শত প্রতিবন্ধকতায় নবান্ন উৎসব ধরে রেখেছেন মমতাজ

শিশিরভেজা অগ্রহায়ণের সকাল। গ্রামের আঁকাবাঁকা সড়ক দিয়ে এগিয়ে চলেছি। চারপাশে বিস্তৃত ফসলের মাঠ। কোথাও হলুদে হলুদে ছেয়ে আছে সরিষা খেত। আবার কোথাও সারি সারি কেটে রাখা সোনালী ধান গাছ। মাঠে কৃষকেরা ব্যস্ততা ধান কাটা-মাড়াইয়ে কাজে। আর বাড়ির আঙিনায় কৃষাণীরা ব্যস্ত ধান শুকাতে।  
মাঠ-ঘাট পেরিয়ে পূনর্ভবা নদী ঘেঁষে যে সড়কটি ধরে যাচ্ছি, সেটি শেষ হয়েছে বাবুরঘোন গ্রামে।চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আঞ্চলিক ভাষায় ঘোন অর্থ কোণ। এঁকেবেঁকে যাওয়া পূণর্ভবা নদীর কোণায় এই গ্রামের অবস্থান বলে গ্রামের নাম বাবুরঘোন।

সেই গ্রামে কিছুদূর যেতেই একটি বাড়ি থেকে ভেসে আসে গীতের সুর। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল নবান্ন উৎসবের আয়োজন। বাড়ির আঙিনায় গ্রামের নারীরা গোল হয়ে বসে পিঠা বানাচ্ছেন। আর সম্মিলিত কণ্ঠে গাইছেন গীত। সবার পরনে হলুদ শাড়ী আর হাতে কাঁচের চুরি। কারো কারো হাতে রয়েছে ফুলে মালা আর কানে বা খোপায় গোঁজা ফুল।
  
এই নবান্ন উৎসবে যে গীত গাওয়া হচ্ছে তা সময়ে ব্যবধানে এখন বিলুপ্ত। অথচ এই গ্রামীণ গীতে খুঁজে পাওয়া যেত  গ্রামের নারীদের সুখ-দুঃখের কথা। ধান ভানা, আটা পেষা, নদীতে পানি আনতে যাওয়া থেকে শুরু করে বিয়ে বাড়ি, সবখানেই আলাদা আলাদা গীতের প্রচলন ছিল।

বাড়ির আঙিনায় গ্রামের নারীরা পিঠা বানাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীতনবান্ন উৎসবে পিঠা-পুলি বানানো শেষে সবার মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়। ততক্ষণে মাথার উপর সূর্য উঠে গেছে। মধ্যাহ্নভোজন শেষে আবারও সবাই জড়ো হয় বাড়ির আঙিনায়। কারণ পরিবেশিত হবে নাটিকা। নিজেদের যাপিত জীবন নিয়ে রচিত নাটিকায় অভিনয়ও করবেন গ্রামের নারীরা। নবান্ন উৎসবের নাচ-গান আর সংলাপে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ সমাজের চিত্র।

দিনভর এত আয়োজন যে বাড়িটি ঘিরে হয়, সেটি স্কুল শিক্ষিকা মমতাজ বেগমের। বারো বছর ধরে তিনি নিয়মিত এ নবান্ন উৎসবের আয়োজন করছেন। এই উৎসবের জন্য আমন ধান ওঠার পর বাড়ি বাড়ি ধান সংগ্রহ করা হয়। কেউ ধান দিতে না চাইলে টাকা দেন। এই ধান আর টাকা দিয়েই হয় আয়োজন।

তবে, এই আয়োজনের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয় মমতাজ বেগমের। এই উৎসবের কারণে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন তিনি। গ্রামের কিছু মানুষ এই উৎসব বন্ধ করার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু দমে যান নি মমতাজ বেগম। তিনি সবাইকে বুঝান এটা এটা বাঙালীর উৎসব।

জীবনের কঠিন সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে মমতাজ বেগম বলেন, 'আমাদের গ্রামটা অনেক ছোট। এক সময় এই গ্রামে একটা ফেরিওয়ালাও আসত না। মাইকের আওয়াজও একরকম নিষিদ্ধ ছিল। এখনও আমরা পূজা, মেলায় যেতে পারিনা। আমি এই সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমাদের গ্রামে এখনো মাইকে কথা বলা নিষেধ। সেখানে আমি গ্রামের নারীদের নিয়ে নবান্ন উৎসব করছি।  তারা সেই উৎসবে গলা ছেড়ে গীত করে। প্রতিবন্ধকতাগুলোকে আমি ধীরে ধীরে মোকাবেলা করেছি। আমার এই লড়াই, গ্রামীণ সংস্কৃতি-ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই। আমি মানুষের জীবন আলোকিত করার জন্য এ কাজ করি।  আমাদের আশপাশের অনেকের জীবন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আমি সেই জীবনে আলো ছড়িয়ে দিতে চাই। তবে, এখনও ভয়ের আশংকা করি। কারণ প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধশক্তি এখনো সক্রিয়।

পিঠা বানানোর কাজে ব্যস্ত দুই নারী। ছবি: সংগৃহীতএ বছর নবান্ন উৎসব হয় গত ১ ডিসেম্বর। উৎসবে জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে কবি-সাহিত্যিক, সরকারি কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কালচারাল কর্মকর্তা ফারুকুর রহমান ফয়সল মনে করেন, প্রতিক্রিয়াশীলদের তৎপরতা যখন আমাদের সংস্কৃতিকে যখন বাধাগ্রস্ত করে। তখন এ ধরণের আয়োজন আশাবাদী করে, উৎসাহিত করে। তিনি বলেন 'নগরায়ণ বা শহর যাই বলি না কেন? সবার আগে আমরা বাঙালি। এ উৎসবগুলো বাঙালির। নিজেকে বাঙালি বললে, এ সংস্কৃতি আমাকে ধারণ করতেই হবে।‘
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মু: জিয়াউর রহমান বলেন 'আমি যদি আমার অতীতকে ভুলে যায়, তবে আমি আর আমি থাকিনা। আমার পরিচয় তো আমার অতীতকে নিয়ে। বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার কৃষ্টি মনে রাখার জন্য কাজ করছে মমতাজ।'

হার না মানা মমতাজ ১২ বছর ধরে সমাজের বিরুদ্ধে নিজের সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম করছেন। মমতাজদের হাত ধরে বাঙাল সংস্কৃতি টিকে থাকবে অনন্তকাল।