ফ্যাশন জগতে সৌন্দর্যের ধারণা বদলে দেন নাওমি ক্যাম্পবেল। তারই অনুজরা বর্তমানে ফ্যাশন জগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ব্রিটিশ সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেলের ক্যারিয়ারের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে গত মাসে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এবং অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীর নাম ছিল ‘নাওমি ইন ফ্যাশন’।
কে এই নাওমি ক্যাম্পবেল। ফ্যাশন জগতে তাঁর পথচলা কি সহজ ছিল? এ কথা জানতে হলে, একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।
লন্ডনের কোভেন্ট গার্ডেনে স্কুলপড়ুয়া একদল শিক্ষার্থী হেঁটে যাচ্ছিল। পথ আটকে মডেল ফটোগ্রাফার বেথ বোল্ট জানতে চাইলেন, ‘তুমি কি মডেল হতে চাও?’ শিক্ষার্থীদের সেই দলে ছিলেন নাওমিও। ১৫ বছরের কিশোরী নাওমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। জানতেন, প্রশ্নটি করা হয়েছিল তার শ্বেতাঙ্গ বান্ধবীর উদ্দেশ্যে। কিন্তু নাওমিকে অবাক করে দিয়ে বোল্ট তার দিকেই তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি।’
সেদিন কে জানত লাজুক নাওমিই একদিন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ মডেল হয়ে উঠবেন। আর ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষে বিভিন্ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
নাওমির শ্বেতাঙ্গ সুপারমডেল বন্ধুরা একের পর এক ম্যাগাজিনের কভারে সুযোগ পাচ্ছিলেন, কিন্তু নাওমিকে করা হচ্ছিল প্রত্যাখ্যান। নাওমি তাই দিনরাত এক করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকেন। অবশেষে ১৯৮৮ সালে ফরাসি ভোগ সাময়িকীর কভারে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মডেল হিসেবে নাওমি ক্যাম্পবেলের ছবি স্থান পায়।
তার অনেক বছর পর ২০০৪ সালে মাইকেল পারকিনসনের শো-এ নাওমি ক্যাম্পবেল বলেন, ‘যখনই আমি কোনো কভারে সুযোগ পেতাম, তখন ভাবতাম এটা শুধু আমার জন্য না, এটি আমার আগে ও পরের সকল প্রজন্মের নারীদের জন্য।’
নাওমির মতোই আরেকজন আলোকবর্তিকা ছিলেন ডনইয়েল লুনা। ১৯৬৫ সালে হারপার’স বাজারের প্রচ্ছদে কভারতারকা হিসেবে জায়গা করে নেন তিনি। কিন্তু এ ঘটনা তেমন কোনো আশার সঞ্চার করে নি। হারপার’সের সেই ছবিকে ‘ছবি’ না বলে ‘ইলাস্ট্রেশন’ বলা হয়। কারণ লুনার ত্বক সেখানে এডিট করে ফ্যাকাশে গোলাপি করা হয়।
সাধারণ মানুষ এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে থাকে। তখনো তাঁরা এটাই জানতেন, ম্যাগাজিনের পাতায় আসা অধিকার শুধুই সাদা চামড়াদের দখলে। তবে, এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকজন স্পন্সর তাঁদের বিজ্ঞাপনের রাজস্ব প্রত্যাহার করতে চান। অনেক পাঠক ভোগের সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেন। এতকিছুর পরেও পরের বছর ব্রিটিশ ভোগ সাময়িকী আবারও লুনাকে কভারে রাখে। এবার তাঁর ত্বকের রং গাঢ়ই থাকল, কিন্তু তাঁকে প্রাচীনকালের মিশরীয় নারীর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হলো।
ইতিবাচক মনে হলেও, এতে করে প্রকৃতপক্ষে স্টেজ বা মিডিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ একপ্রকার সীমিত দেখানো হলো।
মার্কিন লেখিকা এবং মডেল বারবারা সামারস তাঁর ‘স্কিন ডিপ: ইনসাইড দ্য ওয়ার্ল্ড অব ব্ল্যাক ফ্যাশন’ বইয়ে লিখেছেন, ‘সাদা আমেরিকাতে কালো নারীদের অনেক চোখেই দেখা হয়েছে, সৌন্দর্য সে তালিকায় সবার নিচে।’ ২০ শতকের গোড়ার দিকে ত্বকের রং হালকাকারী এবং সহজাত কোঁকড়ানো চুলকে সোজা করার মতো বিউটি পণ্য বাজারে এসে এই বার্তা দিতে থাকে, কৃষ্ণাঙ্গদের সহজাত বৈশিষ্ট্যগুলোর সংশোধন দরকার।
এ সময় আরেক নাওমির কথাও বলতে হয়। প্রভাবশালী সাদাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অনুমতির ধার ধারেননি তরুণ আর চঞ্চল মডেল নাওমি সিমস। এজেন্সিগুলো থেকে একের পর এক প্রত্যাহার হতে হতে তিনি নিজে থেকেই সরাসরি ফটোগ্রাফারদের কাছে যান। ফলাফল ম্যাগাজিনের কভার থেকে হলস্টন ও জিওর্জি ই সান্ত অ্যাঞ্জেলোর (Giorgio di Sant'Angelo) মতো আমেরিকান-ইতালিয়ান ফ্যাশন ডিজাইনারদের পোশাকে র্যাম্পে হাঁটার সুযোগ। মার্কিন ভোগের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রচ্ছদ তারকা বেভারলি জনসনকেও পরবর্তীতে পেছনে ফেলেন তিনি।
১৯৮৮ সালে সোমালিয়ান মডেল ঈমান এবং নিউইয়র্কের বেথান হার্ডিসন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সম উপস্থাপন এবং মজুরির দাবিতে একটি জোট গঠন করেন। ‘ব্ল্যাক গার্লস কোয়ালিশন’ নামের সেই জোটের সাফল্যের একটি ছিল ইতালিতে ভোগের ‘অল-ব্ল্যাক ইস্যু’র জন্য চাপ প্রদান।
দ্য ফ্যাশন স্পটস এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২২ সালে নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইক স্প্রিংয়ে কৃষ্ণাঙ্গ মডেলদের অংশ নেওয়ার হার ছিল অর্ধেকেরও বেশি। অথচ ২০১৫ সালে এটি ছিল মাত্র এক-পঞ্চমাংশ।
তবে এখনও অনেকটা পথ বাকি। মার্কিন মডেল মেগান মিলান গত বছর এক ভাইরাল টিকটক পোস্টে জানান, নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকের এক শো-এর জন্য তাকে দুইবার মেকআপ করতে হয়েছিল। কারণ, তার মেকআপ আর্টিস্ট ‘কালো ত্বক’ সাজানোয় দক্ষ ছিলেন না। কিছুটা বিলাপের সুরেই মেগান বলেন, “আমাকে ভূতের মতো লাগছিল।”
২০২২ সালের একটি তথ্যচিত্রে মার্কিন সুপারমডেল ভেরোনিকা ওয়েব দারুণ একটি বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই পৃথিবীর যে কারো চাইতে কালো নারীদের মধ্যে ডিএনএ বেশি। আমরা ১০ কোটি লুক নিতে পারি, এবং সেটা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। আমাদের সৌন্দর্যের কোনো অংশই অস্বীকার করার মতো না।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি