেওয়া যায়। ওইটা পুকুর চুরি। কিন্তু সাগর চুরি করার কোনো অর্থ নেই। আমরা মানকাডিং করি না। করলেও আবার ডেকে এনে গায়ে–মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাট করাই। তার জন্য আমরা ম্যাচও হেরে যেতে পারি। কিন্তু বিবেক বিসর্জন দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমরা ছোটবেলা থেকে ট্রাক–রিকশার পেছনে পড়েছি যে, ‘বিবেক মানুষের সবচেয়ে বড় আদালত’! এই ঐতিহ্য ও শিক্ষা আমরা ভুলে যেতে পারি না। তাছাড়া আরও অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এর পেছনে আছে।

নাসাউ কাউন্টি ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ছবি: সংগৃহীতপঞ্চম প্রশ্ন: কেমন ষড়যন্ত্র?

উত্তর: দেখুন, আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি যে, ভারত ব্যাটিং করার সময় মাঠের বাউন্ডারি ছোট ছিল। বাংলাদেশ ব্যাটিং করার সময় সেটি বড় করে ফেলা হয় বলে আমাদের বিশ্বাস। তাছাড়া বলও অনেক ভারী ছিল। পেটালেও আকাশে উঠছিল না। এর ওপর আমাদের ব্যাটের কাঠ কিছুটা খারাপ ছিল মনে হয়। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, খেলার শুরুর দিকে বলে ব্যাট না লাগলে বা ঠিকমতো না লাগলে আমরা বারবার ব্যাটের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আসলে বোধহয় ব্যাটেই সমস্যা ছিল। ভারতীয়রা নিশ্চয়ই লোহার ব্যাট দিয়ে খেলেছে। সেগুলোর ময়নাতদন্ত করা হোক, ফরেনসিক টেস্ট হোক—সত্য বেরিয়ে আসবেই। আপনারা আমাদের ব্যাটিং নিয়ে যে দুর্নাম করছেন, বলেন আপনারা—মাঠ বড়, বল ভারী, ব্যাটের কাঠ খারাপ—চার/ছক্কা মারব কীভাবে? পারলে করে দেখান!

ষষ্ঠ প্রশ্ন: কী করলে দল আরও ভালো নৈপুণ্য দেখাতে পারবে?

উত্তর: এক কথায় বললে, দোয়া দরকার। একমাত্র দোয়াই আমাদের বাঁচাতে পারে। দেশের মানুষেরা দোয়া করতে পারে। আমাদের এত এত মানুষ, তারা কি বেশি করে দোয়া করতে পারে না? এটি আমাদের সদিচ্ছার অভাব বলে মনে করি। আমাদের ক্লাস তো এমনিতেই পারমানেন্ট। দোয়া বেশি করে করলে টেম্পোরারি হিসেবে ফর্মও ঠিক হয়ে যাবে। দোয়াই একমাত্র ভরসা। আমাদের খেলোয়াড়ি নৈপুণ্য ভালো না লাগলে বুঝতে হবে যে, দর্শকদের দোয়ায় ঘাটতি। সমস্যা আসলে দর্শকদেরই।

সপ্তম প্রশ্ন: ভারতের সাথে ম্যাচে শেষ ওভারে ৬ বলে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৬৬ রান। ওই সময়ে পরিকল্পনা কী ছিল?

উত্তর: আমরা প্রতি বলে ১১ মারার প্ল্যান করেছিলাম! …

বিশেষ নোট: সপ্তম প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরপরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আর কথা বলা যায়নি। এই অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারটিই পাঠকদের তীব্র জ্ঞানপিপাসা মেটাতে তুলে ধরা হয়েছে।

[সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: দয়া করে, এই সাক্ষাৎকারের একটি শব্দও বিশ্বাস করবেন না। কেউ বিশ্বাস করে নিলে, সেটি কেবলই তার বোধবুদ্ধির অভাব এবং তা একটি কাকতালীয় ঘটনা বলে বিবেচিত হবে। মনে রাখবেন, আপনার মস্তিষ্কের উর্বরতা বৃদ্ধির দায়িত্ব অন্য কেউ নেবে না!]