আয়েসে সিচেকের তুর্কি বংশ পদবীর অর্থ ‘ফুল’। এ নাম তাঁর তেমন একটা পছন্দ নয়। কিন্তু বিয়ের পর বরের বংশ পদবী গ্রহণ করাটাও তাঁর অপছন্দ। এসব কিছু নিয়ে দোদুল্যমান থাকা সিচেক ২০২২ সালে হবু বরের সঙ্গে বাগদান সম্পন্ন করেন। আর তখনই তুরস্কের আইনে একটি নতুন ঘোষণা (ডিক্রি) আসে। এতে বলা হয়, কোনো নারী চাইলে বাগদত্তার বংশ পদবী গ্রহণের পাশাপাশি নিজের পদবীও রাখতে পারবে।
নতুন আইনে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে তাও সমস্যাজনক বলে মনে করেন তুর্কি বিমানবন্দরে চাকরিরত ৩৪ বছর বয়সী সিচেক। কারণ নতুন আইনের সারকথা, নারীদের বিবাহপূর্ব বংশ পদবী রাখার অধিকার দেওয়া হলো বটে। কিন্তু কোনো নারী বিবাহপূর্ব বংশ পদবী রাখুক না রাখুক তাঁকে বরের বংশ পদবী গ্রহণ করতেই হবে।
কিন্তু বংশ পদবী পরিবর্তনে অন্তত দুই ধরনের সমস্যা দেখেন সিচেক। প্রথমত, এটি করতে তাঁকে কর্মস্থানের আলাদা চারটি নিরাপত্তা কার্ড পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি তাঁর পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংক কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্রও পরিবর্তন করতে হবে। কারও দ্বিতীয় বিয়ে হলে বংশ পদবী পরিবর্তন করাটা নীতিগতভাবেও সমস্যাজনক। সিচেক বলেন, ‘কেবল বিয়ে করার কারণেই কোনো নারীকে তাঁর পরিচয় পরিবর্তন করতে হবে এটি কোনোভাবে মানা যায় না।’
তুরস্কে নারীবাদীরা কয়েক দশক ধরে দেশটির এ আইনের বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাঁদের যুক্তি, তুর্কি সংবিধানে নারী-পুরুষের সমানাধিকারে কথা বলা হয়েছে। তাই এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আধুনিক তুরস্কেরজনক কামাল আতাতুর্কই দেশটির বিদ্যমান সংবিধানের প্রণেতা। নতুন রাষ্ট্রকে ইউরোপের মতো করে গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। এ সংবিধানের কারণে দেশটির কর্মস্থানে নারীর উপস্থিতি বিপুলহারে বেড়েছে। এ সংবিধানে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও বিবাহিত নারীদের স্বামীর বংশ পদবী গ্রহণের কথা বলা হয়। এটির উদ্দেশ্য ছিল, রেকর্ড ও বংশধারার ইতিহাস স্পষ্ট রাখা।
আধুনিক তুরস্কের এ আইনটির বিরুদ্ধে নারীবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর তা ১৯৯৮ সালে দেশটির সাংবিধানিক আদলতে ওঠে। এরপর ২০১১ সালে দ্বিতীয় দফায় এই ইস্যুটি ফের আদালতে তোলা হয়। বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক ও পর্যবেক্ষণ শেষে, ২০১৫ সালে আদালত ঘোষণা করেন, কোনো নারী বিবাহপূর্ব বংশ পদবী রাখতে চাইলে পারবে। তবে তাঁকে বরের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা করতে হবে। অনেক নারীই এটি করতে আগ্রহী ছিল না।
এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিলে আইনটি পরিবর্তন করতে সম্মত হয় সাংবিধানিক আদালত। তবে তাতে বিচারকদের সর্বসম্মতি ছিল না। মুয়াম্মার তোপাল নামের এক বিচারক পরিবর্তনের বিরোধীতা করেন। তাঁর দাবি, নারী-পুরুষের সমানাধিকার ‘আধুনিক কুসংস্কার’।
যাইহোক, সংবিধানের মূল আইনটি গত ২৮ জানুয়ারি থেকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়। অর্থাৎ গত ২৯ জানুয়ারি থেকে বাগদান করা তুর্কি নারীরা বিয়ের পর বরের বংশ পদবী গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।
কিন্তু এখনও কিছুটা জটিলতা বা অপেক্ষার পালা রয়ে গেছে। সাংবিধানিক আদালতে গত ২৮ জানুয়ারির রায়টি নিয়ে তুরস্কের পার্লামেন্টে আলোচনা হতে হবে। সেখানে নতুন বিধিবিধান বা আইন পাস করতে হবে। সাংবিধানিক আদালতের রায়ের পরবর্তী নয় মাসের মধ্যেই এটি করতে হবে।
পার্লমেন্টের আসন্ন আধিবেশনে এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সাংবিধানিক আদলতে রায়ের আলোকেই তা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এমনটি হলে তখন সরকারি অফিসে রেজিস্ট্রি করা ছাড়াই কোনো নারী তাঁর জন্মকালীন বংশ পদবী ব্যবহার করতে পারবে।
দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে তামান্না-ই-জাহান