বাংলা কথাসাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভার নাম মহাশ্বেতা দেবী। শুধু সাহিত্য সৃষ্টির জন্যই তিনি অনন্য নন, নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে একজন সাহসী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি সমাদৃত। ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯০ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
মহাশ্বেতা দেবী সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি মানুষের অধিকার আন্দোলনে রাজপথে থেকেছেন, পায়ে পা মিলিয়েছেন, যা তাঁকে সত্যিকার অর্থে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর জীবন ও লেখক সত্তায় প্রগতিশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিবাদী মনন, সাধারণ মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
খেটে খাওয়া শোষিত, বঞ্চিত সাধারণ মানুষের প্রতি অগাধ মমত্ববোধই সম্ভবত তাঁকে সাহিত্য সৃষ্টির পথে নিয়ে গেছে। লোধা, সাঁওতাল, শবর, সহিস, কিরিবুরু, হরিজনদের জীবন যাপনের সাথে নিজেকে একাত্ম করে যুগ যুগ ধরে তাদের ওপর ঘটে যাওয়া বঞ্চনার ইতিহাস সমাজের মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। এমন শিল্পীসত্তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি বহু জায়গায় ঘুরেছেন, ছুটে গেছেন সেই সব মানুষের কাছে, যাদের জীবন সামজিক কষাঘাতে জর্জরিত, অধিকার ও মর্যাদাহীনতার অন্ধকারে নিপতিত। তিনি বিচিত্র মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, আহরণ করেছেন লেখার উপাদান।
মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতে ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে মামার বাড়িতে। পারিবারিক সূত্রেই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। তাঁর বাবা মণীশ ঘটক একাধারে কবি এবং সাহিত্যিক, তিনি ‘যুবনাশ্ব’ ছদ্মনামে লিখতেন। বাংলা ছোটগল্পে তিনি এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন। মা ধরিত্রী দেবীও ছিলেন লেখিকা ও সমাজকর্মী। তাঁর ছোট কাকা ঋত্বিক ঘটক বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ও সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর পিতামহ সুরেশ চন্দ্র ঘটক ইংরেজি ও ইতিহাস বিষয়ে ডবল এম. এ পাস করে বেঙ্গল সার্ভিসে এস.ডি.ও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পিতামহী ইন্দুবালা দেবী ছিলেন সে সময়ের শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাঁর মাতামহ নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত আইনজীবী ও সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক।
মহাশ্বেতা দেবীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল ঢাকার ইডেন মন্টেসরি স্কুলে। বাবার বদলির চাকুরির কারণে এখানে বেশিদিন থাকা হলো না। মা-বাবার সঙ্গে চলে গেলেন মেদেনিপুর। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন। শান্তিনিকেতন থেকে বি.এ পাস করে তিনি কলকাতা ফিরে আসেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ (ইংরেজি) ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিণামে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে তাঁর লেখাপড়া স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হলেও পারিবারিক ও আর্থিক নানা কারণে তিনি নিয়মিত হতে পারেননি। জ্ঞানের প্রতি অসীম আগ্রহ ও ভালোবাসা প্রায় ১৭ বছর পরে পুনরায় তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেছে। ১৯৬৩ সালে তিনি এম.এ পাস করেছিলেন।
বৈবাহিক জীবনে চরম দরিদ্রতার মুখোমুখি হয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ ভোগ করতে পারেননি তিনি। পেশাজীবনও ছিল টালমাটাল। পরে জীবিকার তাগিদে ১৯৪৮ সালে পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। ১৯৪৯ সালে ইনকাম ট্যাক্সের অফিসে চাকরি পেলেও তা করা হয়নি। ওই বছরেই তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের পোস্টাল বিভাগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে পেশা বদল করে পুনরায় শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। এরপর ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন মহাশ্বেতা। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি একাকিত্ব জীবন বেছে নেন। পরবর্তীতে লেখালেখির কাজে নিজেকে গভীরভাবে নিযুক্ত করতে ১৯৮৪ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। এক সন্তান নবারুণ ভট্টাচার্যও ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক ও রাজনৈতিক কর্মী। আমৃত্যু লেখাকে চিরসঙ্গী করে নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।
তাঁর লেখক জীবন শুরু হয়েছিল চল্লিশের দশকে। সময়ের কারণেই ইতিহাসের অসংখ্য বাঁক পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন তিনি। সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। পারিবারিক ঐতিহ্য ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ততার ফলে সমকালীন অনেক গুণী লেখক, রাজনীতিক ও সমাজ সংস্কারকের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছিল। এসব তাঁর লেখক জীবনকে ঋদ্ধ করেছিল। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা’। মহাশ্বেতা দেবী বেশ কিছুকাল ‘সুমিতা দেবী’ এই ছদ্মনামে গল্প লিখতেন। তাঁর প্রথম জীবনীগ্রন্থ ‘ঝাঁসির রানী’ ১৯৫৫ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৫৬ সালে পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়। ১৯৭৯ সালে বাবা মণীষ ঘটকের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘বর্তিকা’র দায়িত্বভার গ্রহণ করেন মহাশ্বেতা দেবী। তিনি একশটির বেশি উপন্যাস রচনা করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নটী’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। এরপর থেকে টানা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর তাঁর লেখা এক বা একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার চূরাশির মা’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। ‘অরণ্যের অধিকার’ ও ‘তিতুমীর’ উপন্যাস তাঁর অনন্য সৃষ্টি।
মহাশ্বেতা দেবীর বিশাল বৈচিত্র্যময় লেখক জীবনে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোটগল্প। তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘সোনা নয়, রুপো নয়’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় সপ্তপর্ণী, অবিশ্বাস্য, মূর্তিসহ ২০টির বেশি গল্প সংকলন। ছোটদের জন্য কল্পনাধর্মী গল্প ও কিশোরদের জন্য সৃষ্টি করেছেন বাঘা শিকারী, জাতকের গল্পসহ নানা গল্প। তিনি বাংলা ভাষায় লেখালেখি করলেও তার বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাস বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাস নিয়ে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। এ সকল চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘রুদালি’ ও ‘হাজার চৌরাসি কা মা’ বিশেষভাবে সমাদৃত।
লেখালেখি ও সমাজকর্মের স্বীকৃতিতে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। ভারত সরকারের সাহিত্য আকাদেমি, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ, ম্যাগসাইসাই, ইতালি থেকে নোনিনো পুরস্কার, সার্ক সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্রভারতী ও ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট উপাধি, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা লাভ করেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে পরিচালক অরিন্দম শীল ‘মহানন্দা’ নামে একটি বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
মৃত্যুতে শেষ হয় না জীবন। জীবনের সৃষ্টি বেঁচে থাকে কালের সাক্ষী হয়ে। পথ দেখায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। মহাশ্বেতা দেবী বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিতে, কর্মে।