একাত্তরের সংগ্রামী নারী কৃষ্ণা রহমান

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী-পেশাজীবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরাও যুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধে যেসব নারীরা অংশগ্রহণ করেন,তাঁদের মধ্যে একজন কৃষ্ণা রহমান। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর আজ সকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মারা যান।  

কৃষ্ণা রহমানের জন্ম খুলনায়। তাঁর জন্ম ১৯৫০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। বাবা তারাপদ দাস বসু, মা রীনা দাস বসু। ছোটবেলা থেকেই তিনি রাজনৈতিক পরিবেশে মানুষ হন। খুলনা পিটিআই স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৬২ সালে তিনি শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়। তবুও তিনি দমে যাননি। আন্ডার গ্রাউন্ডে গিয়েও সক্রিয় থাকেন তিনি।
 
এরপর আসে ১৯৭১ সাল। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ খুলনা শহরে হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকবাহিনী। তাদের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে খুলানার পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে চলে যায়। ওই পরিস্থিতিতে কৃষ্ণা রহমান তাঁর পরিবারের সঙ্গে বাগেরহাটের কাড়াপাড়ায় চলে যান। সেখান থেকে চিতলমারীতে যান। চিতলমারী বাজারে খড়মখালী নামক  জায়গায় থেকে কৃষ্ণা রহমান ২০ দিনের অস্ত্র চালনার ট্রেনিং নেন। 

চিতলমারী ছিল হিন্দু অধ্যুষিত একটি এলাকা। রাজাকাররা হিন্দু বাড়িতে অত্যাচার, লুটপাট, ধর্ষণ করত। তাদের অত্যাচারে এলাকার সবাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাদের ওপর মুক্তিবাহিনীর একটি দল হামলা করে। মুক্তিবাহিনীর সে দলে কৃষ্ণা রহমানও ছিলেন। এতে মুক্তিবাহিনীদের জয় হয়। সেদিন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা রাজাকারদের সব অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়।
 
এরপর কৃষ্ণা রহমান ভারতে চলে যান। ভারতে যাওয়ার স্মৃতি ছিল অনেক কষ্টের। রাস্তায় পড়ে ছিল অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ। জুন মাসে তিনি গোবরা ক্যাম্পে যান এবং সেখানে কাজ শুরু করেন। গোবরা ক্যাম্পে অবস্থানকালে তিনি গোবরা ক্যাম্পের জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি নার্সিং এবং সশস্ত্র প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এ ছাড়া সেখানকার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারীদের দেখাশোনা করার দায়িত্বও ছিল কৃষ্ণা রহমানের।  
 
বিজয়ের পর দেশে ফিরে আবার পড়ালেখায় মনোযোগী হন কৃষ্ণা। ১৯৭২ সালে বয়রা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭৪ সালে খুলনা সিটি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।

দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কৃষ্ণা রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে প্রায় ২ মাস ধরে ভর্তি ছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে আইসিইউতেও চিকিৎসাধীন ছিলেন। আজ সকালে মারা যান তিনি।  দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে কৃষ্ণা রহমানের নাম।