আজ ১২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাবিদ, নারীনেত্রী হেনা দাসের জন্মদিন। এ বছর হেনা দাসের জন্মশতবার্ষিকী। হেনা দাসের জন্ম ১৯২৪ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি। আর মৃত্যু ২০২০ সালের ২০শে জুলাই। এই ৮৬ বছরের দীর্ঘ সময়ে তিনি বিপুল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
হেনা দাসের কর্মজীবন শুরু হয় মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে প্রভাবিত হন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি গার্লস গাইডে যুক্ত হন। কিন্তু ইউনিয়ন জ্যাক উড়িয়ে ডেপুটি কমিশনারের স্ত্রীকে স্যালুট জানিয়ে ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে হবে বলে তিনি গার্লস গাইড ছেড়ে দেন। সে সময় প্রতিবাদের এমন দৃঢ়তার কথা ভাবা যায় না। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে ছাত্রীদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন। তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে কমিউনিস্ট পাটির সদস্য হন। এরপর কৃষক নারীদের সংগঠিত করতে চলে যান গ্রামে। গ্রামে কৃষক পরিবারে থেকে নারীদের সংগঠিত করেন।
অথচ তিনি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলেন। তাঁর পরিবারে ঐশ্বর্য, সুখ ও প্রতিপত্তি সবই ছিল। দাদু ছিলেন লাখাই নরপতির জমিদার। পুত্রহীন জমিদারের তিন কন্যার জ্যেষ্ঠ মনোরমা দত্ত ছিলেন হেনা দাসের মা। বাবা রায় বাহাদুর সতীশ চন্দ্র দত্ত প্রথিতযশা আইনজীবী এবং প্রাদেশিক পরিষদের এমএলএ। সেই পরিবারের কনিষ্ঠা কন্যা হেনা ম্যাট্রিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন প্রথম বিভাগে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিজেকে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাব্য সুযোগ ছেড়ে শহুরে জীবনের মায়া ছেড়ে চলে যান প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক বাড়িতে।
হেনা দাস বিশ্বাস করতেন, সকল মানুষের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সমমজুরি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তাই আজীবন তিনি বিপ্লবের পথেই থেকে যান।
১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে মানুষের অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে। সমাজে দেখা দেয় নানা রকমের অসঙ্গতি। যার প্রভাব পড়ে নারীদের ওপর। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠা হয় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। হেনা দাস তখন সিলেটে আত্মরক্ষা সমিতি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী ভূমিকা নেন।
এরপর হেনা দাস হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গণনাট্য সংঘের কার্যক্রমে নিজেকে যুক্ত করেন। যুক্ত হন চা শ্রমিক আন্দোলনে। দেশভাগের পর পরিবারের অনেকেই দেশত্যাগ করলেও হেনা দাস ও তাঁর বড় ভাই বারীন দত্ত থেকে যান পূর্ব পাকিস্তানে। সে সময় অনেককেই আত্মগোপনে থেকে কাজ করতে হয়। ১৯৪৮ সালে হেনা দাস কৃষক আন্দোলনের নেতা রোহিনী দাসকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর আত্মগোপনে থেকে রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রত্যক্ষ রাজনীতি ছেড়ে প্রথমে ঢাকায় পরে নারায়নগঞ্জে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের বহুমুখী সমস্যা দেখে শিক্ষক আন্দোলনে যুক্ত হন।
দীর্ঘদিন পর তিনি আবার পড়ালেখা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ প্রথম পর্ব এবং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৪৮ - ১৯৪৯ এ তিনি নানকার আন্দোলনে নারীদের সংগঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুফিয়া কামালের মৃত্যুর পর তিনি মহিলা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু মহিলা পরিষদে নেতৃত্ব দেন। এ সময়কালে তিনি নারী আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে হেনা দাস তাঁর আন্দোলনমুখী কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘রোকেয়া পদকে’ সম্মানিত হন।
হেনা দাসের লেখা গ্রন্থগুলোর মাঝে ‘চার পুরুষের কাহিনী’ অন্যতম। আত্মজীবনীমূলক হলেও গ্রন্থটি শুধুই তাঁর আত্মকথন নয়। গ্রন্থটি তাঁর চার পুরুষের সময়ের সমাজ–রাজনীতি ও ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল।
হেনা দাস জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আশাবাদী থেকে মুক্তির যে দীপশিখা জ্বালিয়ে গেছেন, তাঁর জন্মের শতবর্ষে এসেও সেই অনির্বাণ শিখা অগণিত মানুষের অন্তরে প্রজ্বলিত আছে। যতদিন মানবমুক্তির লড়াই চলবে, চিরঞ্জীব হেনা দাসের নাম ধ্বনিত হবে সেই লড়াইয়ের মিছিলে।