কে এই ‘রহস্যময়’ নারী অ্যালিস গুও?

দুই বছর আগেও যাঁর পরিচয় ছিল শুধুই ‘বামবানের মেয়র’, সেই অ্যালিস গুও’কে এখন বলা হচ্ছে ‘রহস্যময় নারী’।কারণ তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে গুপ্তরবৃত্তির অভিযোগ। তিনি নাকি চীনের গুপ্তচর!

রহস্যময় এই নারী ২০২২ সালে ফিলিপাইনের ছোট্ট শহর বামবানের মেয়র নির্বাচিত হন। শহরের সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। কিন্তু ৩৫ বছর বয়সী এই নারীর জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তিনি বলেন, তাঁর জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু মনে নেই। কোন বাড়িতে জন্মেছিলেন, জানেন না। কেন তাঁর জন্মের ১৭ বছর পর ‘জন্মনিবন্ধন’ হয়েছিল, সে ব্যাপারেও তাঁর জানা নেই। এমনকি কোনো প্রথাগত স্কুলে পড়াশোনা না করে হাইস্কুল পর্যন্ত কেন নিজের বাড়িতেই পড়েছেন, তারও ব্যাখ্যা জানেন না তিনি।

এমন এক নারীকে ‘রহস্যময়’ ছাড়া আর কী–ই বলা যায়!

সম্প্রতি অ্যালিস গুও’র বিরুদ্ধে উঠেছে গুপ্তরচরবৃত্তির অভিযোগ। ফিলিপাইনের সিনেটর রিসা হোনটিভেরোস গত ৭ মে বলেন, ‘বামবানের মেয়র কি আমাদের কেউ? নাকি চীনের এজেন্ট তিনি?’

এমন অভিযোগের নেপথ্য কারণ হচ্ছে, গত মার্চে বামবানের পোগো অনলাইন ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় ফিলিপাইনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সেখান থেকে আটক করা হয় ৭০০ জনকে। এর মধ্যে ২০২ জনই চীনের নাগরিক ও ৭৩ জন অন্যান্য দেশের। এই ক্যাসিনো পরিচালনার সঙ্গে অ্যালিস গুও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

পোগো ক্যাসিনোটি অ্যালিসের অফিসের ঠিক পেছনেই অবস্থিত। এর জমির অর্ধেকের মালিকানা রয়েছে অ্যালিসের নামে। এসব কারণে সিনেটে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তিনি অবশ্য দাবি করেছেন, ওই সম্পত্তি এখন আর তাঁর নেই। দুই বছর আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবন
জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুসারে, ১৯৮৬ সালের ১২ জুলাই জন্মেছেন অ্যালিস গুও। কিন্তু তাঁর জন্মনিবন্ধন হয়েছে জন্মের ১৭ বছর পর। অ্যালিস বড় হয়েছেন একটি শুকরের খামারে। খামারটি ছিল তাঁর বাবার। তাঁর মা সম্পর্কে তেমন কোনও তথ্য জানা যায় না। অ্যালিস এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্যও করেন না। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া তথ্যে শুধু বলেছেন, তাঁর মা ফিলিপিনো, বাবা চীনা।

গুওর ভাষ্যমতে, তিনি হোমস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু স্কুলের নাম বলতে পারেননি। ফিলিপাইনের কোনও স্কুল–কলেজে তাঁর নামে কোনও শিক্ষার্থীর নিবন্ধন নেই।

এখনও অবিবাহিত গুও জানান, তিনি জন্ম থেকেই ফিলিপাইনে বসবাস করছেন। আর বামবানে বাস করছেন ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে। বামবানের ভার্জেন ডেলোস রেমেডিওসে তাঁর বাড়ি রয়েছে।

অ্যালিস গুও’র বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নথি থেকে জানা গেছে, ফিলিপাইনে আরও দুটি বাসস্থান রয়েছে তাঁর। একটি মারিলাওতে, আরেকটি ম্যানিলার ভ্যালেনজুয়েলা সিটিতে।

রাজনীতিতে প্রবেশ
ফিলিপাইনের ইলেকশন কমিশনের মুখপাত্র জন রেক্স লাউডিয়াংকো বলেন, ‘২০১৮ সালে প্রথম ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন গুও।’ তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ বা ৩১। অথচ ফিলিপাইনে ভোটার হওয়ার জন্য ১৮ বছর বয়সই যথেষ্ট। এত পরে কেন তিনি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, সে ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেননি গুও।

এরপর ২০২২ সালে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন অ্যালিস গুও। ১৬ হাজার ৫০৩ ভোট পেয়ে তিনি বামবানের মেয়র নির্বাচিত হন। ওই সময়ে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা বাবদ ১ লাখ ৩৪ হাজার পেসো (ফিলিপাইনের মুদ্রা) খরচ করেছিলেন।

নির্বাচনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন গুও। সেই সময়ে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তের প্রশাসন তাঁকে সহায়তা করেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। মেয়র নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর চীনা ভাষার একটি সংবাদপত্রে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

ব্যবসা–বাণিজ্যে অ্যালিস গুও
ফিলিপাইনের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের রেকর্ড থেকে জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে গুও অন্তত ১১টি কোম্পানির সংগঠক এবং প্রধান শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। তাঁর পরিচালিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে কিউজেজে অ্যাম্ব্রয়ডারি সেন্টার, কিউজেজে গ্রুপ অব কোম্পানিজ, কিউজেজে মিট শপ ইনকরপোরেটেড, থ্রি লিন কিউ ফার্ম ইনকরপোরেটেড ইত্যাদি।

বিলাসবহুল গাড়ি ও হেলিকপ্টার
ম্যাকলারেন ব্র্যান্ডের ৬২০–আর মডেলের বিলাসবহুল ব্রিটিশ গাড়ি রয়েছে অ্যালিস গুওর। ২০১৯ সালে গাড়িটির দাম ছিল ১ কোটি ৬৭ লাখ পেসো। টারলাক প্রাদেশিক তথ্য অফিস গাড়িটির মালিক হিসেবে গুও’র নাম নিশ্চিত করেছে।
ম্যাকলারেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২০ সালে তারা ৬২০–আর মডেলের মাত্র ২২৫টি গাড়ি তৈরি করেছিল। ২০২১ সালেই তারা গাড়িটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ফলে এই মডেলের গাড়ি এখন বিরল মডেলে পরিণত হয়েছে। গাড়িটি অ্যালিস কোন সময়ে এবং কীভাবে কিনেছিলেন, তা তারা জানে না।

স্থানীয় সংবাদিক জ্যাকব অলিভা বলেন, ‘কাস্টমস ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা গেছে, চোরাচালানের মাধ্যমে গাড়িটি ফিলিপাইনে এসেছিল।’

এ ছাড়া অ্যালিস গুও’র একটি ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার ছিল বলে সিনেটের শুনানির সময় তিনি নিজে স্বীকার করেছেন। গুও বলেন, ‘হেলিকপ্টারটি কিছুদিন আগে একটি ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।’

কী পরিণতি হতে পারে অ্যালিস গুও’র
অ্যালিস গুও’র বিরুদ্ধে অফশোর ক্যাসিনো পরিচালনা ও অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্ত চলছে। গত বৃহস্পতিবার ফিলপাইনের প্রেসিডেন্ট মার্কোস বলেন, ‘কেউ তাঁকে (অ্যালিস গুও) চিনত না। তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তা নিয়েই আমাদের বিস্ময় আছে। এ জন্য আমরা তাঁর বিষয়ে তদন্ত করছি। আমাদের সঙ্গে আছে ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন। কারণ, তাঁর নাগরিকত্বও যাচাই করে দেখা হবে।’

নির্বাচন কমিশন ও সলিসিটর জেনারেল অফিস জানিয়েছে, অ্যালিস গুও বেআইনিভাবে সরকারি পদ দখল করে আছেন কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যদি তা প্রমাণ হয়, তাহলে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। 

তথ্যসূত্র: বিবিসি, র‍্যাপলার ও ফিলিপাইনের জিএমএ নিউজ