জাতীয় শিশুকন্যা অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিবেদন

৮ মাসে ১৮৭ কন্যাশিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু, ধর্ষণের শিকার ২২৪

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) ১৮৭ জন কন্যাশিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। এ ছাড়া ২২৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ১৩৩ জন কন্যাশিশু আত্মহত্যা করেছে, ২৮ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ১৯ জন কন্যাশিশু, ১০ জন গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ৮১ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে, ২০ জন কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের উদ্যোগে এবং এডুকো বাংলাদেশ এর সহযোগিতায় আয়োজিত ‘কন্যাশিশুর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার। বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সহসভাপতি শাহীন আকতার, গুড নেইবারস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাঈনুদ্দিন মাইনুল, এডুকো বাংলাদেশের চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড প্রটেকশন বিশেষজ্ঞ মো. শহীদুল ইসলাম ও এডুকো বাংলাদেশের পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির ব্যবস্থাপক হালিমা আক্তার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এর ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সৈয়দা আহসানা জামান বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুরা প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এ সকল সহিংসতাকে যদি সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে বলা যেতে পারে, তাদের ওপর নির্যাতন মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি সামগ্রিকভাবে সমাজের মাধ্যমে নিপীড়িতদের একজন হিসেবে, দ্বিতীয় ধরনের নির্যাতন হলো কেবল কন্যাশিশু হিসেবে জন্মানোর ফলে। এ ধরনের সহিংসতাই মূলত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।

এছাড়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ পর্যালোচনা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নবজাতক কন্যাশিশু থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধা কেউই আজ নিরাপদ নয়। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্য বলছে, গত ২৩ বছরে সেখান থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় ৬২ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। মামলা হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৪৪১টি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৬ থেকে সাড়ে ২২ হাজার মামলা হয়েছে। অন্যদিকে, অনলাইনেও হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘কন্যাশিশুরা আমাদের সম্পদ, তারা কোনোভাবেই বোঝা নয়। কন্যাশিশুদের প্রতি যথাযথ বিনিয়োগের অভাবে তারা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে এবং তাদের অনেকেই মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে শাহীনা আক্তার বলেন, ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির সঙ্গেও আমরা আরও অনেকগুলো আইন প্রণয়ন করেছি। কিন্তু আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা এখনও নানাভাবে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তার মানে কি এই যে, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও আমরা নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ সমাজ ও দেশ গড়ে তুলতে পারিনি?

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘ঘরে-বাইরে-স্কুলে কোথাও আমাদের নারী ও কন্যাশিশুরা নিরাপদ নয়। তারা নানাভাবে নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অথচ যৌন হয়রানি রোধের বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। বাল্যবিবাহের বিশেষ ধারার ব্যবহার করে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন অভিভাবকরা। তাই আইনে কতগুলো বিষয়ে সুষ্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে, যাতে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে না পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলো: ১. ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নামে একটি আইন জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করা, ২. শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সকল ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা, ৩. ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ আসলে ধর্ষণের শিকার নারী ও কন্যার পরিবর্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে যে, সে এ ঘটনা ঘটায়নি, এ সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করা, ৪. মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনের কঠোর নির্দেশনা মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা, ৫. কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা, ৬. শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করা, ৭. বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, ৮. কন্যাশিশুদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক থেকে তাদেরকে রক্ষার জন্য উচ্চপর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করা, ৯. সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা, ১০. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বৃদ্ধি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কন্যাশিশু ও তাঁদের অভিভাবকদের এর আওতায় আনা, ১১. ক্রমবর্ধমান কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং পাশাপাশি তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতনকরণসাপেক্ষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরকে যুক্ত করা।

উল্লেখ্য, ‘জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম’ কন্যাশিশু তথা নারীর অবস্থা ও অবস্থানের ইতিবাচক পরিবর্তনে কর্মরত সমমনা সরকারি-বেসরকারি ২০৬টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্ল্যাটফম। প্ল্যাটফর্মটি ২০০২ সাল থেকে নারী এবং কন্যাশিশুর অধিকার, তাদের সুরক্ষাসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অন্যদিকে এডুকো বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশে ১৯৯৯ সাল থেকে শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।