কুমুদিনী হাজং: টংক আন্দোলনের শেষ বীরের প্রস্থান

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তলদেশে বিজয়পুর সীমান্তের দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেরাতলি গ্রাম। এই গ্রাম থেকে খাজনা প্রথা বিলুপ্তির গণজাগরণ হয়েছিল যাঁর মৃত্যুতে, সেই রাশিমণি হাজংয়ের স্মৃতি ধরে রেখেছিলেন কুমুদিনী হাজং।

এ এলাকায় কুমুদিনী হাজংয়ের কাছে মানুষ শুনতে আসতেন টংক প্রথা বিলুপ্তির ইতিকথা। সেটা ১৯৪৬ সালের কথা। তখনও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি। কমরেড মণি সিংহ ভারত থেকে দুর্গাপুরে মামার বাড়িতে চলে আসেন। মামাবাড়িতে দরিদ্র কৃষকেরা জানতেন না তিনি কে? তাঁর কাছে কৃষকেরা বলতেন সব অত্যাচার,অনাচার, দুঃখ, কষ্টের কথা। অতঃপর কমরেড মণি সিংহ হাজং ও কৃষকদের নিয়ে শুরু করেন টংক প্রথা বা ধান কড়াড়ি খাজনা বাতিল আন্দোলন।

এ আন্দোলনে যোগ দেন সীমান্তের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের লঙ্কেশ্বর হাজং, রাশিমণি হাজংসহ অন্যান্যরা। এরই জেরে সে বছরের ৩১ জানুয়ারি লঙ্কেশ্বর হাজংসহ বেশ ক’জন হাজং বিদ্রোহী নেতাকে ধরতে ব্রিটিশ ফন্ট্রিয়ার পুলিশ যায় বহেরাতলী গ্রামে।

তাদের না পেয়ে লঙ্কেশ্বর হাজংয়ের সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কৃষকদের সভা চলাকালে এ খবর রাশিমণি হাজংয়ের কাছে পৌঁছালে তিনি ছুটে যান কুমুদিনী হাজংয়ের বাড়িতে। পুলিশের সঙ্গে চলে লড়াই। এক পর্যায়ে পুলিশের বন্দুকের গুলিতে তিনিসহ দুজন হাজং নেতার মৃত্যু হয়। তবে প্রাণে বেঁচে যান কুমুদিনী হাজং। এরপর তাঁকে ঘিরেই আন্দোলন ভয়ংকর রূপ নেয়। 

টংক আন্দোলনের নেতা লঙ্কেশ্বর হাজং ও তাঁর স্ত্রী কুমুদিনী হাজং—দুজনই সংগ্রামী মানুষ ছিলেন। টংক-তেভাগা-নানকার—যে কোন আন্দোলনই স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আলাদা কিছু নয়। এক একটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষ বুঝতে শিখেছে সংগ্রাম ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব না। সেদিক থেকে টংক আন্দোলন বাংলার কৃষকদের অধিকার আদায়ের অন্যতম আন্দোলন। উত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং ১৯৫০ সালে টংক প্রথা ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সমাপ্তি হয়। তেভাগা, নানকার, নাচোল কৃষক আন্দোলনের মতো এটিও ছিল কৃষকদের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক আন্দোলন।

কুমুদিনী হাজং এই আন্দোলনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। সুসং -দূর্গাপুর এলাকার হাজংরা এই আন্দোলন করেন। এ সময় তাদের ওপর অত্যাচারও হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কোন সাহায্য–সহযোগিতা পাননি। কুমুদিনী হাজংও তার বাইরে ছিলেন না। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনামলের ঐতিহাসিক টংক আন্দোলন ও হাজং বিদ্রোহের সাক্ষী ছিলেন কুমুদিনী হাজং। 

নেত্রকোনার দুর্গাপুর সীমান্তে কুমুদিনীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহেরাতলী গ্রামের গাছগাছালিতে ভরা পাহাড়ি টিলায় থাকতেন মেজ ছেলে অর্জুন হাজংয়ের সঙ্গে। ২০০০ সালে কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বরের মৃত্যুর পর তিনি একা হয়ে যান। তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে লমিন হাজং থাকেন একটু দূরে, বিজয়পুরের গুচ্ছগ্রামে। ছোট ছেলে সহদেব হাজং মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতে চলে গেছেন। বড় মেয়ে মেনজুলি হাজং মানিকগঞ্জে ও ছোট মেয়ে অঞ্জুলী হাজং থাকেন ঢাকায়।

গত শীতে মানে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বহেরাতলীর বাড়িতে তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়। বয়সের ভারে ভেঙে পড়েছিল শরীরটা। চোখে কম দেখতেন, কানেও শুনতেন কম। অনেকটাই ইশারায় কথা বলতেন। তবুও মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। সাদা কাপড় পরে মণি মেলার মিছিলে হেঁটে গিয়েছেন। বিনয়ী, মাতৃসম এই নারীর আত্মদান ও  অবদান কোন মতেই ভুলবার নয়।  

কমরেড মণি সিংহের মতো কিংবদন্তী কমিউনিস্ট নেতার সান্নিধ্য পেয়েছেন কুমুদিনী। ফলে আন্দোলন–সংগ্রাম ছিল তাঁর জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। আদিবাসী হাজং পরিবারেও কুমুদিনী হাজং আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।  

টংক আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কুমুদিনী হাজং ছিলেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি ১৯২২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আর গতকাল তাঁর মৃত্যু হলো।

মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি এ কথা বুঝিয়ে গেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে পুরো জীবন আন্দোলন–সংগ্রাম করেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। এই মহিয়সী নারী ছিলেন মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের একজন সংশপ্তক। তাঁর লড়াই মানুষকে পথ দেখাবে দিনের পর দিন।