‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ’
ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই গানের সম্পর্ক অনেক গভীর। ঈদ সামাজিক উৎসব। ঈদের মতো পয়লা বৈশাখ, পূজা, বড়দিনও আমাদের সামাজিক উৎসব। নিজেদের মধ্যে সুখ–দুঃখ ,আনন্দ ভাগাভাগির মাধ্যমে পালিত হয় এ সামাজিক উৎসব। এসব সামাজিক উৎসব মানুষ ধর্মনির্বিশেষে পালন করে থাকে। মানে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।
তবে যুগের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আচার–আচরণ, রীতিনীতির পরিবর্তন ঘটেছে। তাই এখনকার ঈদের সঙ্গে ষাট বা সত্তর অথবা আশির দশকের ঈদের রীতিনীতির পার্থক্য থাকতে পারে। কেমন ছিল সেই সময়কার ঈদ? বাংলাদেশের নাগরিক মানচিত্রে নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলা সত্তরোর্ধ্ব তিন নারীর সামনে এ প্রশ্ন রাখতেই উঠে এল নানা জানা–অজানা দিক। এই কালে বসে হওয়া সেই আলাপের সূত্র ধরে তাঁদের চোখে ঘুরে আসা গেল সেকালে। উঠে এল তাঁদের শৈশবের ঈদ ঘিরে নানা স্মৃতি।
এখনকার ঈদ আর আমার শৈশবের ঈদের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে যেমন ব্যক্তি জীবনের পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি আবার যুগেরও বদল হয়েছে। শৈশবের ঈদের যে বিষয়গুলো মনে অনেক আনন্দ দিত, এখন তো সেসব বিষয় চোখে পড়ে না।
যখন ছোট ছিলাম, তখন ঈদে শুধুই আনন্দ করতাম। তবে বর্তমানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে। ঈদ তো একটা সামাজিক অনুষ্ঠান। আমাদের সময় ঈদের একটা সর্বজনীন বিষয় ছিল। মানে সকলে মিলে সামাজিকভাবে ঈদ পালন করতাম। আমার শুরুর শৈশব কেটেছে বর্ধমানে, দাদা–দাদির সঙ্গে। ঈদের সময় আমরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের বাসায়ও পাড়ার ছেলেমেয়েরা আসত। ঈদে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ কাজ করত। এখন কিন্তু সেই পাড়া বেড়ানোর বিষয়টা চোখে পড়ে না। ছোটবেলায় ঈদের জামা কাউকে দেখতে দিতাম না। তবে অন্যের বাসায় গিয়ে তাদের ঈদের কাপড় দেখার চেষ্টা করতাম। এটার মধ্যে অন্য রকমের ভালো লাগা কাজ করত। আবার ঈদের দিন পাড়ার বড় বোনদের কাছে সাজতে যেতাম। এই বিষয়টা এখনকার ছেলেমেয়েরা করে না।
আমি ছোটবেলায় দেখেছি ঈদের অনুষ্ঠানে সব ধর্মের মানুষেরা অংশগ্রহণ করতেন। মানে একটা পরিবারের আশপাশে যারা থাকতেন, তাদের সবাইকে নিয়ে ঈদের অনুষ্ঠান পালন করা হতো। এখন এই সামাজিকতা অনেকাংশে কমে এসেছে। এখন ঈদে আনুষ্ঠানিকতা বেশি পালন করা হয়। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের একটা করে জামা দেওয়া হতো। এখন তো একটা জামাতে অনেকের মন ভরে না। ঈদের তিনদিনই পরে নতুন নতুন জামা।
এখন সমাজে অনেক বেশি প্রাচুর্য চলে এসেছে। ঈদের আনন্দের চেয়ে এই প্রাচুর্য অনেক বেশি দৃশ্যমান। মানে আনন্দের চেয়ে প্রদর্শনটা বেশি হচ্ছে। এখন ধর্মীয় আচার–আচরণের দিকে মানুষ বেশি ঝুঁকে পড়ছে। ছোটবেলায় ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’—এই গানটা যখন কানে আসত, তখন কিন্তু সত্যি সত্যি অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করত। এখন কিন্তু এই গানটা আমাদের বাচ্চারা শুনতেও চায় না। এখন তো দেখি অনেকেই ঈদের ছুটিতে দেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে ঘুরতে যায়। এতে পারিবারিকভাবে ঈদ পালনের বিষয়টা অনুপস্থিত থাকে। তাই বলতে হয়, সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির ঈদের যে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, তা এখন চোখে পড়ছে না।
মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঈদের কথা। সে বছর ঈদ করেছি আগরতলার শরণার্থী শিবিরে। যুদ্ধের বছরে যার যতটুকু ছিল, সেটা নিয়ে সবাই মিলে ঈদ করেছি। একটা কথা বলতে হয়, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে ঈদ করাটা যুদ্ধের সময়ও ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরে এই বিষয়টা কিছুটা কমে এসেছে। সকলে মিলে আনন্দ করাটাই ঈদের মর্মবাণী। কিন্তু এই মর্মবাণী এখন খুব একটা চোখে পড়ে না।
যুগের সাথে আসলে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটে। তাই শৈশবের আর এখনকার ঈদের মধ্যে তো অনেক পার্থক্য থাকবে। একটা হলো বয়সের পার্থক্য। আমরা ছোটবেলায় অনেক আনন্দ আর মজা করে ঈদ পালন করতাম। এখন তো আনন্দ করার বয়সটা নেই। এর বাইরে যুগের পরিবর্তন হয়েছে। প্রযুক্তির কারণে মানুষের জীবনযাপনেরও পরিবর্তন এসেছে।
আমাদের ছোটবেলায় ঈদের আনন্দের যে বিষয়টা ছিল, সেটা কিন্তু এখন আর নেই। আমাদের ছোটবেলায় টিভি, মোবাইল ছিল না। শৈশবে আমরা ভাইবোন, পাড়া–প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঈদের সময় কাটাতাম। ঈদের চাঁদ দেখার পর মা সারা রাত ধরে ঈদের প্রস্তুতি নিতেন। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন জামা পরে পাড়া বেড়াতে যেতাম। সে সময় আজকের মতো এত বেশি ঝকমকে আর স্টাইলিশ পোশাক ছিল না। আমরা ঈদে একটামাত্র নতুন পোশাক পেতাম। আমার মনে আছে, আমরা দুই ঈদে মিলে একটা নতুন জামা পরতাম। নতুন পোশাক পরার মধ্যে আনন্দও ছিল।
আমার শৈশব কেটেছে করাচিতে। তাই সেখানে আত্মীয়স্বজন ছিল না। যে কারণে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যেতাম। ঈদের দিন পড়ালেখা করতে হতো না। সন্ধ্যায় পড়তে না বসলে বকা খাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এভাবে ঈদের সময়টা খুব আনন্দে কাটাতাম।
আমাদের ছোটবেলার ঈদে এখনকার ঈদের মতো অতিরিক্ত টাকা খরচ করা, অতিরিক্ত কাপড়চোপড় কেনার প্রচলন ছিল না। এখনকার মানুষের জীবনে ব্যস্ততা অনেক বেশি। পরিবারের সঙ্গে না থেকে, থাকে দূরে দূরে। আগে তো সবাই কাছাকাছি জায়গায় থাকত। আগে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে খুব একটা সমস্যা হতো না।
এখন দেখি ঈদের সময় অনেকেই দেশে ও দেশের বাইরে বেড়াতে যায়। এভাবে ঘুরতে যাওয়াটার মধ্যে মনে হয়, ঈদের মূল বিষয়টা থাকে না। ঈদের সময় ঘুরতে গেলে তো পরিবারের যে একটা বন্ধন, সেটা তো আর থাকে না। ঈদকে এখন মনে করা হয় ছুটি। তাই ছুটিতে বেড়াতে যাওয়া হয়। ঘুরতে গিয়ে তারা হয়তো আনন্দ করছে, কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যে ঈদের আমেজটা থাকে না। ঈদের আমেজ হলো—পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু–বান্ধবদের সঙ্গে এক ধরনের সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। ঘুরতে গেলে যেটা অনুপস্থিত থাকে।
আবার এখনকার মতো নতুন চকচকে টাকা দেখানোর যে রীতি চলছে, সেটা আমাদের সময় ছিল না। এখন তো দেখি রমজানের পুরো মাস লোক দেখানোর একটা বিষয় থাকে। এই প্রদর্শনের বিষয়টা আমাদের সময় ছিল না।
আমাদের ছোটবেলায় মানুষের জীবন ছিল অনেক সহজ। মানুষের চাওয়া–পাওয়া, চাহিদা অনেক কম ছিল। কোনটা দামি আর কোনটা কমদামি পোশাক—এটা আমাদের মাথায় কাজ করত না। এখন মানুষ যত পাচ্ছে, তত বেশি তার চাহিদা বাড়ছে। এখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমেছে, যেটা আমাদের সময় অনেক বেশি ছিল। এখন আমরা এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। পাশের ঘরের মানুষটি কেমন আছেন, জানতে চাচ্ছি না। এখনকার মানুষের জীবন টিভি, মোবাইল মানে নিজেদের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা ঈদে সময় মোবাইল, ল্যাপটপে সময় কাটায় বেশি। তারা নিজেদের মধ্যেই থাকতে বেশি পছন্দ করে।
ঈদ আনন্দ, ঈদ মানে উৎসব। মনকে প্রসারিত করার জন্য সকলের সঙ্গে মিলেমিশে ঈদ পালন করা উচিত।
আমার শৈশব কেটেছে তথাকথিত মফস্বল শহর সিলেটে। সিলেট শিক্ষার আলোয় আলোকিত; তবুও একটা রক্ষণশীল একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য ছিলাম আমরা। সে সময় চাচা-চাচি, ফুপু-ফুপি, ভাইবোনেরা মিলে ঈদ পালন করতাম। তাই তখন একটা নির্ভেজাল আনন্দ ছিল। শৈশবের ঈদের সেই আনন্দ এখন আর দেখি না। এখন সবাই যার যার মতো করে নিজেদের বাড়িতে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ঈদ পালন করে। এখন একক পরিবারের সংখ্যা বেশি। তাই আমার শৈশবের ঈদের আনন্দকে এখন আর খুঁজে পাই না।
আগের দিনে যেটুকু রান্না হোক, সেটা হোক সেমাই, হালুয়া, বরফি, পোলাও, কোরমা—যেটাই হোক না কেন, সবাই মিলে তা একসঙ্গে খেতাম। সেখানে দাওয়াতের কোনো বিষয় ছিল না। এখন কিন্তু কেউ কারও বাড়িতে খেতে যাবে বললে, মোটামুটি একটা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় চলে আসে।
আরেকটি বিষয় ছিল, সেটা হলো ঈদে কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা যেমন—মণিপুরি, হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধুরা কিন্তু আগে থেকে বলে রাখত, ঈদের সেমাই খেতে আসবে, সব সেমাই যেন খেয়ে শেষ করে না ফেলি। এই বিষয়গুলো এখন কিন্তু খুব একটা শুনি না। এখন কষ্ট লাগে এই ভেবে যে, আমাদের সামাজিক উৎসব এখন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, আমাদের সময়ে যখন রথযাত্রা হতো, তখন আমরা সবাই রথের পেছনে ছুটে যেতাম। হিন্দুর সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান বলে দূরে সরে থাকিনি। এই শৈশবটা মানে, ধর্মের সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, এটাকে এখন অনেক বেশি মিস করি। এখন ধর্মটা অনেক ক্ষেত্রে লোক দেখানো হয়ে গেছে। কে কত ইফতারের পার্টি করলেন, কে কত জামা–কাপড় বিলিয়ে দিলেন—এটাই বেশি চোখে পড়ে।
এখন ঈদ, পূজা-পার্বণ, পয়লা বৈশাখ—সব অনুষ্ঠান এক ধরনের বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে। সবকিছু নিয়ে বাণিজ্য চলছে। সেটা বিউটি পার্লার থেকে শুরু করে শপিং মলের উপচে পড়া ভিড় পর্যন্ত। আমাদের শৈশবে এসব বাণিজ্য ছিল না।
এখনকার ঘরে কয়টা জামা–কাপড় কেনা হলো, সেটা সবচেয়ে বড় বিষয়। আর আমাদের সময় বাবা-মায়েরা একটা জামা আমাদের কিনে দিয়েছেন, তাতেই আমরা মহাখুশিতে ছিলাম। তারপর কেউ কাউকে নতুন জামা দেখাতাম না। রাতে জামা লুকিয়ে রাখতাম। আর সকালে নতুন জামা পরে বাইরে ঘুরতে যেতাম। এই যে একটা নির্ভেজাল আনন্দ, যেখানে বাণিজ্যিকতার কোনো ছোঁয়া নেই, মা–বাবা যা দিলেন, তা নিয়ে খুশি থাকতাম। এটা এখন আর দেখি না। এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশি। বাবা-মা নতুন পোশাক কিনে দিতে পারবে কিনা, সেটা একবারের জন্যও ভেবে দেখে না। এসব মূল্যবোধের অবনতি বলে মনে হয়। সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার প্রচলন এখন নেই বললেই হয়।
আমাদের সময়ে আমরা ঈদের চাঁদ দেখার জন্য বাড়ির উঠানে বসে থাকতাম। তখন তো টিভি, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। এটা বলছি ৬০ দশকের শুরুর কথা। তখন ছিল রেডিও। রেডিওতে সব শুনতাম। এখন মানুষ টিভি খুলে বসে থাকে। অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আজ ঈদের চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ’—এ খবর দেখে থাকে। আর আমাদের সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে চাঁদ ওঠার খবর প্রচার করতাম।
বর্তমানে আমরা আত্মীয়স্বজনরা মিলে ঈদ–পরবর্তী ফ্যামিলি রিইউনিয়নের আয়োজন করে থাকি। যেখানে সবাই গিয়ে নিজেদের মধ্যে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে থাকি।
ঈদে মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি বাড়াতে হবে। বর্তমানে দিনে এনে দিনে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা নেহাত কম না। তাদের ঘরে তো ঈদ পৌঁছে দিতে পারিনি। ঈদের আনন্দ তো সবার। সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়াটা হলো ঈদের মর্মবাণী।