অনেক সময় জীবনে এমন অবস্থা আসে। যাই বলছেন, যাই লিখছেন, বা যাই করছেন, তাতেই গণ্ডগোল বেঁধে যাচ্ছে। লেখার বিষয়টা এল, কারণ যুগ তো এখন ফেসবুক–টুইটারের। ওতে ঝামেলা বরং আরও বেশি। আর এভাবে যখন একের পর গ্যাঞ্জাম হতেই থাকেই জীবনে, তখন মাথায় ভর করে অভিমান। মনে হয়, কি আর বলবো, বললেই তো ঝগড়া!
প্রথমে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম দিয়েই শুরু করা যাক। বাংলাদেশে এখন ওসবই বেশি চলে। ফেসবুক, ইউটিউবই আমাদের জীবন। ফলে এসব দিয়ে উদাহরণ দিলে বোঝাটাও সহজ হবে।
এ দেশে এখন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকেই সব ব্রেকিং নিউজ মেলে। মানুষ এদের এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছে যে, জীবনে কোনো কিছু ঘটানোর আগে ফেসবুকে ঘটান। নতুন শিশু পৃথিবীতে এলে আগে মার্ক জাকারবার্গকে ছবি পাঠানো হয়। প্রেম হলেও মানুষ তা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানায়। বিচ্ছেদ হলেও। এখন তো হত্যা, আত্মহত্যা—সবই হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলাই যায় যে, যেমন ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড তৈরির স্বপ্ন মার্ক জাকারবার্গ এখনও দেখছেন, তা এ দেশের মানুষেরা এরই মধ্যে বাস্তবেই সম্ভব করে ফেলেছে। তা এমন কাস্টমারদেরই তো চেয়েছিলেন প্রিসিলা চ্যানের জামাই!
আমাদের দেশে রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে দুর্নীতিও ফেসবুকনির্ভর হয়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতারা এ দেশে ফেসবুকে চিঠি লিখে আরেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। ওই নেতা আবার প্রত্যুত্তর দেন, ফেসবুকেই। তাতে গিয়ে আমরা আমজনতারা আহা, উঁহু করে আসি। মতামত জানাই। সে এক এলাহী কারবার! আবার এফ কমার্স দিয়ে ব্যবসা–বাণিজ্য তো চলছেই। অন্যের প্রোফাইল হ্যাক করে টাকা–পয়সা হাতিয়েও নেয় কেউ কেউ। আসলে ফেসবুকের এমন বৈচিত্র্যময় ব্যবহার সত্যিই ইউনিক।
এতসব কাজ যেহেতু ফেসবুক, টিকটকে চলে, ফলে ঝামেলাও ঘটে। যেহেতু সবই লাইক–কমেন্টের খেলা, সেহেতু এনগেজমেন্ট ভালো না হলে আসলে মজা নাই। এনগেজমেন্ট ভালো করার অন্যতম উপায় হলো ‘শক থেরাপি’। তাই শ্রেণি, পেশা নির্বিশেষে আমরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শক দেওয়ার খেলা খেলে যাই। যত বড় শক, তত বেশি এনগেজমেন্ট, তত বেশি লাইক–কমেন্ট। তাই কেউ তরমুজ কেটে ‘ওই কীরে, ওই কীরে’ করে, কেউ আবার চালায় ফ্রেন্ডলি ফায়ার। কখনো কখনো সেগুলোই আবার মিস ফায়ার হয়ে যায়। আর তখনোই লাগে গণ্ডগোল। এটা আবার চেইন ইফেক্টের মতো। ফাটা কপালের মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়—যাই করছে, গ্যাঞ্জাম হচ্ছে। ডানে গেলেও ঝগড়া, বামে গেলেও। আর মাঝখানে থাকলে তো দুই তরফ থেকেই আওয়াজ আসে—‘আক্রমণ…’।
বিগড়ে যাওয়া মাথা নিয়েই তখন মানুষ একে–অপরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করতে থাকে। ওসব আবার আমরা ভালো পারি। একে খোঁচানো, ওর মাথায় একটু চাঁটি দেওয়ায়, আরেকজন পেছন ফিরলেই একটু চিমটি কাটা, চিমটিতে কাজ না হলে বাঁশ দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে করে জীবনে যন্ত্রণার অভাব হয় না। পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে সমস্যা। তখন এক পর্যায়ে হতাশা আমাদের গ্রাস করে ফেলতে পারে। মনে হতে পারে, কি আর বলবো, বললেই তো ঝগড়া!
এসব এড়ানোর বা নিদেনপক্ষে ড্যামেজ মিনিমাইজ করার কিছু উপায় এখন বলে দেওয়া যাক। এতে করে ঝগড়াকে জাস্ট পাশ কাটিয়ে পাশের জলা খেতে ল্যান্ড করা যাবে।
দ্বিতীয়ত, বেশি তাড়াহুড়ো করা যাবে না। কথার জবাব দিতে গিয়ে দ্রুততার সাথে পাল্টা জবাব দেবেন না। একটু রয়েসয়ে এগোতে হবে। নইলে দেখা যাবে, অন্যকে ছোঁড়া তির বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে আপনারই পেছনে! ওতে কিন্তু বিপদ আরও বাড়বে।
তৃতীয়ত, বিভ্রান্তিমূলক শব্দ বেশি বেশি ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করার চেষ্টা করুন। যেসব কেউ বাপের জন্মে শোনেনি, সেসব দিয়ে একটা ঘোর তৈরি করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে বিরোধী পক্ষ পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে বাক্যালাপ বন্ধ করে দিতে পারে। আপনাকে পাগলও ভাবতে পারে। তবে সেটি বড় কথা নয়। ঝগড়াতে রাশ টানাই বড় বিষয়।
পঞ্চমত, অতীত ও বর্তমানকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। এমন কিছু করবেন না, যাতে আপনার অতীত বা বর্তমানের ‘পাপ’ অন্যের সামনে আরও বেশি করে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে ভুলেও বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অনুসরণ করতে যাবেন না। তাহলে কিন্তু খবর হয়ে যাবে!
ওপরের কোনো কিছুতেই কাজের কাজ না হলে, স্রেফ মনে মনে স্থির করে নিতে হবে যে, আপনি আসলে সেই চিপায় আছেন! সেক্ষেত্রে হতাশায় ডুব দিন। দিয়ে মুখটা বন্ধ করে, হাতটা বেঁধে ফেলে একেবারে হিরণ্ময় নীরবতাকে বরণ করে নিন। জানেনই তো, বোবার কোনো শত্রু নাই!