স্বামীর অত্যাচারে ঘরছাড়া মেয়েটির ১০বার এভারেস্ট জয় 

এক বার নয়, দুই বার নয় ১০ বার বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন লাকপা শেরপা। এ অর্জনে চমক আছে ঠিক, তবে তার চেয়েও যেন চমকে ভরা তার ব্যক্তিজীবন। সারা বিশ্ব যে নারীকে উঠতে দেখেন পর্বতের চূড়ায়, তাকেও কাটাতে হয়েছে একটা ভয়াবহ সময়!

কতটা ভয়াবহ জীবন কাটাতে হয়েছে লাকপা শেরপাকে, তারই বর্ণনা দিয়েছে বিবিসির শনিবারের এক প্রতিবেদন। 

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত জয় করার সময়ও শেরপা বলেছেন, স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তাকে। তার ওপর এই নির্যাতন চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে। এখন আমেরিকায় বাস করছেন তিনি। মুদি দোকানে এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে তিন সন্তানকে বড় করেছেন এই নারী।

শেরপার ব্যক্তিজীবন- পাহাড়ে ওঠা জীবন নিয়ে ‘মাউন্টেন কুইন: দ্য সামিট অফ লাকপা শেরপা’ নামের ডকুমেন্টারি বানিয়েছে নেটফ্লিক্স। এর পরিচালক লুসি ওয়াকার। এটি নেটফ্লিক্সের পর্দায় আসছে আগামী ৩১ জুলাই।

শেরপা বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমি মানুষকে দেখাতে চাই, নারীরা পারে।’ ১০বার এভারেস্টে জয় করেছেন, এমন নারী একমাত্র শেরপাই, তার এই দুঃসাহসিক যাত্ৰা ছিল কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই।

এভারেস্ট আরোহণ সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ এক যাত্রা। এভারেস্ট জয় নিয়ে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর থেকে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের মরদেহ নামানো পর্যন্ত যায়নি মাটিতে। শেরপাকে সবকিছুই সামলে শুধু সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে। 

ডকুমেন্টারিতে শেরপাকে পাহাড়ে হাঁটার মাধ্যমে ফিট থাকতে দেখা যায়। তিনি এর বাইরে তার স্বাভাবিক কর্মজীবনও চালিয়ে যান। 

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীকে শেরপার উদ্দেশে বলতে দেখা যায়, ‘আপনি একজন ব্যতিক্রমী ক্রীড়াবিদ। অথচ মানুষ বিষয়টির মূল্যায়ন করে না। এটা অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব যে, আপনি আপনার দিনের কাজ করে এভারেস্টে আরোহণ করতে পারবেন।’ শেরপা তখন বলেন, ‘আমি ভালো শিক্ষিত নই, তবে পাহাড়ে ওঠার ব্যাপারে আমি ভালো।’ 

নেপালের কৃষক পরিবারে ১৯৭৩ জন্মগ্রহণ করেন ১০ বারের এই এভারেস্ট জয়ী। তারা ছিলেন ১১ ভাই–বোন। শেরপা যে এলাকায় বাস করতেন, সে এলাকায় নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো খুবই কম। পাহাড়ের পথ ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাইদের স্কুলে নিয়ে যেতেন তিনি। 

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব শেরপার জীবনে দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি রেখে গেছে। তিনি এখনও পড়তে পারেন না। টিভি রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করার মতো বিষয়ও তার জন্য কঠিন। অবশ্য এসব কাজে সাহায্য করেন তার সন্তানেরা। 

স্কুলের পড়াশুনা ছাড়াই পাহাড় অভিযানে অন্যদের সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতেন শেরপা। এর মাধ্যমে অবশ্য তিনি আর ১০টি মেয়ের মতো আনুষ্ঠানিক বিয়ে এড়াতে সক্ষম হন। তবে তার জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে কাঠমান্ডুতে এক সম্পর্ক জড়িয়ে অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লে। বিয়ে ছাড়াই বাড়ি ফিরে আসা এক মায়ের জীবন বদলে যেতে থাকে ক্রমেই। 

পর্বতে ওঠা চালিয়ে যেতে থাকেন শেরপা। এক পর্যায়ে রোমানিয়ান-মার্কিন পর্বতারোহী এবং ঠিকাদার জর্জ ডিজমারেস্কুর সাথে দেখা হয় তার। প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। ২০০২ সালে বিয়ে হয় তাদের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন শুরু করেন এই দম্পতি। 

শেরপা জানান, ডিজমারেস্কু সহিংস হয়ে উঠলে ভাঙন ধরে যায় তাদের সম্পর্কে। ২০০৪ সালে এটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময় নিউ ইংল্যান্ড পর্বতারোহণ দলের সাথে এভারেস্ট আরোহণ করেন তারা।

পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানোর পর তারা খারাপ আবহাওয়ার সম্মুখীন হন। সাংবাদিক মাইকেল কোডাসের মতে, ডিজমারেস্কুর আচরণ একটি দিকে মোড় নেয়। ডিজমারেস্কুর চারপাশের পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে ওঠে।

শেরপা বলেছেন, ‘সে দেখতে বজ্রের মতো, বুলেটের মতো হয়ে ওঠে। ডিজমারেস্কু চিৎকার করছিল এবং সে আমাকে ঘুষি মেরেছিল।’

ডকুমেন্টারিতে ওই মুহূর্তের পরিস্থিতিন বর্ণনা করেন শেরপা। তিনি বলছিলেন, ‘আমি সবকিছু দেখেছি। আমি লজ্জিত বোধ করেছি। আমি মরে যেতে চেয়েছি।’ এর পরই তিনি তার সন্তানদের স্মরণ করেন এবং বলেন, ‘আমি মরতে প্রস্তুত নই।’

সম্পর্কে ভাঙনের মধ্যেও আরও কয়েক বছর স্বামীর সঙ্গে থাকেন শেরপা। তিনি জানান, ২০১২ সালে তাকে আবারও শারীরিক অত্যাচার করেন ডিজমারেস্কু। সে সময় তাকে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়। এই ঘটনাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। 

এক সমাজকর্মীর সহায়তায় শেরপা যোগ দেন নারী শরণার্থীদের একটি গ্রুপে। সেখানেই নতুন জীবন শুরু হয় তার। আর ২০১৫ সালে ডিভোর্স দেন স্বামীকে। আদালত পরের বছর তাকে আইনি হেফাজতে নেওয়ার আদেশ দেন। 

২০২২ সালে ১০তম বারের মতো এভারেস্ট জয় করেন শেরপা। ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো এভারেস্ট জয় করা প্রথম নেপালি নারী তিনি। এখনকার জীবন নিয়ে বেশ খুশি তিনি। খুশি তার সন্তানেরাও।