আশাপূর্ণা দেবী, এক আলোর পথের যাত্রী

'এতো আলো পৃথিবীতে, তবু পৃথিবীর মানুষগুলো এতো অন্ধকারে কেন?' একথা যিনি বলেছিলেন, তাঁর নাম আশাপূর্ণা দেবী। কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা। তাঁর পিতা কন্যাকে স্কুলে যেতে দেননি, কারণ মাতৃভক্ত হরেন্দ্র গুপ্তের সাহস ছিল না। তাঁর মায়ের ভ্রান্ত ধারণা ছিল - স্কুলে গেলে মেয়েরা বাচাল হয়! তবে স্কুলে না গেলেও বাড়ির যে ঘরটিতে দাদাদের পড়াশোনা চলত, সেই ঘরে বসে তাদের পড়া শুনে শুনেই পড়তে শিখেন আশাপূর্ণা। এ ছাড়া বাড়িতে থাকা ভারতবর্ষ, বঙ্গদর্শন, বসুমতি, সবুজপত্র, সন্দেশ ইত্যাদি পত্রিকাসহ বিখ্যাত লেখকের বই পড়ে ফেলেছিলেন তিনি। সেজন্য স্কুল-কলেজে যেতে না পারলেও বাড়ির লাইব্রেরির বই, সাময়িকী ও  দৈনিক পত্রিকার পাতা তাঁর চোখের সামনে একটা বিশাল জানালা খুলে দিয়েছিল।

 সেই জানালা দিয়ে যে আলো-হাওয়া প্রবেশ করত, তাতেই আশা বুঝেছিলেন, ভালো থাকার জন্য মানুষের মনের অন্ধকার দূর করা কত প্রয়োজন। কিন্তু এই সংসারের কুটিল অন্ধকার, জটিলটা মানুষকে আলোর পথে যেতে দেয় না। তাইতো তিনি বলেন, 'সংসার মানুষকে চেপে পিষে ফেলে, বিশেষ করে মেয়ে মানুষকে। তার ভেতরকার যা কিছু মাধুর্য, যা কিছু কোমলতা, যা কিছু ছাঁচ, সব যেন ঘষে ক্ষয়ে ভোঁতা করে শুকিয়ে ধুলোবালি করে ছেড়ে দেয়।' তবে সকল নারীর ভেতরকার মাধুর্যকে যে ভোঁতা করে দেওয়া যায় না, আশাপূর্ণা নিজেই তার প্রমাণ।

পনেরো বছর বয়সে আশার বিয়ে হয়েছিল এক রক্ষণশীল পরিবারে। কিন্তু সংসার, রান্নাঘর আর আঁতুড়ঘর তাঁর প্রতিভাকে দমাতে পারেনি। সংসারের কাজ করতে করতেই তিনি লিখতেন। অসংখ্য বই তিনি লিখেছেন। উপন্যাস ও ছোটগল্পে তিনি নারী জীবনের সুখ- দুঃখ, যন্ত্রণা, বৈষম্য- বঞ্চনা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নিটোল চিত্র এঁকেছেন। নিজের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের জীবন তাঁর উপন্যাসে চরিত্র হয়ে উঠেছে। তাঁর ঠাকুরমার সঙ্গে 'সুবর্ণলতা' উপন্যাসের সুবর্ণলতার ঠাকুরমা কিংবা শাশুড়ির চরিত্রের কিছু মিল আছে। উপন্যাসে যেমন দেখা যায় সুবর্ণলতার ঠাকুরমা ও তাঁর শাশুড়িকে পিতৃতন্ত্রের একজন প্রবল প্রতিনিধি হিসেবে।  তাঁরা সেখানে নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে কথা বলেন। আশাপূর্ণা তাঁর লেখনী ও  চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে এই জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন।

  সুবর্ণলতাকে তাঁর মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ঠাকুমা বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই অপমানে সুবর্ণলতার মা সত্যবতী সংসার ত্যাগ করেন। সুবর্ণলতা উপন্যাসের কাহিনীতে যে সময়ের উল্লেখ আছে, সে সময় একজন নারীর সংসার ত্যাগ মানে ধৃষ্টতা। কিন্তু সত্যবতী সেই  ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলেন।  সংসার ত্যাগ করে শিক্ষকতার জীবন বেছে নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচেছিলেন। যদিও সুবর্ণলতাকে সারাটা জীবন তাঁর মায়ের কুলত্যাগের জন্য নিন্দার কাঁটা সহ্য করতে হয়েছে। তবু সুবর্ণলতাও আজীবন লড়েছেন সংসারের কুপমন্ডকতার বিরুদ্ধে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে।

নারীর জীবনে দরকারি আলো-হাওয়ার প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের জন্য চাই একটা খোলা বারান্দা। তাই উপন্যাসে নতুন বাড়ি তৈরির সময় সুবর্ণলতা তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, 'একটা দক্ষিণের বারান্দা চাই-ই চাই।' আর তার শাশুড়ি মুক্তকেশী সেকথা শুনে বলেছিলেন, 'জম্মে শুনিনি বাপু কোনো মেয়েমানুষ বলতে পারে চাই-ই চাই।' কিন্তু আশাপূর্ণা সুবর্ণলতার মুখ দিয়ে সে কথা বলিয়ে ছেড়েছেন।

আশাপূর্ণা শতাধিক বই লিখেছেন, অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু তা মোটেই সহজ ছিল না। অনেক কন্টকাকীর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই তিনি নিজে সফল হয়েছেন এবং উত্তরসূরিদের জন্য আলোর পথ তৈরি করে গেছেন। আজ ৮ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এই আলোকিত নারীর প্রতি।