রম্য রচনা 

যে কাভার লেটার লিখলে চাকরি দিতে বাধ্য সবাই!

নিজের চাকরিটা আর ভালো লাগছে না? বহুদিন ধরেই কোয়াইট কুইট করে যাচ্ছেন? চিন্তা কী, বিভিন্ন ওয়েবসাইট আছে, আছে লিংকডইন। একটু খুঁজলেই মিলে যাচ্ছে মনের মতো চাকরি। শুধু আবেদন করা বাকি। আবেদনটা করার মাঝপথে এসেই… এ কী?!

এখানে যে কাভার লেটার চেয়ে বসেছে! বাকি সব না হয় দিলাম, কিন্তু নিজের জ্ঞানগরিমা, অর্জনের কথা একটু ঢেকেঢুকে রাখতে মানে ‘কাভার’ করতে বললেই যে রাজ্যের আলসেমি চলে আসে। আর এ কারণেই দারুণ সব সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। পাঠক, আপনারও কী একই অবস্থা? 

চিন্তা নেই, আমার-আপনার-সবার সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছে ইকোনমিস্ট। এমন এক লেটার লিখে দিয়েছে, তাতে দুনিয়ার সব চাকরির আবেদনই কাভার হয়ে যাচ্ছে। চলুন দেখে ফেলি সে লেটার।

প্রিয় স্যার/ম্যাডাম,

আপনার বিক্রয় বিভাগে আবেদনের সময় ছোট্ট একটা কাভার লেটারও দিতে বলেছেন। কিন্তু আপনার কোম্পানিতে কাজ করতে কতদিন অপেক্ষায় আছি, তা বলতে গেলে তো সারা জীবন কেটে যাবে। আমার মা বলে, জন্মের পর দেস্ত সিস্তেম/ সেকুয়া ক্যাপিটাল/ (যে কোম্পানিতে আবেদন করছেন) নামটা দিয়েই প্রথম বোল ফুটেছিল আমার। পশ্চাতদেশে আপনার কোম্পানির লোগো/ প্রতিষ্ঠাতার মুখ ট্যাটু করে রেখেছি সেই কবেই। আপনার কোম্পানির পণ্যের নাম যেন ভুলেও না ভুলে যাই, সেটা নিশ্চিত করেছি আমার পোষা প্রাণিগুলোর নাম রেখে। আপনারা আমার অ্যাপ্লিকেশন রিজেক্ট করবেন ভেবেই শিহরিত। আর যদি আমাকে নিয়েই ফেলেন, শুধু কর্মী না, ব্র্যান্ডের ঢোল বাজানোর একটা লোকও পেয়ে যাবেন।

আমার দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার কথা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শব্দ ব্যয় করা যেতেই পারে। প্রথমেই বলে ফেলি, সর্বশেষে যেখানে ছিলাম, সেখানে আমি যাওয়ার আগে বার্ষিক ১ কোটি ডলার আয় করত। আমি জয়েন করার তিন মিনিট যেতে পারেনি, তার আগেই আয় চারগুণ করে ফেলেছিলাম। আমি বিশ্বের যত সম্ভাবনাময় বাজার আছে, সব দেশেই আমি গিয়েছি, জানি সে বাজার দখলে কী করতে হবে। কোন ভাষা লাগবে আপনার? মান্দারিন, হিন্দি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ–সব ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারি। এসব ভাষায় ইশারায় কথা বলাও আঙুলের তুড়ির ব্যাপার আমার। নিজে একাই একবার মাল্টিলেটেরাল চুক্তি করে ফেলেছিলাম। এত কিছু করে হাতে খুব কম সময় পাই, সে সময়টা আমি ধ্যান করে, কিকবক্সিং করে এবং পথশিশুদের পড়াশোনা করিয়ে কাটাই। আর ব্যস্ততা চরমে উঠলে তিনটাই একসঙ্গে করি।

চাইলেই আমার সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বর্ণনায় প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ খরচ করতে পারি। সেজন্য আমি এসটিএআর (সিচুয়েশন, টাস্ক, অ্যাকশন আর রেজাল্ট) মেথডও ব্যবহার করতে পারি। আপনাদের ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে, ইন্টারভিউতে স্টারমার্ক পেতে চাইলে এই তারকাচিহ্নিত প্রক্রিয়া অনুসরণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বেশি কিছু বলতে চাই না, শুধু একটা উদাহরণ দিই। একবার আলাস্কায় ছোলা সরবরাহ করে এমন এক কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলাম। আমার এক সহকর্মীর পারফরম্যান্স খুব বাজে ছিল। আমাকেই দায়িত্ব দেওয়া হলো তাকে লাইনে আনার। আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, সব ক্লায়েন্ট হ্যান্ডলিংয়ে আমি ওর সঙ্গে ছিলাম। এমনই অবস্থা যে, আমার কলিগই পুরো ছোলা ইন্ডাস্ট্রির সেরা বিক্রয়কর্মী হয়ে গেল। কিন্তু দুনিয়ায় ভালো মানুষের দাম নেই। এত ভালো কাজ করার পরও ওই শালার পুতকে বিভাগীয় প্রধান বানিয়ে দিল আর আমার চাকরি চলে গেল!

আপনি চাইলে আমার চরিত্র ও নীতিগত অবস্থানের কথাও বলতে পারি। আমি সব ব্যাপারেই প্যাশনেট, অনেকের চোখেই। এতেই বোঝা যায় আমি কোনো ব্যাপারে বৈষম্য করি না। আমি সবসময় উন্নতির পক্ষে: অন্য সবকিছুর চেয়ে উন্নতিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ! (কোড: মজা করছি, বোঝাতে চাইছি অফিসে মজা করতে পারাটাও জরুরি।) আমি হাল ছাড়ি না: এটা এই মাসে আমার লেখা ৪৩৫তম কাভার লেটার। যদিও আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি আমি শুধু আপনার কোম্পানিতেই কাজ করতে চাই। আমি তথ্য মেনে সিদ্ধান্ত নিই, এবং আমি জানি আমার লক্ষ্য কী। আমি ফল আনায় নজর দিই, দয়ায় বিশ্বাসী। হেনতেন, হেনতেন, হেনতেন।

চাকরিতে এখন সব জায়গায় দরকার হয় কাভার লেটার। প্রতীকী ছবি ফ্রি পিকের সৌজন্যে

অথবা এই লেটার ব্যবহার করে চাকরির সার্কুলারে ব্যবহার করা কিওয়ার্ডগুলো আবার শোনাতে পারি। সত্যি বলতে, এতক্ষণ তো আমি তাই করেছি। শুধু ‘ছোলা’ আর ‘শালার পুত’ বাদে। প্যাশনেট, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, লক্ষ্যপূরণ? সবগুলোই লিখেছি। আমি একটু করে ‘কোড’ শব্দটাও ঢুকিয়ে দিয়েছি, ইঙ্গিত দিলাম, চাইলে প্রোগ্রামিংও করতে পারব। চাইলে আপনি চাচ্ছেন এমন আরও কিছু শব্দ ব্যবহারে সময় দিতে পারি। ডায়নামিক, লক্ষ্যে অবিচল, মানুষ পটানো, আত্মবিশ্বাসী, নিজেকে প্রমাণ করা। কোনটা লাগবে?

অথবা প্রশ্ন করতে পারি, এই ছাতামাথার কাভার লেটার লিখে আসলেই কী লাভ? আমাকে যদি বাড়তি খাটানোই আপনার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে চ্যাটজিপিটি দিয়ে এসব লিখতে এখন এক ফোটা কষ্ট হয় না। এর চেয়ে ভালো হয় সবাইকে হাতে লিখে এসব লেটার পাঠাতে বলেন, সঙ্গে এটাও বলে দেন যেন সরাসরি আপনার অফিসে পাঠানোর জন্য কিছু কবুতর পুষি আমরা।

এমন তো না যে, এই লেটারে আপনি বাড়তি কোনো তথ্য পাচ্ছেন। আমি জানি এখান থেকেই বাছাই করার কোনো না কোনো উপায় আপনাদের আছে। কিন্তু এরচেয়ে অ্যাপ্টিটিউড বা পারসোনালিটি টেস্ট নেওয়ার ব্যবস্থা করলে, আমার যোগ্যতা সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পেতেন না?

আপনি যা যা চেয়েছেন, সব যোগ্যতাই বাড়িয়ে বাড়িয়ে আমি তো সিভিতেই লিখে রেখেছি, লিংকডইনেও (ওখানে হয়তো একটু কম বাড়াবাড়ি করি)। কাভার লেটারের ব্যাপারে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়, সবগুলোই মেনে চলেছি; আমি নিশ্চিত প্রায় সব চাকরিপ্রার্থীই তাই করেছে। আমি স্বীকার করেই নিয়েছি, সার্কুলারে দেওয়া শব্দগুলোই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আপনাকে গেলাচ্ছি। প্রচুর অ্যাকশন শব্দ ব্যবহার করেছি, যেমন, ‘বদলে দেওয়া’, ‘চারগুণ’; বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি আমি একজন উদ্যোক্তা, যে শিকারি মনোভাবের, লক্ষ্য অর্জনের আগে হাল ছাড়ে না (ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি)।

সত্যি বলতে, আপনার ও আমার–দুজনেরই সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু হচ্ছে না এখানে। কাভার লেটার চাওয়ার একমাত্র যুক্তি হতে পারে, আপনি হয়তো হঠাৎ ব্যতিক্রমী কিছু পেতে পারেন। আপনি হয়তো আসলেই কোনো চাকরি প্রত্যাশী পেতে পারেন, যে আপনাকে সত্যি কথাটা বলবে এবং যাকে দেখে আপনার ইন্টারভিউ নেওয়ার ইচ্ছা জাগবে।

আশা করি খুব শিগগির সামনাসামনি আপনার সঙ্গে দেখা হবে।

আপনার নিবেদিত, 
এখানে নিজের নামটা লিখুন