রম্য রচনা

নেহায়েত আফগানরা মনে কষ্ট পাবে বলে, তাদের মন ভেঙে যাবে বলে…

এবারের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসরে শেষ ম্যাচটি খেলে ফেলেছে বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল। আনুষ্ঠানিকভাবেই। শেষটা শেষও হয়েছে হার দিয়ে। তাও আবার আফগানিস্তানের কাছে।

অথচ এই ম্যাচের আগে এক ম্যাচ জিতেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে চলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলাদেশের সামনে। আফগানিস্তানকে ১১৫ রানে বেঁধে ফেলেও আমাদের ব্যাটসম্যানরা আর তীরে তরী নিয়ে যেতে পারলেন না। ক্রিকেট অনুরাগীদের অনুযোগ, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের শরীরী ভাষাতেই নাকি ম্যাচ জেতার বা সেমিফাইনালে যাওয়ার কোনো তাড়না খুঁজে পাওয়া যায়নি! চেষ্টাই নাকি ছিল না!

যদিও বাংলাদেশ ১০ রানের কম ব্যবধানে হেরেছে। তবে একে মুখ চুন করা হারই বলতে চাইছেন অনেকে। এই ম্যাচের পরপরই সরস টিমের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের সঙ্গে প্ল্যানচেট ও টেলিপ্যাথির তার ও ইন্টারনেটবিহীন যুগল প্রযুক্তির মাধ্যমে কথা বলা হয়। ওই একই সদস্যের সঙ্গে এর আগে এই টুর্নামেন্টের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচের পর কথা বলা হয়েছিল। নেওয়া হয়েছিল তার একটি কল্পিত ও আষাড়ে সাক্ষাৎকার। এবারও সেই পথেই হেঁটেছে সরস টিম।

এই অকল্পনীয় সাক্ষাৎকারের সকল প্রশ্ন ও উত্তরকে এক শব্দে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দেওয়াই যায়। তারপরও পাঠকদের তীব্র জ্ঞানপিপাসা মেটাতে সেই ‘আজাইরা’ সাক্ষাৎকার পুরোপুরি তুলে ধরা হলো।

প্রথম প্রশ্ন: আফগানিস্তানের সঙ্গে হেরে গেল বাংলাদেশ। খেলোয়াড় হিসেবে আপনাদের অনুভূতি কী?

উত্তর: আফগানিস্তান জিতেছে, ভালো হয়েছে। ওরা জিততে চেয়েছিল, জিতেছে। না জিততে পারলে ওদের মন খারাপ হতো। দিনশেষে এটা একটা খেলাই। একটা ম্যাচের কারণে আফগানদের মন খারাপ হবে, তারা মনে কষ্ট পাবে—এটি কিন্তু ঠিক নয়। আর মানুষের মন ভাঙা খুব খারাপ কাজ। সেটা উচিতও না। উন্নতমানের স্পোর্টসম্যানশিপ অর্জন করতে এবং খেলার স্পিরিট ধরে রাখতে হবে আমাদের। তাছাড়া আমাদের কোচ তো বলেইছেন যে, সুপার এইটে ওঠাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। এরপর সবই বোনাস। তো, একটা বোনাস খেলায় আমরা আফগানদের মনে কষ্ট দিতে চাইনি। আবার আমরা হারতেও চাইনি। দুই পক্ষের মনের শান্তি ধরে রাখার একটা চেষ্টা ছিল।   

দ্বিতীয় প্রশ্ন: ভক্তরা অনুযোগ করছে আপনাদের শরীরী ভাষা নিয়ে…

উত্তর: দেখুন, উত্তর আমি দিয়েছি। এরপরও না বুঝলে আমার কিছু করার নেই। আফগানদের মন ভালো রাখাটা বেশি প্রয়োজন ছিল। সামনে আবার ওদের সাথে আমাদের সিরিজ আছে। কেউ মন খারাপ করে ভগ্ন হৃদয়ে সিরিজ খেলতে আসলে, সেটি খুব খারাপ হতো। আমরা অতিথিপরায়ণ জাতি। যদিও সিরিজ হবে ভারতে, তবে সেখানেও মন খারাপ থাকা উচিত হতো না। যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে।

জয়ের পরে উল্লাস করছেন আফগান ক্রিকেটাররা। ছবি: টুইটারতৃতীয় প্রশ্ন: আফগানরা জিততে চেয়েছিল, এই কথার মানে কি? আমরা হারতে চেয়েছিলাম নাকি?

উত্তর: এই যে, এই আপনাদের দোষ। খালি অন্যের মুখে কথা বসান। আমি কি বলেছি যে, হারতে চেয়েছিলাম? আমি বলেছি, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। খেলা আপনারা বোঝেন না। খেলার মাঠে ইতিবাচক থাকতে হয়। দেশের এত এত ইনফ্লুয়েন্সাররা আপনাদের কিছুই শেখাতে পারেননি। হারলেও পজিটিভ থাকতে হবে, পজিটিভিটি খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে শরীরের রক্তের গ্রুপ বদলে ফলে বি পজিটিভ করতে হবে। আমরা পুরো ম্যাচেই পজিটিভ ছিলাম। নইলে তো আর শেষ উইকেট যাওয়া পর্যন্ত ব্যাট করতাম না। আমরা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাটসম্যান নামিয়ে গেছি, সবাই আউট না হওয়া পর্যন্ত। এখন কেউ দ্রুত আউট হয়ে গেলে আর কী করার আছে!  

চতুর্থ প্রশ্ন: আচ্ছা, সেমিফাইনালে যাওয়ার চেষ্টা কি আপনাদের মনে ছিল?

উত্তর: দেখুন, সেমিফাইনাল কিন্তু ফাইনাল না। আফগানদের সাথে ভালো করলেই যদি একেবারে কাপ দিয়ে দিত, তাহলে আমরা ভেবে দেখতে পারতাম। নইলে কিন্তু হুদাই কষ্ট। আপনারা কি চান আমরা হুদাই কষ্ট করি? আইসিসি এক্ষেত্রে আমাদের সাথে অন্যায় করে সেমিফাইনাল বা ফাইনালের আয়োজন রেখেছে বলে মনে করি। সমস্যা আসলে অনেক, আছে সূক্ষ্ম অনেক কারচুপিও।

পঞ্চম প্রশ্ন: তাই নাকি! কী বলেন! যেমন…

উত্তর: আমরা বোলিংয়ের সময় ক্রিকেট বলই ব্যবহার করেছিলাম। তবে আমাদের সন্দেহ, আফগানরা পিংপং বল ব্যবহার করেছে। এতে করে খেলা কঠিন হয়ে যায়। নেহায়েত আফগানরা মনে কষ্ট পাবে বলে, তাদের মন ভেঙে যাবে বলে আমরা খেলার মাঝখানে কিছু বলিনি। শেষ হওয়ার পর বলছি। আমাদের ব্যাটের কাঠও খারাপ ছিল, তা তো আগের সাক্ষাৎকারেই বলেছি। আবার বৃষ্টির পানি ঠান্ডা ছিল বেশি, ফলে ব্যাটসম্যানদের শীতও করছিল। মানে, সব মিলিয়ে একটা বিরুদ্ধ পরিস্থিতি। আমাদের টার্গেট ছিল, খেলে যাওয়া। তা খেলা যেমনই হোক না কেন!

ষষ্ঠ প্রশ্ন: আপনাদের মনে আসলে কি চলছিল? মূলমন্ত্র কি ছিল?

উত্তর: দেখুন, আমরা তো হারতে হারতেই জিততে শিখেছি। তাই হারা মানেই জেতার কাছাকাছি চলে আসা। কার কাছে হারছি, কেন হারছি—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ না। আজ আমেরিকার কাছে হারলাম, কাল আফগানিস্তানের কাছে বা পরশু হয়তো হনুলুলুর কাছেও হারতে পারি। হারা মানেই শেখা। আমরা বিশ্বাস করি, ‘ফেইলার ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস।’  

সপ্তম প্রশ্ন: আপনাদের সেই পিলার কতটা শক্তিশালী হলো? বা কতটা উঁচু হলো?

উত্তর: অনেক, অনেক। আশা করি, সেই পিলারে সিঁড়ি লাগিয়েই চাঁদে যাওয়া যাবে! রকেট আর…

বিশেষ নোট: সপ্তম প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সময়েই পিলারের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আর কথা বলা যায়নি। এই অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারটিই পাঠকদের তীব্র জ্ঞানপিপাসা মেটাতে তুলে ধরা হয়েছে।

[সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: দয়া করে, এই সাক্ষাৎকারের একটি শব্দও বিশ্বাস করবেন না কেউ বিশ্বাস করে নিলে, সেটি কেবলই তার বোধবুদ্ধির অভাব এবং তা একটি কাকতালীয় ঘটনা বলে বিবেচিত হবে।]