রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের দিক থেকে ইউরোপে পোস্টিং পাওয়াকে মার্কিন কূটনীতিকদের জন্য তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখা হতো এতদিন। বিশাল বাসভবন, শান্ত নির্বিবাদ জীবন — অন্তত কিয়েভের পশ্চিমে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল ফ্রিড বলেন, কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূতের জন্য ইউরোপে পোস্টিং পাওয়া মানে ‘আপনি বন্ধুত্বপূর্ণ অঞ্চলে থাকেন।’ কোনো বিরোধ তৈরি হলেও বেশিরভাগ সময়েই সবকিছু বন্ধ দরজার আড়ালে মিটে যায়।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগে অন্য অনেক সমীকরণের মতো এই হিসাব-নিকাশও বুঝি বদলে গেল!
সম্প্রতি ইউরোপে তিনজন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও তাঁদের স্বাগতিক দেশের মধ্যে প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা বোঝাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন কূটনীতিতেও আর রাখঢাক না রাখার যে পথে হাঁটছে, তার স্বাদ থেকে বাদ যাচ্ছে না ইউরোপও। সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ওয়াশিংটন এসব ঘটনাকে দেখে মহাদেশটির জন্য প্রয়োজনীয় ‘কঠোর ভালোবাসা’ হিসেবে – প্রচণ্ড ভালোবাসলেই না একটু-আধটু বকুনিও দেওয়া যায়। ঝামেলা হলো, এ বেলায় ইউরোপের সঙ্গে হিসাবে মিলছে না আমেরিকার। ইউরোপ একে দেখছে ‘মৌলিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারে’র লঙ্ঘন হিসেবে।
তবে যে তিনজন ইউরোপভিত্তিক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঝামেলার কথা বলা হয়েছে সিএনএনের প্রতিবেদনে, তার মধ্যে বেলজিয়ামে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিল হোয়াইটের ঝামেলার বিষয়টাই একে ঝামেলার সঙ্গে সংশ্লেষহীন তৃতীয় পক্ষের জন্য ‘কৌতুককর’ বলে মনে করাতে পারে। ঝামেলাটা যে বেধেছে খৎনার ধরন ও নিয়মের কড়াকড়ি নিয়ে!
ইহুদি ধর্মীয় খৎনা বিষয়ে দেশটির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছেন বিল হোয়াইট। তবে আপাতদৃষ্টিতে এই ব্যঙ্গ-করণ-উপযোগী ইস্যুর সঙ্গে তিনি জুড়ে দিয়েছেন এক সিরিয়াস অভিযোগ – ইহুদিবিদ্বেষ।
বেলজিয়ামের আন্তওয়ার্প অঞ্চলের একটি মামলার প্রসঙ্গ টেনে তীব্র ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিল হোয়াইট। মামলাটা ইহুদি ধর্মীয় খৎনা সম্পাদনকারী তিন ব্যক্তি — যাঁদের ‘মোহেল’ বলা হয় — তাঁদের ঘিরে। বিচারিক তদন্তের মুখে পড়েছেন ওই তিন ‘মোহেল।’ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিবন্ধিত কোনো চিকিৎসককে হাজির না রেখেই তাঁরা খৎনা করেছেন।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দীর্ঘ এক পোস্টে বেলজিয়ামের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ভানদেনব্রুকেকে বকাঝকা করে আবার তাঁকে এই মামলায় হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানিয়েছেন বিল হোয়াইট। এক্স পোস্টে হোয়াইট লিখেছেন, ‘বেলজিয়াম, আপনাদের বলছি — আন্তওয়ার্পের তিন ইহুদি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (মোহেল)-এর বিরুদ্ধে এই হাস্যকর ও ইহুদিবিদ্বেষী ‘মামলা’ এখনই প্রত্যাহার করতে হবে! তাঁরা এমন কাজই করছিলেন যেটাতে তাঁরা হাজার বছর ধরে প্রশিক্ষিত।’
বেলজিয়ামের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভানদেনব্রুকেকে ‘খুবই অভদ্র’ আখ্যা দিয়ে এক্স পোস্টে হোয়াইট দাবি করেন, মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে করমর্দন বা ছবি তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আমেরিকার প্রতি বেলজিয়ামের ঋণের কথাও মনে করিয়ে দিয়ে হোয়াইট বলেন, ‘এটা স্পষ্ট ছিল যে আপনি আমেরিকাকে অপছন্দ করেন — যে দেশ বেলজিয়ামের স্বাধীনতার জন্য দুবার লড়েছে এবং যেখানে আমাদের দেশের হাজার হাজার তরুণ প্রাণ দিয়েছেন।’
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাক্সিম প্রেভো এর জবাব দিয়েছেন। তিনি হোয়াইটের বক্তব্যকে ‘ভুল, অপমানজনক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলেছেন। তিন ইহুদি ‘মোহেল’কে আইনি কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে ব্যাখ্যায় প্রেভো বলেছেন, ‘কঠোর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে যোগ্য চিকিৎসকের মাধ্যমে ধর্মীয় খৎনার অনুমোদন বেলজিয়াম দিয়ে রেখেছে।’ তিনি জানান, হোয়াইটের মন্তব্যের বিষয়ে মঙ্গলবার তাঁকে বৈঠকে ডাকা হয়েছে।
প্রেভো বলেন, ‘বেলজিয়ামে স্বীকৃত কোনো রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব হলো আমাদের প্রতিষ্ঠান, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাকে সম্মান করা। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিচারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ মৌলিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন।’
ইউরোপে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের সাম্প্রতিক ‘দাদাগিরি’র গল্পে বেলজিয়ামের এই দ্বন্দ্ব একক কোনো ঘটনা নয়। ফ্রান্সে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস কুশনারও কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে পাঠানো চিঠিতে কুশনার বলেন, মাখোঁ ইহুদিবিদ্বেষ বৃদ্ধির বিষয়টি যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেননি। মাখোঁ এর জবাবে বলেছিলেন, চার্লস কুশনারের মন্তব্যটি ‘ভুল’ ও ‘একজন কূটনীতিকের কাছ থেকে অগ্রহণযোগ্য।’
এই সপ্তাহের বেলজিয়াম বিতর্কের পরপরই পোল্যান্ডেও উত্তেজনা দেখা যায়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি পোল্যান্ডে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম রোজ ঘোষণা দেন, পোল্যান্ডের নিম্নকক্ষ সেজমের স্পিকার ভ্লোদজিমিয়েজ চাজারস্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করবে। তিন দিন আগে চাজারস্তি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ট্রাম্প ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য নন।’
রোজ বলেন, ট্রাম্পের প্রতি চাজারস্তির ‘অযৌক্তিক ও উসকানিবিহীন অপমান’ ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘চমৎকার সম্পর্কের পথে গুরুতর বাধা।’ তিনি যোগ করেন, ‘কেউ যুক্তরাষ্ট্র–পোল্যান্ড সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে বা (ট্রাম্প)-কে অসম্মান করতে পারবে না।’
সেজমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা মধ্য-বাম জোটের নেতা প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, ‘মিত্ররা একে অপরকে সম্মান করবে, বক্তৃতা দেবে না — অন্তত পোল্যান্ডে আমরা অংশীদারিত্বকে এভাবেই দেখি।’ রোজ জবাবে বলেন, তিনি ‘কোনো দ্বিধা, ব্যতিক্রম ছাড়া, দ্ব্যর্থহীনভাবেই’ তাঁর প্রেসিডেন্টের পক্ষে থাকবেন।
১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পোল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকা ড্যানিয়েল ফ্রিড বলেন, এসব ঘটনা প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির বাইরে। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘একজন কূটনীতিকের কাজ হলো প্রেসিডেন্টের এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সব আক্রমণের জবাব দিতে হবে। বরং যে দেশে কাজ করছেন, সেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতরে থেকে কীভাবে এজেন্ডা এগোবে — তা বুঝতে হয়। কখনো আক্রমণ উপেক্ষা করে মূল কাজেই মনোযোগ দিতে হয়।’
ফ্রিড ভারশ-তে রোজের কাজের প্রশংসা করলেও সতর্ক করেন, ‘অন্যের মাঠে প্রকাশ্য লড়াইয়ে খুব কমই জয় মেলে। আপনি যদি সেই পথে হাঁটেন, হারবেন।’
গত কয়েক মাসে, বিশেষ করে ট্রাম্পের ট্যারিফ-যুদ্ধ শুরুর পর এতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের মাটিতে প্রকাশ্যে বিরুদ্ধ মত প্রকাশে আপত্তি করছে না। মিউনিখে ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্দেশে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কঠোর মন্তব্য থেকে শুরু করে ট্রাম্পের অনলাইন প্রতিক্রিয়া — সবই এর উদাহরণ। জর্জ ডাব্লিউ বুশ প্রশাসনে ইউরোপ ও ইউরেশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা ফ্রিডের মতে, ইউরোপে রাষ্ট্রদূতরা হয়তো এই দৃঢ় ভঙ্গিই অনুসরণ করছেন।
তিনি বলেন, ‘তাঁরা মনে করছেন, তাঁদের কাছ থেকে এটাই প্রত্যাশিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়। তাঁরা খুব সংবেদনশীল হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কাজ করছেন। জোরালো প্রতিক্রিয়া না দিলে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মহল থেকেই সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন — এমন আশঙ্কাও থাকতে পারে।’
তবে কোন ‘আক্রমণ’ উপেক্ষা করা যায় — তা বুঝলে সুফলও মেলে, বলেন ফ্রিড। তিনি ২০০৪ সালের স্পেনের উদাহরণ দেন। তখন হোসে লুইস রদ্রিগেস জাপাতেরো ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসে মারিয়া আসনারকে বুশের ‘পুতুল’ বলেছিলেন।
নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট বুশ জাপাতেরোকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। ফ্রিডের ভাষায়, ‘বুশ মূলত বলেছিলেন, ‘এটা নির্বাচন প্রচারণা ছিল — আমি বুঝি। মতভেদ থাকলেও আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ জাপাতেরো বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, “কী! এত কিছু বলার পরও তিনি যোগাযোগ করলেন?”’
ফ্রিড বলেন, ‘বুশ জানতেন তিনি কী করছেন। অনেক সমস্যা এড়ানো গিয়েছিল, কারণ তিনি বিষয়গুলো ব্যক্তিগতভাবে নেননি। তাঁর নজর ছিল বড় লক্ষ্যে।’
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্যও ছোট হওয়ার কোনো কারণ তো নেই, দেশটা যুক্তরাষ্ট্র বলে কথা! কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কাজের ধরন যে আলাদা, এটা বুঝতেও আইনস্টাইন হওয়ার দরকার পড়ে না।