রাজধানীর ওয়ারীতে থাকতেন লাভলী ইয়াসমিন (৪৫)। গত ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, ছেলের সঙ্গে অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ওই নারী।
একই তারিখে দেশের বাইরে বাবা-মায়ের ঝগড়ার জেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন দুই বোন। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ভারতের উত্তর প্রদেশে। তাঁরা উত্তরপ্রদেশের পিলভিট জেলার পুরানপুর থানার বাসিন্দা ছিলেন।
দেশে-বিদেশে এমন ঘটনা কি এক-দুইটিই ঘটছে এই প্রশ্নের উত্তর হবে, না। সারা বিশ্বে হরহামেশা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আত্নহত্যা কিন্তু শুধুই একটি মানুষের মৃত্যু নয়। প্রত্যেকটা মানুষই কোনো না কোনো পরিবারের অংশ। যিনি আত্মহত্যা করেন, তিনি মরে যান। কিন্তু তাঁর কারণে পরিবারের বাকি সদস্যদের পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি।
আজ ১০ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বের অনেক দেশ এই দিবস পালন করে আসছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘কর্মের মাধ্যমে আশাবাদ তৈরি করা (Creating hope Through Action)।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আমরা একে অপরের বন্ধু হয়ে, ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে একে-অন্যকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারি। এতে কমতে পারে আত্মহত্যার প্রবণতা।
দেশের অবস্থা কী
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) চলতি বছরের ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) নারী নির্যাতনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আসকের গত ছয় মাসের প্রতিবেদনে জানা যায়, এই সময়কালে নানাবিধ নির্যাতনের কারণে মোট ৭৫ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৩ জন নারী। যৌন হয়রানির কারণে ১০ জন নারী আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেন ৫৯ জন নারী। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন ৩ জন নারী।
বাংলাদেশে মহিলা পরিষদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গেল বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ২৬১ জন নারী বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ২০৩ জন নারী বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছেন।
আমাদের দেশের নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা নানা কারণে দেখা দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার নারীরা যখন কারও কাছে সহযোগিতা পান না, তখন তাঁদের কাছে কখনো কখনো আত্মহত্যাই একমাত্র পথ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া খুব একটা সহজ বিষয় না। কিন্তু এই কঠিন সিদ্ধান্ত মানুষ খুব সহজেই নিয়ে নিচ্ছেন ইদানিং।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলছিলেন, ‘আত্মহত্যা আমাদের কাছে একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এ ক্ষেত্রে আত্মহনন যে অমানবিক বিষয়, আর আইনের লঙ্ঘন - তা মাথায় কাজ করে না। এই বোধটা আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বলা যায় আমাদের সমাজের মূল্যবোধের পরিবর্তনের কারণে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।’
ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, মানুষের জীবনে অস্থিরতা বাড়ছে। পাশাপাশি বেড়েছে সামাজিক চাহিদা। বিষণ্ণতার চরম পর্যায়েও মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয় কখনো কখনো। এই বিষণ্ণতা বাড়ার কারণ হলো, তার যে চাহিদা তা পূরণ হচ্ছে না। এসবই মানুষের জীবনকে জটিল করে তুলছে। ব্যক্তি ও সমাজজীবনের অস্থিরতা নারী-পুরুষ উভয়কে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘জীবনের কোন পরিস্থিতিতে এসে মানুষ এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে পাশের মানুষকে মানবিক হতেই হবে। আর সেই সঙ্গে কারও আত্মহত্যার পেছনে কেউ যদি কারণ হিসেবে যুক্ত থাকেন, তবে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
আইন কী বলে
নারীরা এখন ঘরে বসে থাকছে না। বাইরে কাজ করতে যাচ্ছে। আগের তুলনায় নারীদের কাজের পরিধি বেড়েছে। চাকরির পাশাপাশি সংসারের কাজও আবার শেষ করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার নারীদের এই বিষয়টি ভালো চোখে দেখে না। এতে নারীর মনে এক ধরণের মানসিক অশান্তি তৈরি হয়, যা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন।
এই আইনজীবী বলেন, ‘পরিবারে বিশেষ করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া তীব্র অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের জন্য যদি কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তবে অপরাধীকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আত্মহত্যায় সহায়তা বা প্ররোচনাকারীকে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা অনুযায়ী ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর শাস্তি রয়েছে দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় এক বছরের কারাদণ্ড। তবে বেশির ভাগ সময় মানবিক দৃষ্টি থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।’
আত্মহত্যার সাথে বিষন্নতার সম্পর্ক রয়েছে। আত্মহত্যার কারণে যত মৃত্যু হয়, তার বেশির ভাগ হয় হতাশার কারণে। আর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আত্মহননের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কোন বিষয়টি কাজ করে আসলে
এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে কিশোর-কিশোরী ও বিবাহিত নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। বৈশ্বিকের তুলনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে নারীকে আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভরশীল হতে হবে। জীবনে সমস্যা আসতে পারে, কিন্তু কোনো সমস্যাই সমাধানের বাইরে নয়। তাই তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।’
ডা. ফারজানা রহমানের পরামর্শ, যদি বেশি মৃত্যুচিন্তা মাথায় আসে, তাহলে অবশ্যই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। সঠিক কারণ বের করে এর চিকিৎসা করলে আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে মুক্ত হওয়া খুবই সম্ভব।