প্রকৃতি রক্ষায় ৭৩৮ দিন গাছে থাকেন জুলিয়া

‘বিশ্বজুড়ে মানুষ বন রক্ষার জন্য, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে তা খুবই স্পষ্ট। শুধু মুখে বড় কথা না বলে আমাদের নেতাদেরসহ সকলকে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এই বিষয়ে আমাদেরকে অবশ্যই সমাধানের পথে যেতে হবে’। গত বছর দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলন কনফারেন্স অব পার্টিজ বা কপ ২৮ এ এসব কথা বলেন পরিবেশবাদী জুলিয়া বাটারফ্লাই হিল।

সম্মেলনে  বন উজাড় রোধে রাষ্ট্রনেতাদেরকে প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা মনে করিয়ে দেন জুলিয়া। তার বক্তব্যে আরও উঠে আসে ‘লুনা’র স্মৃতিচারণ। 

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৫০০ বছরের পুরোনো গাছ লুনায় চড়ে বসেছিলেন জুলিয়া। এরপর সে গাছের মগডালেই কাটিয়ে দেন টানা ৭৩৮ দিন। দুই বছরের বেশি সময়ের পর তিনি যখন প্রাচীন গাছ থেকে নেমে আসেন, ততোদিনে আমেরিকার প্যাসিফিক লাম্বার কোম্পানি (পিসিএল) মেনে নিয়েছে জুলিয়ার দাবি।

জুলিয়ার সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়, লুনার আশপাশের ২০০ ফুট পর্যন্ত বাফার জোন হিসেবে থাকবে। অর্থাৎ সেখানে কোনো গাছ কাটা চলবে না। এই আশ্বাসের পর গাছ থেকে নেমে আসতে রাজি হন জুলিয়া। 

লুনায় ছয় ফুট বাই চার ফুটের একটি কাঠের পাটাতনে বসবাস করতেন জুলিয়া। সেটি ছিল মাটি থেকে ১৮০ ফুট ওপরে। সেখানে ঝড়, বৃষ্টি, কোম্পানির নজরদারি সবই সহ্য করেন জুলিয়া। গাছের ডালেই করতেন রান্নাবান্না, ঘুমাতেন স্লিপিং ব্যাগের সঙ্গে নিজেকে দড়িতে বেঁধে।

প্রাচীন সেই গাছের ডালে বসে একটি সংবাদমাধ্যমের ‘ইন-ট্রি কারেস্পন্ডেন্ট’ হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেখান থেকেই জাতিসংঘ আর মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।   

মাত্র ১৬ বছর বয়সে রোজগার শুরু করেন জুলিয়া বাটারফ্লাই হিল। সফল একটা ক্যারিয়ারও ছিল তার। কিন্তু সব পেছনে ফেলে পরিবেশরক্ষার কাজে জড়িয়ে পড়েন। জুলিয়া সে সময় সরাসরি কোনো পরিবেশরক্ষাকারী সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন না। শুধুমাত্র স্থানীয়দের স্বার্থে তিনি ঐ বিশালকায় গাছে চড়ে বসেছিলেন। একসময় জুলিয়ার অদম্য বিক্ষোভের মুখে হার মানতে বাধ্য হয় আমেরিকার সংস্থাটি। 

‘দ্য লিগেসি অব লুনা’ বইয়ের লেখক জুলিয়ার জীবনের গল্পও বেশ চমকপ্রদ। তার প্রকৃত নাম জুলিয়া লোরেন হিল। সাত বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে এক দিনের একটি হাইকিং সফরে গেলে কোথা থেকে এক প্রজাপতি উড়ে এসে বসে তার হাতের আঙুলে। সেই থেকে তার মধ্যনামে ‘লোরেন’ বাদ দিয়ে তিনি নিজেই বসান ‘বাটারফ্লাই’।  

২২ বছর বয়সে মারাত্মক এক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হন জুলিয়া। প্রায় এক বছর থেরাপির পর স্বাভাবিকভাবে কথা বলা এবং হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পান। তবে ঐ দুর্ঘটনাটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। জুলিয়ার ভাষায়, “আমি বুঝতে পারি যে, এতোদিন আমার পুরো জীবন ভারসাম্যের বাইরে ছিল... দুর্ঘটনায় যে স্টিয়ারিং হুইল মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, তা আসলে আমার জীবনকে নতুন পথে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।’’ একসময় ক্যালিফোর্নিয়ার হামবোল্ট কাউন্টিতে পরিবেশরক্ষার কাজে জড়িয়ে পড়েন জুলিয়া। 

পরিবেশবাদী, কবি, লেখক, শিক্ষাবিদ, বক্তা এখন জুলিয়ার বাটারফ্লাই বহু পরিচিতি। ‘সার্কল অব লাইফ ফাউন্ডেশন’ নামে সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়া এখন নানান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া লিখেছেন একাধিক বেস্টসেলার বই। যুদ্ধে ফেডারেল ট্যাক্স ব্যবহারের প্রতিরোধ আন্দোলনেও একসময় যোগ দিয়েছিলেন এই আমেরিকান কর্মী।   

তথ্যসূত্র: ট্রিজ ফাউন্ডেশন, ব্রিটানিকা