আপনার পকেটে আর কত টাকা থাকে? মাসের শুরুতে কিংবা সপ্তাহের শুরুতে বাজেট করতে গিয়ে খাতায় আর কত বড় অঙ্ক লিখতে পারেন? কারও ক্ষেত্রে হাজার তো কারও ক্ষেত্রে লাখ—এই তো! কী? কারও কারও তো কোটিও হতে পারে—এটাই ভাবছেন তো? ধ্যাৎ, সে তো শতকোটিও হতে পারে। কোথায় গুলশান, আর কই গাবতলি! কথা হচ্ছে আপনাকে নিয়ে, মানে আমাদের নিয়ে, যাদের বাজারে গেলে অত্যধিক গরম ও ঠান্ডা একসাথেই লাগে। একদিকে দাম শুনে মাথার চাঁদি গরম হয়ে যায়, আরেক দিকে রক্ত যায় হিম হয়ে। একেবারে নাতিশীতোষ্ণ দশা আরকি।
তো সেই আপনি যদি লাখ কোটি টাকার বাজেটের গল্প শোনেন, তবে আপনার শরীরে একটা ঝাঁকুনি লাগতেই পারে। একটা আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেতে পারে শরীরের নানা কুঠুরিতে। আর আনন্দ এমন এক জিনিস, যা ভাগ করে নিতে ইচ্ছা হতে পারে আপনার। ফলে আপনি চাইতেই পারেন যে, একটা বেশ জমায়েত করে আনন্দের কথা বলতে। কিংবা একটা ঢাকঢোল পিটিয়ে মিছিল–টিছিল করতে। এটা দোষের কিছু না। বরং সামষ্টিক দৃষ্টিতে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজের প্রতিফলন বলা যায় একে।
তো ঠিক এ কাজটিই করেছেন এ দেশের কিছু লোক। বাজেটকে স্বাগত জানাতে তাঁরা আনন্দ মিছিল বের করেছিলেন। মুশকিল হলো, তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার সময় পাননি। আবেগের ঢেউ প্রতিটি রক্তকণিকাকে এমনভাবে জাগিয়ে তুলেছিল যে, তাঁদের পক্ষে তাৎক্ষণিক স্লোগান ও অট্টহাসিসহকারে মিছিলে নামা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন আরও কিছু লোক আনন্দ মিছিল করছে। তাও কিনা বাজেট নিয়ে!
আনন্দেও ভাগ বসানো? এ কেমন কথা। ফলে তাঁরা হালকা মারামারি বাবদ হাত মকশো করে নিয়েছেন।
এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাজেটকে স্বাগত জানাতে গিয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টার সময় উপজেলার বন্দর সেন্টার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষে দুই পক্ষের পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কী কাণ্ড ভাবুন! আনন্দ মিছিলে কিনা কাঁদানে গ্যাস, ফাঁকা গুলি! তা আইন–শৃঙ্খলার লোকেরা এত কাঠখোট্টা কেন? তারা আরেকটু অপেক্ষা করলে কী হতো! আনন্দের আতিশয্যে মিছিলকারীরা এমনিতেই তো কেঁদে ফেলত। তার জন্য অহেতুক কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ার কী দরকার ছিল? শুধু শুধু অপব্যয়। নাকি উৎসবস্থলে ড্রাই আইসের ধোঁয়ার কাজটি সারা হয়েছে কাঁদানে গ্যাস দিয়ে। তবে ফাঁকা গুলি ঠিক আছে। এমনিতেই বাজি–পটকার ওপর শুল্ক বসেছে। ফলে বাড়তি খরচা না করে মুফতে বাজি ফোটানোর মতো করে ফাঁকা গুলি ফোটানো—খারাপ না। তাহলে কি পুলিশও এই আনন্দের ভাগীদার হয়েছে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে? তা না হলে বাজেটানন্দে সংঘর্ষ করা এক পক্ষ কেন বলবে এমন সংঘর্ষের পেছনে চট্টগ্রামের কর্ণফুলি থানার ওসির সংযোগ আছে! সে যাক—এসব তাদের ব্যাপার। আমরা বরং আনন্দ নিয়ে থাকি।
বাজেট নিয়ে এই আনন্দ মিছিল এবং তা থেকে হওয়া সংঘর্ষ নিয়ে মন্দ লোক নানা কথা বলতে পারে। কতজন তো বাজেট নিয়েও বলছে। সেসবে কান না দিয়ে বরং কৌশলে মন দিন।
বুঝলেন না তো? বাজেটে বিনোদন, খাঁটি বাংলায় অ্যামিউজমেন্টের খরচা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মানে কৃচ্ছ্রসাধন আরকি। তো এই বাজেট দেখে বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রীর অনুসারীদের শরীরে সৃষ্ট আনন্দ হিল্লোল এবং তা থেকে করা আনন্দ মিছিলের কর্মসূচির ঘোষণা তো একটি বেশ সংকট তৈরি করে।
আনন্দ এমন এক বস্তু, যা শরীরে আটকে রাখা কঠিন। অসুখ হতে পারে। ফলে বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রীর অনুসারীরা ঘোষণামতো আনন্দ মিছিলের কর্মসূচি পালন করেছেন। পালন করতে করতে তাঁদের শেষ মুহূর্তে মাথায় ঢুকেছে যে, এই মিছিল যেহেতু আনন্দের, সেহেতু এ তো বিনোদনও। যে বাজেট নিয়ে তাদের এই আনন্দ—এ তো সেই বাজেট–বিরোধী হয়ে যাবে। আবার খরচাও বাড়বে। কারণ, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও থিম পার্কের সেবায় দ্বিগুণ মূসক (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব যে রয়েছে। যদি কেউ তাঁদের এই জমায়েত ও আনন্দ স্লোগানকে বিনোদন পার্কের কাণ্ডকারখানা হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে তো ব্যয় আর দেখতে হবে না। এনবিআরের ওপর যে চাপ! ফলে বাজেটের মুখরক্ষায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে সেমসাইড খেলে একটু হাত মকশো করে নিলেন। সাথে উপরি হিসেবে খরচাও বেঁচে গেল। কারণ, বাজেটে সংঘর্ষের ব্যয় বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব করা হয়নি।
ফলে বাজেট নিয়ে আনন্দ মিছিল এবং তা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ নিয়ে বাজে কিছু বলার আগে নিজের বুদ্ধিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। না বুঝে কিছু বলবেন না তো!