বেড়ে উঠছে ‘সমুদ্র বই উৎসব’, পথ দেখাচ্ছে সাগরপারের ইস্টিশন

সাগরপারে বই উৎসব। একটু অবাক হলেন কি? না, অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। সমুদ্র রক্ষার আহ্বান জানিয়ে ভাষার মাসে কক্সবাজার লাবণী সৈকতে চলছে ‘সমুদ্র বই উৎসব’। এই উৎসব সাগরপারের সৃজনশীল মানুষদের মধ্যে এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ বইমেলা চলবে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই উৎসবে দ্যু, অক্ষরবৃত্ত, ইকরি মিকরি, প্রগতি পাবলিশার্স, নন্দন প্রকাশন, বিদ্যানন্দ প্রকাশন, খড়িমাটি, চন্দ্রবিন্দু, ইস্টিশনসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে ১১টি প্রকাশনী অংশগ্রহণ করছে। বইমেলা থেকে পাঠকেরা ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ ছাড়ে বই কিনতে পারছেন।

সমুদ্র বই উৎসব  
‘ইস্টিশন’ একটি প্রকাশনা সংস্থা।  ‘ইস্টিশন’–এর উদ্যোগে শুরু হয়েছে এই ‘সমুদ্র বই উৎসব'। ইস্টিশন এ বছর ৪ পেরিয়ে ৫–এ পা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে মাসজুড়ে আয়োজন থাকে ইস্টিশনের। ‘সমুদ্র বই উৎসব’ সে আয়োজনেরই একটি অংশ। গত তিন বছর ধরে নিয়মিতভাবেই এ বইমেলা হয়ে আসছে। ২০২২ সালে লাবনী মোটেলের মাঠে প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় মাত্র তিনটি প্রকাশনা সংস্থা। ২০২৩ সালে প্রাণ-প্রকৃতির দায়বদ্ধতা থেকে সমুদ্র রক্ষায় সমুদ্র শহরেই দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ‘বই উৎসব’। সে বছর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে ১০টি প্রকাশনা সংস্থা বইমেলায় অংশ নেয়। এ বছর সমুদ্র রক্ষার আহ্বান জানিয়ে লাবনী সমুদ্র সৈকতে চলছে সমুদ্র বই উৎসব। এবার ‘ইস্টিশন’–এর প্রথম বই লেখক নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের মুক্তগদ্যের বই– ‘শোনো এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয়’ প্রকাশ করা হয়। এই বই উৎসবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। এ ছাড়া থাকছে কথা গান, কবিতায় ভরা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পাশাপাশি সচেতনতা বিষয়ক পাপেট শো, ছোটদের গল্পবলা আসর, ভ্রমণ আড্ডা, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং একুশে ফেব্রুয়ারিতে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

সাগরপাড়ে বই উৎসব। ছবি: সংগৃহীত

ইস্টিশন মাস্টার
মানুষে মানুষে সেতু গড়তে চান ইস্টিশন মাস্টার অনুরণন সিফাত। ‘ইস্টিশন’–এর মূল দায়িত্বে আছেন তিনি। সিফাতের জন্ম বান্দরবানের লামা উপজেলায়। ‘সুখ’ ও ‘দুঃখ’ নামের দুই সহোদরা পাহাড়, আর মাতামুহুরী নদীর জল-হাওয়া ছুঁয়ে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চলে যান চট্টগ্রামে। এরপর মাধ্যমিক শেষ করে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হন। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের হোস্টেলের ভিপি নির্বাচিত হন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেন। চট্টগ্রাম ছিল তাঁর কাছে জতুগৃহের মতো। সিফাতকে চট্টগ্রাম শহর দিয়েছে অদম্য সাহস। শিরদাঁড়া উঁচু করে তাঁকে যুদ্ধ করতে শেখায় এ শহর।

শুরুর গল্প  
চাকরির সুবাদে ২০১৮ সালে কক্সবাজারে যান সিফাত। একটু খেয়াল করে দেখলেন, কক্সবাজারে রেস্টুরেন্ট ,হোটেল আছে; কিন্তু সৃজনশীল বইয়ের দোকান নেই। গাইড বই আর পাঠ্যবইয়ের দোকান আছে। তবে, সেসব দোকানের কর্নারে ছিল গল্পের বই বিক্রির স্থান। তাই ছোট পরিসরে ইস্টিশনের কাজ শুরু করেন। শুরুতে হাসপাতাল সড়কে ছোট্ট একটা জায়গায় গড়ে ওঠে ইস্টিশন, যা পরে সাহিত্যপ্রেমী, সমমনা মানুষের মিলনস্থলে পরিণত হয়। এর দুই বছর পর লাবনী সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি চলে যায় ইস্টিশন। সাগরপারেই গড়ে ওঠে সৃজনশীল বইয়ের দোকান ‘ইস্টিশন’।

শৈশবের স্বপ্ন
শৈশব থেকে মানুষের কল্যাণে কিছু না কিছু করার ইচ্ছে ছিল সিফাতের। ছোটবেলা থেকে এমন কিছু একটার স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে মানুষ একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবে, যেখানে মন খুলে কথা বলা যাবে। বলা যায়, ছোটবেলার তৃষ্ণা থেকে ‘ইস্টিশন’–এর জন্ম। সিফাত বলেন, ‘আমরা সবই করছি, কিন্তু একজন আরেকজনের সঙ্গে ঠিকঠাক কথাটা বলছি না। আমার স্বপ্নের একটা বিষয় ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষ কথা বলুক। আর কিছু না হোক, অন্তত একে অপরের সঙ্গে আড্ডাটা দিক। এখন কথা হতে পারে, তাহলে বইয়ের দোকান বা বইকেন্দ্রিক কেন? আমি চেয়েছি মানুষ বই পড়ুক, বইয়ের গন্ধ নিক, বইয়ের সঙ্গে থাকুক।’

বই কিনেছেন ক্ষুদে এক পাঠক। ছবি: সংগৃহীত

দিন বদলের স্বপ্ন 
কক্সবাজারে অবস্থান করে প্রকাশনার কাজ করা অনেক চ্যালেঞ্জিং বিষয়। মূলধারা থেকে দূরে হওয়ায় প্রকাশনার কাজের সবকিছুতেই বাড়তি খরচ গুনতে হয়। ছাপাখানার কাজ শেষ করতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই কঠিন পরিস্থিতিতে গত চার বছর ধরে ‘ইস্টিশন’ বই বিপণনের কাজ করছে। এখানে রয়েছে একটি পাঠাগার কর্নার। যেখানে সদস্য হলে বাসায় বই নিতে পারা যায়। কক্সবাজারে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের কাজ করে আসছে ইস্টিশন। ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে সিফাত বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে খুব বই পড়তাম। কলেজ অবধি একপাতা বই না পড়লে, সে রাতে ঘুম হত না। এরপর সময়ের সঙ্গে বইপড়া কমেছে, কিন্তু বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। যারা বই পড়েন, তাদের নিজেদের মধ্যে ভীষণ সুন্দর একটা জগৎ তৈরি হয়। আমি মনে করি এই জগতের সন্ধান পাওয়াটা প্রত্যেকটা মানুষের দরকার। সেই জায়গা থেকেই আসলে ‘ইস্টিশন’–এর জন্ম। আসলে ইস্টিশন শুধু বইয়ের দোকান নয়, একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান, যা কাজ করবে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে। ইস্টিশন আমার কাছে দিন বদলের হাতিয়ার। একটি স্বপ্ন।’

টিকে থাকার লড়াই 
আমাদের এই সমাজে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করতে গিয়ে নারীদের অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রকাশনার জগৎ তার ব্যতিক্রম নয়। একজন নারী প্রকাশক হিসেবে সিফাতকে সমুদ্র পারে কাজ করতে গিয়ে শুনতে হয়েছে অনেক কটু কথা। শুরুর দিকে কেউ কেউ বই পাঠাতে চাইতেন না। অনেকে আবার মনে করতেন, একা একটা নারী কাজ করছে, কতদিনই–বা প্রকাশনার জগতে টিকে থাকতে পারবে। অনেকেই নারীদের ইস্টিশনকেন্দ্রিক আনাগোনা এবং মুক্ত আড্ডাকে বক্র চোখেও দেখেছেন। কটূক্তি করে অনেকে বলেছেন, ‘একা মেয়ে, বাইরে থেকে এসে নাকের ডগায় ব্যবসা করছে। কতদিন টিকতে পারে দেখি।’

নিজের দুঃখের কথা বলতে গিয়ে সিফাত বলেন, ‘রাস্তা সম্প্রসারণের কথা বলে প্রথম আউটলেটটি বিনা নোটিশে তুলে দেওয়া হয়। সেবার অনেক বই, প্রয়োজনীয় দলিল বাঁচাতে পারিনি। প্রায় তিন মাস বন্ধ রাখতে হয়েছিল ইস্টিশনের কার্যক্রম। নতুন আউটলেটটিতেও একবার ঠুনকো ছুতো ধরে চেয়ার, টব ভেঙে দেয় একদল লোক। আসলে নারীদের মনোবল হারালে চলবে না। শক্ত করে নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সবচেয়ে জরুরি, নিজের একটা বলয় তৈরি করা। পাছে লোকে কিছু বলে—এই কথা মাথায় নিয়ে বসে থাকার সময় না।’

‘সমুদ্র বই উৎসব’ চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছবি: সংগৃহীত

শিশুদের জন্য বীজতলা 
একটা চিহ্ন রেখে যেতে চান সিফাত। তাই প্রকাশনার জগতে ভালো লেখার ওপর জোর দিতে দেন। বিষয়বস্তু, লেখার মান—সেসব মাথায় রেখেই কাজ করতে চান। নারী ও তরুণ লেখকদের নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করতে চান। আর শিশুদের জন্য অনেক বেশি কাজ করতে চান। সিফাত মনে করেন, মানুষের মননের জায়গাটা তৈরি হওয়ার জন্য শৈশব ও কৈশোরের সময়টা খুব জরুরি। এই সময় তাদের মাঝে বইপাঠের অভ্যাসটা একবার ঢুকিয়ে দিতে পারলেই ভবিষ্যতের জন্য একটা সুন্দর বীজতলা তৈরি হবে। একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য এটুকু প্রয়োজন। তাই শিশুদের নিয়ে আলাদা সেগমেন্টে কাজ করতে চান সিফাত।